আলজাজিরার কলাম/ইরান যুদ্ধের পর নতুন যুগে প্রবেশ করেছে সাইবার যুদ্ধ

যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র সাইবার হামলার কারণে চার দিন বন্ধ ছিল। এই ঘটনাটিকে বিশ্বের সবারই খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। এর থেকে ধারণা পাওয়া যায় ইরান যুদ্ধ ভবিষ্যতে আরও কীভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি পৃথিবীর সব দেশের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করছে যে, সাইবার বা ডিজিটাল দুনিয়ায় এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তাদের প্রস্তুত হতে হবে।
হ্যাকাররা যুক্তরাজ্যের যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে হামলা করেছিল, সেটি আকারে বেশ ছোট ছিল এবং এতে দেশের পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কোনো বড় ক্ষতি হয়নি। কিন্তু শুধু কতটুকু বিদ্যুৎ নষ্ট হলো, তা দিয়ে এই হামলার গুরুত্ব বিচার করা ভুল হবে। আসল প্রশ্ন হলো লক্ষ্যবস্তু যদি আরও বড় হয়, তখন কী ঘটবে?
এমন আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি অন্য জায়গায়ও দেখা গেছে। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১২টি অঙ্গরাজ্যের পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় সম্প্রতি সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। শুধু মিনেসোটা রাজ্যেই ৩০টির বেশি এলাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর জর্জিয়া রাজ্যে একটি হামলার কারণে পানির চাপ কমে যায় এবং বাসিন্দাদের পানি ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মার্কিন সরকার প্রকাশ্যে এই হামলার জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেনি, তবে প্রতিবেদনগুলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত একটি হ্যাকার গ্রুপের দিকে ইঙ্গিত করে। এই ঘটনাগুলো সাইবার নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে।
এতদিন মানুষ মনে করত সাইবার হামলা মানেই শুধু তথ্য বা ডেটা চুরি করা। যেমন—পাসওয়ার্ড চুরি করা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করা, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা বা কোনো কোম্পানির কম্পিউটার লক করে দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু বিদ্যুৎ বা পানির মতো জরুরি সেবার ওপর হামলা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই ডিজিটাল সিস্টেমগুলো সরাসরি আমাদের বাস্তব পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে।
একটি সমাজকে সচল রাখতে বিদ্যুৎ তৈরি ও বণ্টন করতে হয়, পানি পাম্প ও পরিশোধন করতে হয়, যাতায়াত ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হয় এবং যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সচল রাখতে হয়। আর আজকাল এই সমস্ত জরুরি সেবার মূল ভিত্তিই হয়ে দাঁড়িয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।
আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের কাজকে অনেক সহজ ও উন্নত করেছে, তবে এটি হ্যাকারদের জন্য হামলার সুযোগও বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বিশেষভাবে সতর্ক করেছে যে, ইরানের হ্যাকাররা ইন্টারনেট-সংযুক্ত এমন কিছু বিশেষ শিল্প প্রযুক্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে যা বাস্তব জীবনের বড় বড় যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করে। ইতোমধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পানি, জ্বালানি ও সরকারি সেবার কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করেছে।
সাইবার যুদ্ধে ভৌগোলিক অবস্থান কোনো বড় নিরাপত্তা দেয় না, তাই মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার মাইল দূরে বসে থাকলেও যেকোনো দেশ এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যবহৃত প্রযুক্তি বা যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণে কিংবা আক্রমণকারী কেবল বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায় বলেই দূর-দূরান্তের যেকোনো পরিকাঠামো হামলার শিকার হতে পারে।
আমাদের মনে রাখা উচিত, সব হামলার লক্ষ্যই কিন্তু বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো নয়। হ্যাকাররা অনেক সময় কেবল গোপন তথ্য সংগ্রহ করা, ক্ষণস্থায়ী ব্যাঘাত ঘটানো, প্রচার পাওয়া, অন্যায় সুবিধা নেওয়া কিংবা তারা যে নিরাপত্তা ভেদ করতে পারে তা প্রমাণ করার জন্যও হামলা চালায়। আর এই কারণেই ছোট ছোট ঘটনাগুলোকেও অবহেলা করা যায় না। একটি ছোট কেন্দ্রে হামলার তাৎক্ষণিক ক্ষতি কম হলেও, এর মাধ্যমে হ্যাকারদের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় হলো, আধুনিক জরুরি সেবাগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেমন বিদ্যুৎ ছাড়া পানি পরিশোধন করা যায় না, আবার যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ফলে হ্যাকারদের পুরো দেশের সব সিস্টেম নষ্ট করার দরকার পড়ে না; একটি সফল হামলার কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা যদি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবেই দেশজুড়ে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সব হামলা শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এই ধারণা নিয়ে বসে থাকা বিপজ্জনক। তার চেয়ে বরং নিরাপত্তা ভেঙে হ্যাকাররা ঢুকে পড়ার পর কী করতে হবে, সেই প্রস্তুতি রাখা জরুরি। যেমন: কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক হলেও জরুরি সেবা সচল রাখা যাবে কি না, স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম আলাদা করা সম্ভব কি না, অথবা প্রয়োজনে সরাসরি হাতে কলমে যন্ত্রপাতি চালানো যাবে কি না।
এ কারণেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুশীলন করতে বলেছে যেন কম্পিউটার সিস্টেম অচল হয়ে গেলেও তারা দ্রুত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ সচল রাখতে পারে। কারণ সাইবার সহনশীলতার আসল অর্থই হলো প্রযুক্তি যখন ব্যর্থ হবে, তখনও বাস্তব জগতকে সচল রাখার ক্ষমতা থাকা।
সেই প্রযুক্তি বিপুল কার্যক্ষমতা তৈরি করে, তবে এটি আক্রমণকারীদের জন্যও সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রে, কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে ইরান-সংশ্লিষ্ট অভিনেতাদের সম্পর্কে সতর্ক করেছে যারা ইন্টারনেট-সংযুক্ত প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার কে লক্ষ্যবস্তু করছে, যা বাস্তব সরঞ্জাম এবং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত একটি শিল্প প্রযুক্তি। মার্কিন সংস্থাগুলো পানি, জ্বালানি এবং সরকারি পরিষেবাগুলোতে এই ধরনের কার্যকলাপ শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে এমন কিছু প্রচেষ্টাও রয়েছে যা কার্যক্ষমতা ব্যাহত করেছে।
এটি ইরান দ্বন্দ্বের সেই অংশ যা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলোরও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাইবার যুদ্ধে ভৌগোলিক অবস্থান খুব কমই সুরক্ষা দেয়।
কোনো সংস্থাকে এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে হলে তেহরান বা তেল আবিবে বসে থাকার প্রয়োজন নেই। হাজার হাজার মাইল দূরের অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে কারণ এটি যে দেশে পরিচালিত হচ্ছে, যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, এর সরবরাহকারী বা কেবল একজন আক্রমণকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ দেখছে বলে।
প্রতিটি আক্রমণের উদ্দেশ্যই ক্ষতি করা এমনটা ধরে নেওয়ার ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। একজন আক্রমণকারী তথ্য সংগ্রহ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, প্রচার বা বাড়তি সুবিধা চাইতে পারে। তারা কেবল প্রমাণ করতে চাইতে পারে যে তারা প্রবেশ করতে সক্ষম।
এটিই ছোট ছোট ঘটনাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। যদি কোনো আক্রমণকারী অপেক্ষাকৃত ছোট কোনো কেন্দ্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তবে তাৎক্ষণিক পরিণতি সীমিত হতে পারে, কিন্তু সেই প্রবেশাধিকার নিজেই আমাদের তাদের সক্ষমতা এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়।
আরেকটি সমস্যা রয়েছে যা সরকারগুলো উপেক্ষা করতে পারে না: গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না।
জ্বালানি সহায়তা দেয় যোগাযোগ, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থসংস্থান এবং শিল্প খাতে। যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থপ্রদান এবং জরুরি পরিষেবাগুলোর ভিত্তি। পানি ব্যবস্থার জন্য বিদ্যুৎ এবং ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। একটি সফল আক্রমণের জন্য পুরো জাতীয় ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার প্রয়োজন হয় না; গুরুতর পরিণতি তৈরি হতে পারে যদি বিশৃঙ্খলা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল সংস্থাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
সাইবার নিরাপত্তায় আক্রমণকারীদের ভেতরে ঢোকা প্রতিরোধ করার ওপর ভিত্তি করে কৌশল তৈরি করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা রয়েছে। প্রতিরোধ অপরিহার্য, তবে কোনো সরকার বা কোম্পানি বাস্তবসম্মতভাবে এই অনুমানের ওপর কাজ করতে পারে না যে প্রতিটি আক্রমণই প্রতিহত করা যাবে।
সরকার এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এখনই নিজেদের ঝুঁকির জায়গাগুলো পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে যে সমস্ত প্রযুক্তি সরাসরি ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত, সেগুলোর দিকে বেশি নজর দিতে হবে। সেই সাথে যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের নিরাপত্তা যাচাই করা এবং সমস্ত প্রতিরক্ষা থাকা সত্ত্বেও হ্যাকাররা যদি সফল হয়েই যায় তবে কী করতে হবে, তার প্রস্তুতি এখনই নেওয়া প্রয়োজন।
গত কয়েক সপ্তাহের কঠিন শিক্ষা হলো, সাইবার নিরাপত্তা এখন আর শুধু সাধারণ তথ্য বাঁচানোর বিষয় নয়। যখন সাইবার হামলার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া যায়, তখন সাইবার নিরাপত্তা মানে হয়ে দাঁড়ায় পুরো সমাজকে সচল রাখার লড়াই।
তাই আমাদের এখনই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। কারণ বড় কোনো হামলা চলাকালীন সময়ে নিজেদের পরিকাঠামোর দুর্বলতা খুঁজতে বসলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
লেখক পরিচিতি
গ্রায়েম স্টুয়ার্ট একজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]





