নারীদের জন্য বাস সার্ভিস: প্রশংসার পাশাপাশি কিছু জরুরি কথা

ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জায়গায় নারীদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য, কর্মক্ষমতা ও নারীর ক্ষমতায়নকে সামনে রেখে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই উদ্যোগের একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো—নারীরা শুধু যাত্রী হিসেবে নয়, চালক, সহকারী ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেও সামনে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে পুরুষপ্রধান একটি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ সৃষ্টি করা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন।
আমি মনে করি, এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নয়, নারীর অগ্রগতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত। যে সরকারই এমন উদ্যোগ নিক, সেটি ভালো হলে তার প্রশংসা করা উচিত। একইভাবে ভুল থাকলে সেটিও গঠনমূলকভাবে বলা উচিত। কিন্তু এখানেই আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
প্রথমত, এই নারীদের সময় দিতে হবে। যারা আজ বাস চালাচ্ছেন, তাদের অনেকের হয়তো প্রশিক্ষণ আছে, কিন্তু ঢাকার বাস্তব রাস্তায় বড় যাত্রীবাহী বাস চালানোর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এখনও তৈরি হয়নি। প্রশিক্ষণ মাঠ বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গাড়ি চালানো আর ঢাকা শহরের ব্যস্ত সড়কে বড় বাস চালানো এক বিষয় নয়। তাই প্রথম কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসকে আমি ‘শেখা ও মানিয়ে নেওয়ার সময়কাল’ হিসেবে দেখতে চাই। তাদের ভুলের সুযোগ দিতে হবে, তবে সেই ভুল যেন দুর্ঘটনায় পরিণত না হয়—সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের।
দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণের সঙ্গে রাস্তার অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে হবে। শুধু ইন-হাউস বা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। তাদের ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ মাঠ, নিয়ন্ত্রিত রাস্তা, কম ব্যস্ত রুট, ব্যস্ত শহরের রুট, মহাসড়ক—এই ধরনের একটি সুবিন্যস্ত অগ্রগতির মাধ্যমে বাস্তব রাস্তায় অভিজ্ঞ করে তোলা যেতে পারে। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক বা সুপারভাইজার দিয়ে প্রথম পর্যায়ে তাদের সঙ্গে রুট পর্যবেক্ষণ করানো যেতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি রুটে সেফটি রেসপন্স সিস্টেম থাকা উচিত। একজন নারী চালক রাস্তায় বাস চালাচ্ছেন—হঠাৎ দুর্ঘটনা, যান্ত্রিক সমস্যা, রাস্তার বিশৃঙ্খলা, যাত্রীর সঙ্গে সমস্যা কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজন হলো, তখন চালককে একা রেখে দিলে হবে না। প্রতিটি রুটে একটি রেপিড রেসপন্স অ্যান্ড সেফটি সাপোর্ট সিস্টেম থাকা উচিত। প্রয়োজনে ট্রাফিক পুলিশ, সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং জরুরি সহায়তা টিমের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
জিপিএস, জরুরি সেবা এবং নির্দিষ্ট কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে চালক যেন কয়েক মিনিটের মধ্যে সহায়তা পান, এটি নিশ্চিত করা দরকার। এতে চালকের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে, যাত্রীদের নিরাপত্তাও বাড়বে।
চতুর্থত, ‘প্রথম দিন থেকেই ‘পার্ফেক্ট ড্রাইভার বা নিরাপদ ড্রাইভিং’ আশা করা যাবে না। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা বাস চালাচ্ছেন, এটা নতুন। তাই প্রথম দিনেই তারা দেশের সেরা বাসচালকের মতো পারফর্ম করবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। একজন নতুন চালকের শেখার প্রক্রিয়া থাকবে। তাকে নিরাপদ সীমার মধ্যে, নির্ধারিত স্পিড লিমিট মেনে, নির্ধারিত রুটে এবং পর্যাপ্ত সুপার ভিশনের মধ্যে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। ভুল হলে প্রশিক্ষণ দিয়ে ঠিক করতে হবে। ভুলকে নিয়ে উপহাস করে একটি নতুন উদ্যোগকে ধ্বংস করা কোনো সমাধান নয়।
পঞ্চমত, মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাস্তায় প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু যদি কোনো নারী চালক প্রথমবারের মতো বাস চালাতে গিয়ে সামান্য দুর্ঘটনার শিকার হন, সেটি মুহূর্তের মধ্যে ‘নারী বাস চালিয়ে দুর্ঘটনা’ শিরোনামে ভাইরাল হয়ে যেতে পারে।
এখানে আমাদের একটু থামতে হবে। একই ঘটনা একজন পুরুষ চালকের ক্ষেত্রে হলে সেটি হয়তো সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা। কিন্তু নারী চালকের ক্ষেত্রে সেটিকে যদি ‘নারী চালকের অক্ষমতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সেটি শুধু একজন চালকের নয়—পুরো নারী কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ন উদ্যোগের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক কাহিনি তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথাকথিত ‘বট বাহিনী’ বা সমন্বয় প্রচারণা থাকলে সেটিও আরও বিপজ্জনক। তথ্য যাচাই না করে ছবি, ভিডিও বা অর্ধসত্য বারবার শেয়ার করা কোনো সুস্থ প্রতিযোগিতা নয়।
সমালোচনা হোক, কিন্তু তথ্যভিত্তিক সমালোচনা হোক। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—নারীদের জন্য বাস, নাকি নারীদের জন্য ভালো বাস? এখানেই আমার সবচেয়ে বড় আপত্তি। নারীদের নিরাপত্তার কথা বলছি, নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলছি, তাদের মর্যাদা ও আধুনিক পরিবহনের কথা বলছি, কিন্তু তাদের জন্য ব্যবহৃত বাস যদি পুরোনো, ভাঙাচোরা বা নিম্নমানের হয়, তাহলে পুরো উদ্যোগটির সৌন্দর্য ও উদ্দেশ্য অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।
নারীদের জন্য আলাদা বাস করলেই হবে না; বাসটিও হতে হবে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, আরামদায়ক ও আধুনিক। আমার মতে, যদি নতুন বা তুলনামূলক আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস পাওয়া যায়, তাহলে সেগুলোকে এই পাইলট প্রজেক্টে ব্যবহার করা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত হতো।
কারণ আমরা যে বার্তাটি দিতে চাই তা হলো, নারীদের জন্য আলাদা কিছু কম নয়; বরং নারীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত কিছু।
আরেকটি বড় সুযোগ, এটিকে স্থায়ী নারী কর্মসংস্থান প্রকল্পে পরিণত করা। শুধু কয়েকজন নারীকে বাস চালানোর সুযোগ দিয়ে থেমে গেলে হবে না। যারা সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করবেন, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বা আধা-সরকারি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। ড্রাইভার, সিনিয়র ড্রাইভার, ইন্সট্রাক্টর, রুট সুপারভাইজার—এমন একটি ক্যারিয়ার পাথওয়ে তৈরি করা যেতে পারে। তাহলে একজন নারী শুধু আজ বাস চালাবেন না; ভবিষ্যতে তিনিই নতুন নারী চালকদের প্রশিক্ষক হতে পারবেন। এতে একটি মহিলা বাস সার্ভিস তৈরি হবে এবং তখন আরও অনেক শিক্ষিত, দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী নারী এই পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। এই উদ্যোগটি শুধু একটি বাস সার্ভিস নয়। এটি একটি সামাজিক পরীক্ষা। একজন নারী যখন প্রথমবারের মতো বড় বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসছেন, তখন তিনি শুধু একটি বাস চালাচ্ছেন না, তিনি আরও অনেক নারীর সামনে একটি নতুন দরজা খুলছেন।
তাই প্রথম কয়েকটি ভুল, প্রথম কয়েকটি পরিচালনাগত সমস্যা কিংবা প্রথম কয়েকটি যাত্রীসংক্রান্ত সমস্যাকে কেন্দ্র করে পুরো উদ্যোগকে ব্যর্থ ঘোষণা করা অত্যন্ত অন্যায় হবে। বরং কর্তৃপক্ষের উচিত, ট্রেনিং, রাস্তার দক্ষতা, সেফটি সাপোর্ট, মডার্ন বাস, প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট, লং টার্ম এমপ্লয়মেন্ট—এই ছয়টি বিষয়কে একসঙ্গে নিয়ে প্রকল্পটিকে শক্তিশালী করা।
আমি এই উদ্যোগের প্রশংসা করি। কিন্তু প্রশংসা মানে অন্ধ সমর্থন নয়। যে জায়গায় ভালো হয়েছে, সেখানে প্রশংসা করতে হবে। যেখানে দুর্বলতা আছে, সেখানে সমাধান দিতে হবে। আর যারা রাজনৈতিক কারণে ভালো উদ্যোগের প্রশংসা করেন না, কিংবা ভুল ধরার নামে একটি ভালো উদ্যোগকে ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন—তাদের উভয় পক্ষেরই একটু থামা উচিত। কারণ নারীকে এগিয়ে নেওয়া কোনো দলের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের বিষয়। আজ একজন নারী বাস চালাচ্ছেন। আগামীকাল হয়তো তিনিই আরও ১০০ জন নারীকে বাস চালানো শেখাবেন। তারপর হয়তো একজন নারী হবেন ইন্সট্রাকটর, ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজার—এমনকি ভবিষ্যতে পুরো একটি পরিবহন ইউনিটের নেতৃত্ব দেবেন। তাই এই উদ্যোগকে ভাইরাল করার জন্য নয়, সফল করার জন্য আলোচনা করি।
নারীদের সুযোগ দিন। সময় দিন। প্রশিক্ষণ দিন। নিরাপত্তা দিন। আধুনিক যান দিন।
দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান দিন। তারপর দেখুন—নারীরা কতদূর যেতে পারে। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু একটি স্লোগান নয়—সঠিক সুযোগ, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা দিলে এটি বাস্তবে রূপ নেয়।
লেখক: বাংলাদেশি যুব প্রতিনিধি, বিমস্টেক ইউথ লিডারশিপ এক্সচ্যাঞ্জ প্রোগ্রাম; প্রতিষ্ঠাতা, এলটিডিইজেড




