logo

ইরান হামলার পরিকল্পনা ৩০ বছর আগেই করা?

ইরান হামলার পরিকল্পনা ৩০ বছর আগেই করা?

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক ও অবৈধ হামলার কারণ বুঝতে হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করলে চলবে না। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ, ইরানের পারমাণবিক চুক্তির ১১ বছরে পদার্পণ, অথবা ৯/১১-এর বছরে নয়। যেতে হবে প্রায় ৩০ বছর আগে, ১৯৯৬ সালে। সেটা ছিল ঐতিহাসিক এক সন্ধিক্ষণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ। যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইলেন একদল আমেরিকান নব্য রক্ষণশীল বুদ্ধিজীবী।

ইসরায়েলে তখন সদ্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার জন্য এই আমেরিকান গোষ্ঠীটি তৈরি করল একটি কৌশলপত্র বা স্ট্র্যাটেজি পেপার। নাম দেওয়া হলো ‘এ ক্লিন ব্রেক: এ নিউ স্ট্র্যাটেজি ফর সিকিউরিং দ্য রিলম’। এই নথির লেখক ছিলেন রিচার্ড পার্লে, ডগলাস ফেইথ, ডেভিড ওয়ার্মসার। তারা সবাই পরে জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিলেন।

তাদের পরামর্শ ছিল একটাই পুরোনো কূটনৈতিক পথ ছেড়ে দাও। ইসরায়েলের উচিত দীর্ঘদিনের নীতি ‘শান্তির বিনিময়ে ভূমি’ ছুড়ে ফেলে দেওয়া। এর বদলে করতে হবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ, এমনকি প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সরকার বদলে দেওয়া। সহজ কথায়, আলোচনার টেবিল নয় বরং যুদ্ধের ময়দানই হোক সমাধানের জায়গা। এই একটি দলিলের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পরবর্তী তিন দশকের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বীজ।

তাদের লক্ষ্য ছিল একদম স্পষ্ট। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইরান। সেই কৌশলপত্রে সরাসরি বলা হয়েছিল, সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে, সিরিয়ায় আঘাত হানতে হবে এবং ইরানের প্রভাব থেকে লেবাননকে মুক্ত করতে হবে। সেই সময় এটাকে মনে হয়েছিল কিছু উগ্র মতাদর্শীর অলীক স্বপ্ন। কিন্তু আজ পেছনে ফিরে তাকালে নীলনকশা মনে হয়।

একই নব্য রক্ষণশীলদের সমর্থনে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করল। সাদ্দাম হোসেন উৎখাত হলেন, ইরাক পুড়ে গেল গৃহযুদ্ধের দাবানলে। তারপর একের পর এক লিবিয়া, সিরিয়া, গাজায় বারবার হামলা এবং ইরানের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ল। প্রতিবার হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অজুহাত বদলেছে। কখনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র, কখনও মানবিক সংকট, কখনও সন্ত্রাসবিরোধ, কখনও-বা গণতন্ত্র রক্ষার অজুহাত। কিন্তু আসল কৌশলগত লক্ষ্য একই থেকেছে। অর্থাৎ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সরকারগুলোকে দুর্বল করো অথবা উৎখাত করো এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য ইসরায়েলের পক্ষে ঢেলে সাজাও।

ইরান হয়তো ছিল প্রথম ডোমিনো। কিন্তু ইরান ছিল সবসময়ই চূড়ান্ত লক্ষ্য।

ছবি: সংগৃহীত

‘ক্লিন ব্রেক’-এর সহ-লেখক ডেভিড ওয়ার্মসার নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকেই প্রকাশ্যে লিখে যাচ্ছিলেন ইরানের মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা। ৯/১১-এর আগেও একই সুরে লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠনে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরে ডেভিড ওয়ার্মসার ডিক চেনি ও জন বোল্টনের অধীনে কাজ করেছিলেন।

তবে এর কোনোটাই জল্পনা বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। সবকিছু লেখা ছিল। সাদা কাগজে কালো কালিতে।

ট্রাম্প হয়তো নিজেকে নব্য রক্ষণশীলদের বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি নিজেকে ঠিক তাদের দিয়েই ঘিরে রেখেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একজন নব্য রক্ষণশীল। ট্রাম্পের কানের কাছে সবসময় ফিসফিস করা সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও একজন নব্য রক্ষণশীল। আসলে ২০০০-এর দশকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী এই নব্য রক্ষণশীল নেটওয়ার্ক কখনো বিলুপ্ত হয়নি। শুধু নতুন রূপে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে এলিয়ট আব্রামসের কথা ধরা যাক। রিগ্যান ও বুশ প্রশাসনের এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ‘প্রজেক্ট ফর অ্যা নিউ আমেরিকানা সেঞ্চুরি’র অন্যতম নেতা ছিলেন, এবং ‘ক্লিন ব্রেক’ কৌশলপত্রে বর্ণিত আগ্রাসী মধ্যপ্রাচ্য নীতির দীর্ঘদিনের সমর্থক। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি ভেনেজুয়েলায় বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করেছেন। তারপর ইরান বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

আরেকটি উদাহরণ হলো ডেভিড ফেইথ। তিনি 'ক্লিন ব্রেক'-এর সহ-লেখক ও সাবেক বুশ প্রশাসনের কট্টর যুদ্ধবাদী ডগলাস ফেইথের ছেলে। ছোট ফেইথ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্টেট ডিপার্টমেন্টে এবং দ্বিতীয় মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে কাজ করেছেন।

সাংবাদিক ও গবেষক নাফিজহ আহমেদ সম্প্রতি বাইলাইন টাইমসে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, আব্রামস ও ফেইথ এখন ‘ভ্যান্ডেনবার্গ কোয়ালিশন’ নামের একটি উগ্র বৈদেশিক নীতি গোষ্ঠীর মাধ্যম কাজ করছেন। সেখানে শীর্ঘস্থানীয় সব নব্য রক্ষণশীলরা একত্রিত হয়েছেন।

এই জোটের কাজ কী? তারা নীতিপত্র, কৌশল দলিল এবং বিশেষভাবে জনমত জরিপ প্রকাশ করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ট্রাম্পকে দেখানো যে তার মাগা (এমএজিএ) সমর্থকরা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান সমর্থন করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখা উচিত।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই ভ্যান্ডেনবার্গ কোয়ালিশন ‘শতাব্দীর চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যের সমাধান’ শিরোনামে ১৬ পৃষ্ঠার একটি রূপরেখা প্রকাশ করে। সেখানে আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনকে বলা হয়, ইরানে বিরুদ্ধে ‘জাতীয় শক্তির সকল উপাদান’ ব্যবহার করতে হবে। ‘সর্বোচ্চ চাপ’ দিতে হবে। ইসরায়েলের সঙ্গে জোট আরও মজবুত করতে হবে, ফিলিস্তিনিদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর তহবিল বন্ধ করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। 

গবেষক নাফিজ আহজমেদ লিখেছেন, এই প্রস্তাবগুলো ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসনের তাৎক্ষণিক নীতিগত পদক্ষেপের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। বার্তাটা পরিষ্কার ছিল যে, ট্রাম্পের আমেরিকাকে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

এরপর যা ঘটল তা আমরা জানি। ট্রাম্প হলেন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি নব্য রক্ষণশীলদের পরামর্শ মেনে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানে সরাসরি আঘাত হানলেন। যদিও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ট্রাম্পের নিজের কোনো সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নেই। তিনি একই বক্তৃতায় কখনো বিচ্ছিন্নতার কথা বলেন, কখনো যুদ্ধের হুমকি দেন। তিনি এই ইরান-বিরোধী এজেন্ডার স্থপতি নন। বড়জোর তিনি একজন সুবিধাজনক চরিত্র, যার হাত দিয়ে তিন দশকের পুরোনো একটি পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিল।

৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যুদ্ধবাজদের একটি নেটওয়ার্ক সরাসরি এবং গর্বের সঙ্গে বলে আসছিল যে, শত্রু সরকারগুলোকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সাজাতে হবে। ইরাক ছিল প্রথম পদক্ষেপ, সিরিয়াও এই পরিকল্পনার অংশ ছিল। কিন্তু ইরান ছিল সবসময়ই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। 

আজ যদি ১৯৯৬ সালের ‘ক্লিন ব্রেক’ কৌশলপত্রটি পড়া যায়, তাহলে বিষয়বস্তু আর অপরিচিত মনে হবে না। বরং অতি চেনা মনে হয়। যে প্রস্তাবগুলো একসময় চরমপন্থি ও বেআইনি মনে হতো, সেগুলো এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

লেখক পরিচিতি: ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম জেটিও-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক