Advertisement

সুপার এল নিনো ২০২৬-এর সম্ভাব্য চরম প্রভাবে বাংলাদেশে তীব্র তাপদাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

শেখ মো. শিপন আলী
সুপার এল নিনো ২০২৬-এর সম্ভাব্য চরম প্রভাবে বাংলাদেশে তীব্র তাপদাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

পরিবেশ দূষণের ফলে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো (El Nino) আবারও বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এল নিনো হলো নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি জলবায়ুগত ঘটনা, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও বন্যার ধরনে প্রভাব ফেলে। একটি শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ সাধারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বিশেষ করে নিরক্ষীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার চরমতা (extream weather events) বাড়িয়ে দেয়।

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ মতে, ২০২৬ সালের এল নিনোটি একটি শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়া ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে।

গত ২ জুন জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ‘এল নিনো-২০২৬’ সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়ে বিশ্ববাসীকে আগামী মাসগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল অবকাঠামোর কারণে বাংলাদেশ এ ধরনের বৈশ্বিক জলবায়ু অস্থিরতার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণে একটি দেশ। এল নিনো (El Nino) সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর পরপর হয়ে থাকে এবং ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়ে থাকে।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের এল নিনো (El Nino) বাংলাদেশের উপর সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল, বিশেষ করে তীব্র তাপদাহ, বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা, কৃষি ঝুঁকি, স্বাস্থ্য সংকট এবং জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়; যশোরে প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত রেকর্ড হয়। অনেক জেলায় ‘severe heatwave’ অবস্থা তৈরি হয়েছিল।

1
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ এর সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপদাহ যা নগর ও গ্রামীণ জীবনে নানামুখী সংকট তৈরি করবে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং ঢাকাসহ অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ‘Urban Heat Island’ প্রভাবের ফলে তাপদাহ আরও তীব্র হবে। যা হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতা, শ্রমজীবী মানুষের শ্রমঘণ্টা হ্রাস, কৃষি ও নির্মাণ শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা হ্রাস করবে। ২০২৬ সালে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি বাংলাদেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়া এল নিনোর ফলে তাপমাত্রাগত ঝুঁকিকে আরও তীব্র করবে। বৃদ্ধি পাবে বজ্রপাত, খরা ও আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের ঘটনা ও প্রাণহানি বেড়েছে। অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিতিশীলতা বজ্রঝড় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিতে খরা ও তাপপ্রবাহের পাশাপাশি আকস্মিক বজ্রপাত ও ঝোড়ো আবহাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, কারণ উচ্চ তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি এবং তীব্রতর করতে ভূমিকা রাখে। সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।

অনিয়মিত বা বিলম্বিত বর্ষার ফলে খরা ও পানির সংকটের ফলে কৃষি খাতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা কারণ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এল নিনো সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত ও উষ্ণ আবহাওয়া সৃষ্টি করতে পারে। যা আমন ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি ও মৎস্য খাত এর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তীব্র গরম ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে বোরো ধানের সেচনির্ভরতা ও ব্যয় বৃদ্ধি পাবে ফলে কৃষি কৃষি উৎপাদনে ব্যয় বাড়বে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষুদ্র কৃষক সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে। এ ছাড়া তাপজনিত প্রভাবে সবজি, ফল ও গবাদিপশুর উৎপাদনে ক্ষতির আশঙ্কা এবং জলাশয়ে পানির তাপমাত্রা বাড়ায় মাছের উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়বে। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টিসহ জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। কৃষি সম্পদ ও কৃষিনির্ভর বিনিয়োগ ক্ষতির কারণে বীমা খাতে দাবি (claims) বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হতে পারে।

এল নিনোর প্রভাব কেবল আবহাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত চাপ ও লোডশেডিং ঝুঁকি সৃষ্টির মাধ্যমে জ্বালানি খাত ও জাতীয় অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত তাপদাহের কারণে ফ্যান, এসি ও সেচ পাম্প ব্যবহারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে যা অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কারণ হবে।

তাপজনিত অসুস্থতা, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং রোগ বিস্তারে স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়বে। তীব্র গরমের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মশাবাহিত রোগের দ্রুত বিস্তার এবং খাদ্য ও পানির সরবরাহ কমে যাওয়া। শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। চরম গরমে শিশু ও বয়স্করা হিট এক্সহসশন, ডিহাইড্রেশন ও ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

২০২৬ সালে ‘সুপার এল নিনো’ বাস্তবে কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার ওপর। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশের জন্য আগাম প্রস্তুতি ছাড়া বিকল্প নেই। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দুর্যোগের সময় প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ অনেক বেশি কার্যকর ও কম ব্যয়বহুল। এল নিনো (El Nino) যেহেতু ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়ে থাকে তাই সম্ভাব্য তীব্র তাপদাহ, কৃষি সংকট, বজ্রপাত, পানি ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বীমা খাত ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি।

বাংলাদেশর মত জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশের জন্য এল নিনো কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, পানি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, অর্থনীতি এবং জীবিকাকে একসঙ্গে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এল নিনোর মত compound risk বা বহুস্তরীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় যেসকল সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন—

  • এল নিনো পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক আবহাওয়া তথ্যের সঙ্গে জাতীয় তথ্যের সমন্বয় ও আবহাওয়া পূর্বাভাস উন্নত করা।
  • ঝুঁকিভিত্তিক জেলা ও উপজেলা মানচিত্র প্রস্তুত করা এবং কৃষক, মৎস্যজীবী ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সহজ ভাষায় ঝুঁকি বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
  • খরা-প্রবণ অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর, খাল ও জলাধার পুনঃখনন, ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা।
  • কৃষকদের জন্য আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ সেবা জোরদার করা, স্বল্পমেয়াদি ও খরা-সহনশীল ধানের জাত সম্প্রসারণ, ডাল, তেলবীজ ও শাকসবজি চাষের মাধ্যমে ফসল বৈচিত্র্যকরণ এবং কৃষি বীমা চালু করা।
  • ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও সরকারি খাদ্য মজুত বৃদ্ধি।
  • স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগের নজরদারি, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি ওষুধ ও স্যালাইনের মজুত বৃদ্ধি।
  • তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় Heat Action Plan প্রণয়ন ও জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা।
  • জলাভূমি, বন ও নদী সংরক্ষণ, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ সম্প্রসারণ, সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ।

লেখক: শেখ মো. শিপন আলী, সভাপতি, যুব পরিবেশবিদ সমিতি বাংলাদেশ (ইয়েসবিডি)।