সবার আগে বাংলাদেশ/বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের উদ্যোগ, অগ্রগতি এবং আগামীর প্রত্যাশা

একটি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন কোনো রাষ্ট্রের সামগ্রিক সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ণয়ের জন্য বড় কোনো সময় নয়। তবে এই সময়টুকু সরকারের সুচিন্তিত অগ্রাধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার স্বকীয় দর্শন এবং ভবিষ্যৎ পথরেখা অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন পর্যালোচনা করে আমার কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, তাহলো- রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, সুশাসন, প্রযুক্তি এবং জাতীয় স্বার্থকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনতে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। সরকার নিজেও স্বীকার করেছে যে, ১৮০ দিনে প্রতিটি খাতে শতভাগ সাফল্য তারা অর্জন করতে পারেননি। এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাও জবাবদিহিতার একটি অংশ।
আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে যা, তাহলো, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভাবনাটি। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হলে এর মূল্য সীমিত ছিল। কিন্তু অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, মানুষের মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ চিন্তার মধ্যে একে স্টান্ডার্ড হিসেবে কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এই দর্শনকে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর নীতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সরকারের নথিতে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বহুমুখীকরণের বিষয়টিকে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে যেতে হবে।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিশৃঙ্খল অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ছিল সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। সেখানে মূল্যস্ফীতি কমে ৯.১৬ শতাংশে আসা এবং বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করার বিষয়টি প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও সবুজ শিল্পসহ আরও তিনটি খাত মিলিয়ে মোট ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক সূচনা। দেশের বাস্তবতাটাকে বিবেচনায় নিতে হবে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রকৃত পরীক্ষার মূল্যায়ন করবেন সাধারণ জনগণ। তারা দেখবে বাজার ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে এলো, বিনিয়োগ কতটা বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ দিতে পারল এবং তরুণদের জন্য টেকসই কাজের সুযোগ কতটা সৃষ্টি হলো।
একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা খাতের উদ্যোগগুলোকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি পেলেন, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং দেখতে হয়, সেই শিক্ষার্থী কতটা জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারছে, কতটা সমস্যা সমাধান করতে পারছে, কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে। সরকার এই দিকটা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাকে, বিশেষত উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে, ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং শিক্ষা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর অংশীদারত্বের ওপর জোর দিয়েছে। পাঠ্যক্রম সংস্কার, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির কথা বলা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সময়োপযোগী। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। তাকে জ্ঞান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সমাজ ও শিল্পের বাস্তব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।
শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো এবং ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে; সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। বিশেষ করে ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে। তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা অর্থায়ন, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীদের ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ ও ‘প্রবলেম সলভিং’ এর সক্ষমতা-বৃদ্ধি সমান গুরুত্বপূর্ণ। মোটকথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ‘সোশ্যালি রেসপন্সিভ’ করে তুলতে হবে।
কৃষিকে কেন্দ্র করে সরকারের উদ্যোগগুলোও যথেষ্ট সময়োপযোগী মনে করি। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা এখনো কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে সার, উন্নত বীজ, সেচ, কৃষিযন্ত্র ও অন্যান্য কৃষি উপকরণে সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা আরও স্বচ্ছভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি সম্প্রসারণসেবা, বাজারসংক্রান্ত তথ্য এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রি-পাইলটিং পর্যায়েই ২০ হাজারের বেশি কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণের ঘটনা এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতির একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত দেয়।
একই সঙ্গে খাল খনন, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের অপচয় কমানো ও ন্যায্য আয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের প্রকৃত সুরক্ষা নির্ভর করবে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো উপকরণ সরবরাহ, ন্যায্যমূল্য, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব হ্রাস এবং কৃষি প্রযুক্তি ও গবেষণার সুফল মাঠপর্যায়ে কতটা পৌঁছানো যায় তার ওপর। কৃষককে কেবল সহায়তার গ্রহীতা নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির উৎপাদনশীল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করাই হওয়া উচিত আগামীর কৃষিনীতির মূল ভিত্তি।
স্বাস্থ্যখাতেও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ, ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ডের পরিকল্পনা এবং উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সেবা-সহজিকরণের উপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত ব্যক্তির নিকট সুরক্ষা-সুবিধা পৌঁছাচ্ছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মসংস্থানের প্রশ্নে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এসএমই, স্টার্টআপ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা এবং ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ডের ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো তরুণদের জন্য অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু আমরা যদি বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনমিতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে চাই, তাহলে শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও শিল্পনীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। একটার সাথে আর একটাকে লিংক করতে হবে, সমন্বিত করতে হবে।
প্রশাসনের ক্ষেত্রেও কিছু কথা বলার আছে। প্রশাসনে দক্ষতা, ব্যয়-সংযম, মেধাভিত্তিক পদায়ন, ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতকরণ এবং জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি থেকে শক্তিশালী হবে এবং আইনের প্রয়োগ হবে সমান ও নিরপেক্ষ। আগামীর প্রত্যাশা তাই আরও সুবিশাল। আমাদের প্রয়োজন এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকবেন না। মানুষের জীবনের বাস্তব পরিবর্তনে তা দৃশ্যমান হবে; যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবনের শক্তিতে জাতীয় উন্নয়নকে এগিয়ে নেবে; যেখানে তরুণ সম্প্রদায় চাকরি না খুঁজে চাকরি সৃষ্টি করবে; এবং যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নাগরিকের আস্থা অর্জন করার লক্ষ্যে অঙ্গিকার নিয়ে মাঠে থাকবে।
সমন্বিতভাবে যদি দেখা হয় তাহলে বলতে হবে, বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম কোনো একক খাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত উন্নয়নধারা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। জনকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচর্চা ও জীবনবান্ধব বাজেটের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি, খাদ্যনিরাপত্তা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও আইনি সংস্কারের মতো বিষয় অগ্রাধিকার পেয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ, বাণিজ্য ও শিল্প, শ্রম ও কর্মসংস্থান, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ক্রীড়া, নগর ব্যবস্থাপনা, ভূমিসেবা সংস্কার, ধর্ম ও সম্প্রীতি, বিচারব্যবস্থার সংস্কার, খাল খনন ও পানি ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, তথ্য ও সম্প্রচার, প্রযুক্তি, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, গণপূর্ত এবং জনপ্রশাসনকেও একই জাতীয় অগ্রযাত্রার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। খাতভিত্তিক বিন্যাস থেকে স্পষ্ট, সরকারের লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং অর্থনীতি, মানবসম্পদ, সামাজিক সুরক্ষা, সুশাসন, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। একটি রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন এসব খাত বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত নীতির আওতায় পরিচালিত হয়।
সবশেষে বলা যায়, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ধবংসপ্রাপ্ত অবস্থা ও রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা হতে উত্তরণে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন নিঃসন্দেহে একটি যাত্রার শুভ সূচনা, একটি ভিত্তি- যার উপর নির্মিত হবে বাংলাদেশের সুদৃঢ় এক ভবিষ্যৎ। মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি থেকে আমাদেরকে এখন একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে, ঠিক যেমন ১৯৭৫-এ ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের পর অরাজক পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। দেশকে দিয়েছিলেন শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি। সুতরাং এবারও আমাদেরকে উপর্যুক্ত ঘোষিত উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং ভুল থেকে শেখার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। প্রতিটি কাজের চূড়ান্ত মানদণ্ড আমাদের হতে হবে একটিই, সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।
লেখক: কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
