Advertisement

আলজাজিরার কলাম/মোহাম্মদ আলীর জীবন আমাদের শান্তির যে বার্তা দেয়

আমিনা মোহাম্মদ
মোহাম্মদ আলীর জীবন আমাদের শান্তির যে বার্তা দেয়
১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলী। ছবি: জাতিসংঘের সৌজন্যে।

২০১৬ সালের ৩ জুন কিংবদন্তি মার্কিন বক্সার মোহাম্মদ আলী ৭৪ বছর বয়সে মারা যান। পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার ১০ বছর পরও তার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়। তবে এই শব্দ কোনো বক্সিং রিংয়ের গর্জন বা ভিড়ের চিৎকার নয়। এটি শোনা যায় জাতিসংঘে আমার অফিসের ঠিক বাইরের একটি করিডোরে।

সেখানের দেয়ালে একটি জলরং ছবি ঝুলছে। এটি খোদ মোহাম্মদ আলীর নিজের আঁকা। ছবিটিতে তিনি জাতিসংঘের সদর দপ্তরকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশ্বজুড়ে মানুষ শান্তির যে স্বপ্ন দেখে, ছবিটিতে যেন সেই আকুলতাই ফুটে উঠেছে।

মোহাম্মদ আলী ১৯৭৮ সালে এটি এঁকেছিলেন। এরপর তিনি নিজেই জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের হাতে এটি তুলে দেন। তিনি এই শিল্পকর্মের নাম দিয়েছিলেন ‘শান্তির উপহার’। এটি কেবল একটি ছবি নয়; বরং এটি তার সাহসিকতা ও বিশ্বাসের এক মেলবন্ধন। শান্তি যে মানবতার সবচেয়ে বড় ডাক, এই ছবি তারই প্রতীক।

ছবির তুলির টানগুলো খুব সহজ ও সাধারণ। তবে এর পেছনের আন্তরিকতা অনবদ্য। একজন মানুষ রিংয়ের বাইরেও মর্যাদার লড়াই কীভাবে করতে হয়, তিনি তা জানতেন। এই ছবি তারই এক সাক্ষ্য।

ছবির সঙ্গে দেওয়া একটি চিঠিতে মোহাম্মদ আলী এমন কিছু কথা লিখেছিলেন, যা আজও আমাকে থমকে দেয়। তিনি লিখেছিলেন, ‘অন্যের সেবা করাই হলো এই পৃথিবীতে আমাদের থাকার ভাড়া।’

প্রতিদিন আমি এই কথাগুলো দেখি। এখন এটি আর কেবল কোনো উদ্ধৃতি মনে হয় না; বরং একে মনে হয় এক বিশাল আহ্বান। যুদ্ধ, বৈষম্য আর বিভক্তির এই যুগে আমরা একে অপরের জন্য কী করতে পারি, এটি সেই বার্তাই দেয়।

১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের হাতে নিজের আঁকা ছবি তুলে দিচ্ছেন মোহাম্মদ আলী। ছবি: জাতিসংঘের সৌজন্যে।
১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের হাতে নিজের আঁকা ছবি তুলে দিচ্ছেন মোহাম্মদ আলী। ছবি: জাতিসংঘের সৌজন্যে।

তার বিদায়ের ১০ বছর পর এই বার্তা এখন কেন আরও জরুরি মনে হচ্ছে? কারণ আমরা এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। চারদিকে যুদ্ধ আর ঘৃণা বাড়ছে। প্রযুক্তির লাগামহীন বিস্তার আর নারী-শিশুদের অধিকারের ওপর আঘাত শান্তিকে বিপন্ন করে তুলছে।

তবে আলীর সেই ছবি আমাদের সহজ এক সত্য মনে করিয়ে দেয়। শান্তি এখনো সম্ভব। কিন্তু সে জন্য শান্তি রক্ষাকে আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

যেখানে নীরব থাকা নিরাপদ, সেখানে প্রতিবাদ করার ফল কী হতে পারে, তা মোহাম্মদ আলী জানতেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল। বর্ণবাদ আর অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য তিনি শাস্তিও পেয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো হার মানেননি। সত্যের আওয়াজ তুলে ধরতে তিনি নিজের খ্যাতিকে ব্যবহার করেছেন।

যখন তিনি এই ছবিটি জাতিসংঘে নিয়ে এসেছিলেন, তখন তিনি আসলে নিজের জীবনের শিক্ষাটাই দিয়ে গেছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাহসের প্রয়োজন হয়। এটি কেবল একজন যোদ্ধার সাহস নয়, বরং একজন শান্তিকামীর সাহস।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি শান্তির এই বার্তাটি জাতিসংঘের ওপর সঁপে দিয়েছিলেন। অনেক কঠিন সময়ে আমি যখন এই ছবিটির দিকে তাকাই, তখন মনে পড়ে—শান্তি তাদের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়, যারা সহিংসতাকে শেষ কথা হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়।

জাতিসংঘকে লেখা মোহাম্মদ আলীর একটি চিঠি। ছবি: জাতিসংঘের সৌজন্যে।
জাতিসংঘকে লেখা মোহাম্মদ আলীর একটি চিঠি। ছবি: জাতিসংঘের সৌজন্যে।

জাতিসংঘকে নিয়ে তার আঁকা এই ছবিটি যেমন বিনম্র, তেমনি আশাবাদী। সম্ভবত তিনি এভাবেই আমাদের দেখতে চেয়েছিলেন। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা যে এক বিশ্ব পরিবার হিসেবে কাজ করছি, তিনি সেটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।

তার মৃত্যুর এক দশক পূর্ণ হওয়ার এই সময়ে আমি নিজেকে প্রশ্ন করি—আজ মোহাম্মদ আলী আমাদের কাছে কী চাইতেন?

আমার বিশ্বাস, তিনি আমাদের একে অপরের বিরুদ্ধে নয়, বরং একে অপরের জন্য লড়তে বলতেন। তিনি চাইতেন আমরা যেন নিজের অধিকার রক্ষার মতোই অন্যের মানবাধিকার রক্ষায় অটল থাকি। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াই, কণ্ঠহীনের কণ্ঠস্বর হই। ঘৃণা আর উদাসীনতা ত্যাগ করে শান্তির পথ বেছে নিই।

১০ বছর পর আলীর এই ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শান্তি কোনো তৈরি বস্তু নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের কাজ ও কথার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।

এটাই আমাদের ভাড়া। আর শান্তিপ্রিয় এই পৃথিবীকে এটিই আমাদের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার।


আলজাজিরা থেকে অনূদিত

লেখক: আমিনা মোহাম্মদ বর্তমানে জাতিসংঘের উপমহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।