logo

প্রবৃদ্ধির হিসাব, মানুষের জীবন

প্রবৃদ্ধির হিসাব, মানুষের জীবন
এম এম মুসা। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি শুধু কত শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধি কী ধরনের কাজ তৈরি করবে, নতুন প্রজন্মের জন্য কতটা সুযোগ সৃষ্টি করবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন বাড়াতে কতটা সহায়তা করবে এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাবে। একটি অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেও যদি পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারে, বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারে এবং সামাজিক বৈষম্য কমাতে ব্যর্থ হয়, তবে তার উন্নয়নভিত্তি দুর্বল থেকে যায়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের মূল্যায়ন এই প্রশ্নগুলোকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সফর শেষে সংস্থাটির কর্মীরা সতর্ক করেছেন, রাজস্ব আহরণ ও ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে চলে যেতে পারে। একই বিবৃতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

এই পূর্বাভাসকে আতঙ্ক সৃষ্টির উপকরণ হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। সংস্কারের লক্ষ্য শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক ঠিক করা হলে তা অসম্পূর্ণ থাকবে। প্রয়োজন এমন সংস্কার, যা উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করবে, কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সক্ষমতা শক্তিশালী করবে।

কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির সীমা

বাংলাদেশের উন্নয়নের অভিজ্ঞতায় তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী শ্রম, কৃষি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব খাত বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে যাওয়া তরুণদের জন্য যথেষ্ট মানসম্মত কাজ তৈরি করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থান শুধু চাকরির সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কাজটি কতটা নিয়মিত, আয় কতটা স্থিতিশীল, শ্রমিকের নিরাপত্তা আছে কি না, দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে কি না এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ছে কি না- এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা বহু মানুষের আয় অনিশ্চিত, সামাজিক সুরক্ষা সীমিত এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা কম। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও তাদের জীবনমান দ্রুত উন্নত নাও হতে পারে।

আইএমএফের মূল্যায়নে তরুণদের কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং বেসরকারি খাতের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কাজ তৈরি হয়; দক্ষ শ্রমশক্তি থাকলে বিনিয়োগের ফলন বাড়ে; আর ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হন।

তাই কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি পৃথক সামাজিক লক্ষ্য হিসেবে না দেখে প্রতিটি বড় নীতির ফলাফল হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। করনীতি, সুদের হার, শিল্পনীতি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ-সবকিছুর সঙ্গে কাজের সুযোগ তৈরির সম্পর্ক নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না

বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে প্রত্যাশিত মুনাফা, নীতির স্থিতিশীলতা, অর্থায়নের খরচ, অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক এবং ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকির ওপর। অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বেশি হলে উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা, প্রযুক্তি বা কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়; উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার ব্যবসার ব্যয় বাড়ায়; আবার নীতির ঘনঘন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

আইএমএফের জানুয়ারির মূল্যায়নে দুর্বল বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সীমাবদ্ধতার একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ অবস্থায় শুধু বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নীতির পূর্বানুমেয়তা, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, জমি ও অবকাঠামোপ্রাপ্তি, কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি তার গুণগত দিকও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, প্রযুক্তি স্থানান্তর করে, স্থানীয় সরবরাহকারীকে যুক্ত করে এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নত করে- এমন বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুফল দেয়। বিপরীতে, শুধু করছাড় বা সস্তা জমির ওপর নির্ভরশীল বিনিয়োগ অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য অর্থায়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাদের জামানত, হিসাবরক্ষণ এবং ঋণসংক্রান্ত নথি প্রস্তুতের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে। ব্যাংকিং সংস্কারের ফলে ঋণ যাচাই কঠোর হওয়া প্রয়োজন হলেও উৎপাদনশীল ক্ষুদ্র উদ্যোগ যেন অযথা অর্থায়ন থেকে বাদ না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ মূল্যায়নে ব্যবসার বাস্তব সক্ষমতা, লেনদেনের তথ্য এবং নগদ প্রবাহকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণ: পোশাকশিল্পের বাইরে যাওয়ার কৌশল

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর। এই খাত দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কিন্তু একটি প্রধান পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈশ্বিক চাহিদা, বাণিজ্যনীতি, শ্রমমান এবং ক্রেতাদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের মুখে অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণ বলতে শুধু নতুন পণ্য রপ্তানি শুরু করা বোঝায় না। এর অর্থ হলো নতুন বাজারে প্রবেশ, উচ্চতর মূল্য সংযোজন, মানসম্পন্ন উৎপাদন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি। ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে এগিয়ে যেতে হলে বাজারভিত্তিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে নীতির ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। কোনো খাতকে শুধু সম্ভাবনাময় ঘোষণা করে প্রণোদনা দিলে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে ওঠে না। বরং দক্ষতা উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পরিবহন, মান যাচাইয়ের অবকাঠামো, বন্দর ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা তৈরি করতে হয়। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রণোদনার কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার, যাতে সরকারি সহায়তা প্রকৃত উৎপাদনশীলতা ও বাজার সম্প্রসারণে অবদান রাখে।

রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার ও পরিবেশগত মানের সম্পর্কও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার ক্রমেই উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, শ্রমপরিবেশ এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তাই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর অর্থ শুধু কম খরচে পণ্য তৈরি নয়; বরং নির্ভরযোগ্য, মানসম্পন্ন ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা।

রাজস্ব সংস্কার ও সামাজিক ন্যায্যতা

সরকারের হাতে পর্যাপ্ত রাজস্ব না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো এবং জলবায়ু অভিযোজনে বিনিয়োগ সীমিত হয়ে পড়ে। আইএমএফ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ভর্তুকি যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এই সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে গিয়ে যদি করের ভার এমনভাবে পড়ে যে ক্ষুদ্র ব্যবসা, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার কিংবা উৎপাদনশীল উদ্যোগ অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সংস্কারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে। আবার করজাল সম্প্রসারণ না করে শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন।

একটি ন্যায়সংগত রাজস্ব সংস্কারে কর অব্যাহতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং করদাতার জন্য নিয়ম সহজ করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান বাড়াতে হবে। যে প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা উৎপাদনশীলতা, জনসেবা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা অবদান রাখছে- এই প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে থাকা উচিত।

ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সব ভর্তুকি সমানভাবে কার্যকর নয়; কিছু ভর্তুকি উৎপাদন ও জনকল্যাণে সহায়ক, অন্য কিছু দুর্বলভাবে লক্ষ্যভিত্তিক হওয়ায় সচ্ছল জনগোষ্ঠীও তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারে। তাই কোন ভর্তুকি রাখা হবে, কোনটি পুনর্গঠন করা হবে এবং কোন ক্ষেত্রে সরাসরি সহায়তা বেশি কার্যকর হবে- সিদ্ধান্ত নিতে হবে তথ্য ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

সামাজিক সুরক্ষা: সংস্কারের নিরাপত্তাবলয়

অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছু মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। জ্বালানি বা খাদ্যের দাম বাড়লে, কোনো খাতে কর্মসংস্থান কমলে কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যয় বাড়লে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে সেই পরিবার, যাদের সঞ্চয় কম এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত।

আইএমএফের জুলাইয়ের বিবৃতিতে রাজস্ব সংস্কারের প্রভাব মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সুপারিশের বাস্তব অর্থ হলো- সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষাকে একই নীতিপ্যাকেজের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

সামাজিক সহায়তা কার্যকর করতে উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যের নির্ভুলতা, নিয়মিত অর্থপ্রদান এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই পরিবার যেন একাধিক কর্মসূচিতে অযথা সুবিধা না পায়, আবার যোগ্য পরিবার যেন তথ্যের ঘাটতি বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বাদ না পড়ে- সে জন্য সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা দরকার।

তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করলেই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না। যাদের পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল সংযোগ কিংবা ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সক্ষমতা সীমিত, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের প্রয়োজন আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত।

সামাজিক সুরক্ষা কেবল দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও অংশ। মানুষের ন্যূনতম ভোগক্ষমতা বজায় থাকলে সংকটের সময়ে চাহিদার পতন কিছুটা সামাল দেওয়া যায় এবং পরিবারগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা উৎপাদনশীল সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি কমে।

সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি

অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রযুক্তিগত যুক্তি যতই শক্তিশালী হোক, তা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন। করব্যবস্থা বদলানো, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস এবং বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন স্বার্থগোষ্ঠী থাকতে পারে, যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার সুবিধা হারাতে অনিচ্ছুক।

এই বাধা মোকাবিলায় সংস্কারের লক্ষ্য, ব্যয়, সম্ভাব্য সুফল এবং সময়সীমা স্পষ্ট করা দরকার। কারা স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং তাদের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও প্রকাশ করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য শুধু আইন বা নীতিমালা গ্রহণের সংখ্যা নয়, বাস্তব ফলাফল দেখতে হবে- যেমন রাজস্ব আহরণে উন্নতি, ব্যাংকের সম্পদের মান সম্পর্কে স্বচ্ছতা, নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সহায়তার আওতা।

আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়ন বা পরামর্শ নীতিনির্ধারণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সংস্কারের মালিকানা দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে থাকতে হবে। নীতি বাস্তবায়নের দায় এড়িয়ে শুধু আন্তর্জাতিক শর্তের ওপর দায় চাপালে জবাবদিহি দুর্বল হয়। একইভাবে, সংস্কারের প্রয়োজন অস্বীকার করে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিলেও অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর হবে না।

একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা

বাংলাদেশের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে তিন ধাপে অগ্রসর হওয়া। প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে কর প্রশাসন সংস্কার, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের অর্থায়ন বাড়ানোর কাজ এগিয়ে নিতে হবে। তৃতীয় ধাপে দক্ষতা উন্নয়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদন থাকা দরকার। সংস্কারের ফলাফল শুধু জাতীয় পর্যায়ের সূচকে নয়, অঞ্চল, লিঙ্গ, বয়স ও আয়ের স্তরভেদেও মূল্যায়ন করা উচিত। এতে বোঝা যাবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল কারা পাচ্ছে এবং কোথায় নতুন নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে ঝুঁকি রয়েছে, কিন্তু সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়নি। জনসংখ্যার কর্মক্ষম অংশ, উদ্যোক্তার উদ্যোগ, প্রবাসী শ্রমিকের অবদান এবং শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই সম্পদ কাজে লাগাতে হলে আর্থিক শৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবেশ একসঙ্গে তৈরি করতে হবে।

অর্থনৈতিক সংস্কারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, বরং মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দিয়ে। তরুণেরা কাজ পাচ্ছেন কি না, ক্ষুদ্র ব্যবসা টিকে থাকতে পারছে কি না, পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে কি না এবং সংকটের সময়ে দুর্বল মানুষ সুরক্ষা পাচ্ছেন কি না- এসব প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তরই হবে সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য।

লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক