মিডল ইস্ট আইয়ের কলাম/লন্ডনের অভিজাত এলাকায় দুবাইয়ের ধনীদের বিলাসী জীবন কেমন?

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা। মধ্য লন্ডনের রাস্তায় তাপমাত্রা এরই মধ্যে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই। বলা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মকাল হতে যাচ্ছে।
অক্সফোর্ড স্ট্রিটের সেলফ্রিজেস বিপণিবিতানের বাইরে রোদের তীব্র তাপ। এক গৃহহীন ব্যক্তি সেখানে ভিক্ষা চাইছেন। পড়ে থাকা একটি বিনামূল্যের পত্রিকায় দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া দাবানলের খবর ছাপা হয়েছে। কিন্তু বিপণিবিতানের ভেতরে চমৎকার শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সেখানে একটি স্টলে অ্যারাবিক কফি বিক্রি হচ্ছে। স্টলটি মূলত সৌদি আরবের প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে। কারণ, এই বিখ্যাত বিপণিবিতানটির ৪০ শতাংশ মালিকানা এখন সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) হাতে।
গত সপ্তাহে এই সেলফ্রিজেসের সামনে দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলেন দুবাইয়ের শাসক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম। কাছেই নর্থ অডলি স্ট্রিটে সুদানের যুদ্ধে আমিরাতের সম্পৃক্ততার প্রতিবাদে তাকে তোপের মুখে পড়তে হয়।
রাস্তার ওপার থেকে এক সুদানি ব্যক্তি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমিরাত আমার দেশের মানুষকে হত্যা করছে, আমার দেশের মানুষকে মারা বন্ধ করো।’ তখন দুবাইয়ের শাসকের বিশাল বহর থেকে একজন ওই সুদানি ব্যক্তির দিকে এগিয়ে যান। তাকে ‘কালো কুত্তী’ বলে গালি দেন।
মোহাম্মদ বিন রশিদ এখনও লন্ডনে আছেন। সেখানে তিনি আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাকে চেলসি এলাকায়ও দেখা গেছে। একসময় ষাটের দশকের উচ্ছলতার জন্য পরিচিত এই এলাকাটি এখন বেশ অভিজাত।
তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী নাগরিকদের জন্য লন্ডনে আসল ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হয়ে উঠেছে মেফেয়ার এলাকা। নর্থ অডলি স্ট্রিটও এই এলাকারই অংশ। এই রাস্তায় দুবাইয়ের শাসক ও তার সঙ্গীদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম ধনী এলাকা এটি। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ, দামি গাড়ির শোরুম ও বিশাল সব হোটেলে ভরপুর এই এলাকা।
সেলফ্রিজেসের ভেতরে কথা হয় ১৫ বছর বয়সি খালেদ ও তার ৫৩ বছর বয়সি মামা মোহাম্মদের সঙ্গে। তারা দুবাই থেকে বেড়াতে এসেছেন।
বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খালেদ বলে, ‘আমরা লন্ডনে আসি কারণ এখানে আমাদের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই।’
দুবাইয়ের শাসকের সঙ্গে ঘটা ওই ঘটনা নিয়ে মিডল ইস্ট আইয়ের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়। খালেদ বলে, ‘সুদানিরা বেশ অজ্ঞ। আমরা সুদানকে সাহায্য করছি। আমরা সেখানে মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছি। ওই লোকটার আচরণ খুবই অসম্মানজনক ছিল।’
মোহাম্মদের বাবা একজন সেনাসদস্য ছিলেন। তেল আবিষ্কারের আগে দুবাইয়ের সেই ‘সাধারণ ও কঠিন’ জীবনের স্মৃতি এখনও তার মনে আছে। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনার বাকস্বাধীনতা থাকতেই পারে। কিন্তু একজন নেতার সঙ্গে আপনি ওভাবে কথা বলতে পারেন না। এটা কোনো সম্মানের লক্ষণ নয়।’
মোহাম্মদ জানান, আজকের দিনে আমিরাতে যে কেউ চাইলে কয়েক মিনিটের মধ্যে যে কোনো কিছু পেতে পারে। কেউ না কেউ সেটা ঠিকই আপনার কাছে পৌঁছে দেবে। এর জন্য আপনাকে জায়গামতো উঠেও যেতে হবে না।
পরিবারটি তিন সপ্তাহের জন্য মেফেয়ারে থাকছে। প্রতি আগস্টেই তারা এই সফরে আসে। লন্ডন শহরটি যে আমিরাতি টাকায় ভরে আছে, এটা তাদের বেশ ভালো লাগে। এর ফলে শহরটিকে তাদের খুব আপন মনে হয়। তা ছাড়া যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমিরাতের পুরোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ককেও তারা ইতিবাচক চোখেই দেখে।
খালেদের পরিকল্পনা আছে লন্ডনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। মোহাম্মদ বিন রশিদ, মোহাম্মদ বিন জায়েদসহ আমিরাতের অন্যান্য নেতারাও যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করেছেন বা সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
খালেদ বলেন, ‘আমার এখানে খুব ভালো লাগে। খুব বেশি গরম নেই।’
লন্ডনের সবচেয়ে গরমের দিনেও দুবাইয়ের চেয়ে এখানকার তাপমাত্রা প্রায় ১০ ডিগ্রি কম থাকে। দুবাইয়ের জীবন পুরোটাই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত।
পরিবারটি অক্সফোর্ড ও হ্যাম্পশায়ারেও ঘুরতে যায়। তবে দুবাইয়ের এই কিশোরের কাছে লন্ডন বলতে কেবল এই শহরের অভিজাত কেন্দ্রগুলোই বোঝায়।
মোবাইল বের করে নিজের প্রিয় জায়গাগুলোর একটি মানচিত্র দেখায় খালেদ। সে বলে, ‘আমরা ওই সব জায়গায় যাই না, যেখানে রাস্তার বখাটেরা থাকে, অনেক অভিবাসী ঘোরে বা চুরি-ছিনতাই হয়।’ তার ওই তালিকায় থাকা জায়গাগুলো মেফেয়ারের খুব একটা বাইরে নয়। একে সে ‘উপসাগরীয়দের আড্ডার প্রধান জায়গা’ বলে উল্লেখ করে। এর মধ্যে সিপরিয়ানি, আইভি এশিয়া, সেক্সি ফিশ, সুপারনোভা এবং নোবুর মতো রেস্তোরাঁগুলোর নাম রয়েছে।
লন্ডনের কেন্দ্রস্থলের বাইরের এলাকা নিয়ে খালেদের মতো একই আতঙ্কের কথা জানান এক সৌদি নারী। তার পরিচিত এক কিশোরের লন্ডন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি এ কথা জানান। ওই কিশোর সৌদি আরবের কোনো অভিজাত পরিবারের সদস্য নয়। সে সৌদি কিশোরদের জন্য আয়োজিত একটি আবাসিক সামার স্কুলে অংশ নিতে লন্ডনে এসেছে। কিন্তু প্রতিদিন স্কুল থেকে পালিয়ে সে হ্যারডস নামের বিখ্যাত বিপণিবিতানে চলে যায়। বিপণিবিতানটি এখন কাতার সরকারের মালিকানায় রয়েছে।
ওই কিশোর স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, তার একজন দেহরক্ষী দরকার। কারণ তার ভাষ্যমতে, ‘এখানকার মানুষেরা এতই গরিব যে, তারা আমার হারমেস ব্র্যান্ডের জিনিস ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আমাকে ছুরি মারতে পারে।’
সেলফ্রিজেসে দেখা যায় বাহরাইন থেকে আসা ১৫ ও ১৭ বছর বয়সী দুই বোনকে। তারা জানায়, ‘এখানে এমন অনেক কিছু আছে, যা আমাদের দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। দেশের অনেক মানুষের সঙ্গেও এখানে দেখা হয়।’ মেফেয়ারে ঘুরতে গিয়ে তাদের স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গেও দেখা হয়ে গেছে। এমনকি এমন অনেক মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যাদের লন্ডনে থাকার কথা তারা জানতই না।
তারা আরও বলেন, ‘যখন আমরা হ্যারডসে যাই, তখন উপসাগরীয় এলাকার অনেক মানুষ দেখতে পাই। বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা হয়। এখানে গরম নেই বললেই চলে। দেশে তো সব সময় এসির ভেতরেই থাকতে হয়।’
মেফেয়ারের পরিবেশ ওই দুই বোনের কাছে পরিচিত মনে হলেও লন্ডনের অন্যান্য বিষয় তাদের কাছে বেশ অচেনা লাগে। তারা জানায়, ‘বাহরাইনে আমরা খুব একটা গণপরিবহন ব্যবহার করি না। কিন্তু এখানকার পাতালরেল বেশ ভিড় আর বিশৃঙ্খলায় ভরপুর। এখানকার ভবনগুলোর নকশাও বেশ আলাদা।’
সেলফ্রিজেসের রাস্তার উল্টো পাশেই নর্থ অডলি স্ট্রিট। সেখানে মার্লবোরো পাব নামের একটি মদের দোকানে দিনের প্রথম বিয়ার এসে পৌঁছেছে। তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এক বাবা নিজের ফোনে স্ক্রল করছেন, আর তার সন্তান তিন চাকার সাইকেলে বসে চিৎকার করছে। উইনস্টন চার্চিলের সপ্তদশ শতাব্দীর এক পূর্বপুরুষের নামে পাবটির নামকরণ করা হয়েছে।
বিয়ার পান করা ওই দলটি ছাড়া রাস্তার প্রায় পুরোটাই উপসাগরীয় পর্যটকদের দখলে। কুয়েতের দুজন লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সার সারা ও এলাফ একে অপরের ছবি তুলছেন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তার মালা পরা এক বয়স্ক নারী তাদের দেখে হাসলেন। হুস করে একটি বুগাত্তি গাড়ি পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
সারা বলেন, ‘আমরা বেশির ভাগ সময় এই মেফেয়ারেই কাটাই। আমরা আবহাওয়া, মানুষজন আর কেনাকাটার টানে এখানে আসি। দেশে এমন অনেক ব্র্যান্ড পাওয়া যায় না, যা এখানে আছে। এখানকার আবহাওয়া আমাদের জন্য বেশ দারুণ। আমরা নভেম্বরেও আসি, কারণ আমরা শীত পছন্দ করি এবং বড়দিনের আমেজটা উপভোগ করি।’
মেফেয়ারের গ্রেজ অ্যান্টিক মার্কেটে ৮০টিরও বেশি স্বাধীন ব্যবসায়ীর দোকান রয়েছে। সেখানকার এক অলংকার ব্যবসায়ী মিডল ইস্ট আইকে জানান, আগস্ট মাসে তিনি কখনো ছুটিতে যান না। কারণ, ঠিক এই সময়েই উপসাগরীয় ধনী পর্যটকেরা এখানে আসেন।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ করে আগস্ট মাসে। আমি এখন কোনোভাবেই দূরে যেতে পারি না।’
সৌদি আরব, বাহরাইন ও আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্যরা এই মার্কেটে কেনাকাটা করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘গত সপ্তাহে এক থাই রাজকুমারী এসেছিলেন। তার সঙ্গে মাত্র ২০ জন অনুসারী ছিল। অথচ তার বাবা, অর্থাৎ রাজার সঙ্গে ১০০ জন থাকেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেফেয়ার একদিক থেকে আরব বিশ্বের মক্কা হয়ে উঠেছে। তারা দামি আর নিখুঁত জিনিস ভালোবাসে। পুরুষেরা এখানে রুপার অলংকার কিনতে আসে। আর নারীরা আসেন কারণ তারা জানেন, কার্টিয়ের, টিফানি আর বুলগারির মতো ব্র্যান্ডগুলো এখানে বেশ ভালো ছাড়ে পাওয়া যায়।’
তার ভাষায়, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের কম বয়সী মেয়েরা চোখের পলকে একটা ছোট গয়নার পেছনে হাজার পাউন্ড খরচ করে ফেলে। এক নারী অবলীলায় সাড়ে ১৮ হাজার পাউন্ড দিয়ে একটি গয়না কিনে নেন। তিনি জানতেন, অন্য কোথাও গেলে এর দ্বিগুণ দাম দিতে হতো।’
ইউক্রেন যুদ্ধের আগে লন্ডনে প্রচুর রুশ নাগরিক ও তাদের বিপুল টাকার ছড়াছড়ি ছিল। তখন শহরটিকে অনেকেই ‘লন্ডনগ্রাদ’ বলে ডাকতেন। ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি আগে অনেক রুশ ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসা করেছি। কিন্তু এখন তারা ডুবন্ত জাহাজ থেকে ইঁদুরের মতো পালিয়েছে। যে কজন রুশ এখনো এখানে আছে, তাদের কাছে কোনো টাকা নেই।’
মেফেয়ারের ঠিক মাঝখানে রয়েছে গ্রোসভেনর স্কয়ার। ১৭৮৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এটি ছিল ব্রিটেনে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের আবাসস্থল। বর্তমানে পুরোনো বিশাল দূতাবাস ভবনটি একটি বিলাসবহুল হোটেলে পরিণত হয়েছে। এর ভেতরে অনেকগুলো রেস্তোরাঁ রয়েছে।
এগুলোর মধ্যে কাতার মালিকানাধীন কিনওয়ান ক্যাফে অন্যতম। এটিও উপসাগরীয় ধনীদের আরেকটি আড্ডার জায়গা। এখানে তিনটি ছোট চিকেন স্যান্ডউইচের দাম ২০ পাউন্ড। লন্ডনে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা চাইলে দেশে পাওয়া যায় এমন ফিলিস্তিনি খেজুরও এখান থেকে কিনতে পারেন।
আবায়া পরা নারী এবং পোলো শার্ট পরা পুরুষেরা নিজেদের ফোনে বুঁদ হয়ে আছেন। তারা কফির ছবি তুলে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করছেন। বাইরে নিজের ভ্যানে বসে পরের ডাকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন দক্ষিণ লন্ডনের ডেলিভারি চালক হাশ। রোদে পোড়া গরমের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘মেফেয়ার মানেই টাকা।’
তিনি জানান, ছয় বছর আগে স্কটল্যান্ডে একবার ডেলিভারি দিয়ে তিনি দিনে ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত আয় করতেন। আর এখন দিনে ১০০ পাউন্ড আয় করতে পারলেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়।
গ্রোসভেনর স্কয়ারের বাইরে প্যাটিসেরি ‘মারচাসি’-কে ঘিরে উপসাগরীয় পর্যটকদের লম্বা লাইন। এটি ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর বার্কলি স্কয়ারে রোদের আলোয় ঝকঝক করছে ফেরারির শোরুম।
গ্রিন পার্ক আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের ভেতরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। যাত্রীদের উদ্দেশে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে যে, চারটি লাইন আংশিক বন্ধ আছে এবং আরও অনেক লাইনে তীব্র বিলম্ব হচ্ছে।
লেখক পরিচিতি: লন্ডনে বসবাসরত ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক। তিনি মধ্যপ্রাচ্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে মিডল ইস্ট আইয়ের অন্যতম নিয়মিত প্রতিবেদক।





