গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ/কিমকে ‘খুশি করতে’ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়া কমাচ্ছেন ট্রাম্প, ক্ষুব্ধ মার্কিন আইনপ্রণেতারা

সিউলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ৭৩ বছরের পুরোনো সামরিক জোটকে দুর্বল করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত পদক্ষেপকে ‘অর্থহীন’ এবং ‘অদূরদর্শী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন আইনপ্রণেতারা সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
উত্তর কোরিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করার মাত্র কয়েক দিন পর হঠাৎ করেই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর জন্য পেন্টাগনকে নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত স্বৈরশাসক কিম জং-উনকে প্রতিহত করতেই মূলত এই ধরনের মহড়া চালানো হয়। তবে ট্রাম্প তার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, কিম জং-উনের সঙ্গে তার ‘অত্যন্ত সুসম্পর্ক’ রয়েছে।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে এই নির্দেশনার কথা ঘোষণা করেন। তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নামক ১১ দিনব্যাপী একটি মহড়া সংকুচিত করার নির্দেশ দেন। ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এই মহড়াতে প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনার অংশ নেওয়ার কথা ছিল। এই মহড়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং সাইবার হামলার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল।
উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডার বাড়ানো সত্ত্বেও দেশটিকে ‘হুমকিহীন এবং শ্রদ্ধাশীল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্তকে তিনি কিমের প্রতি এক ধরণের সৌজন্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প লিখেছেন, এই মহড়াগুলো উত্তর কোরিয়ার কাছে এমন এক বার্তা পাঠায় যা ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত এবং শত্রুতাপূর্ণ’।
কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা বলেছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কোনো কারণ ছাড়াই কিমকে প্রচারণামূলক লড়াইয়ে একচেটিয়া জয় এনে দিল। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের এক অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি না হওয়ার কারণে তাদের এক বিশ্বস্ত মিত্রকে খেসারত দিতে হচ্ছে।
সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জ্যাক রিড একে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার বিশৃঙ্খল প্রশাসনের আরেকটি অর্থহীন ও এলোমেলো সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন।
এক বিবৃতিতে জ্যাক রিড বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন একজন স্বৈরশাসককে খুশি করতে সামরিক মহড়া কমিয়ে দেন কিংবা নিজের শুরু করা যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় দক্ষিণ কোরিয়াকে শাস্তি দেন, তখন আমাদের সব মিত্র ও শত্রু ভাববে যে আমেরিকার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আলোচনা সাপেক্ষ।’ তিনি এই পদক্ষেপকে কেবল ‘ট্রাম্পের অহংকার চরিতার্থ করার জন্য দক্ষিণ কোরিয়াকে বিনা কারণে শাস্তি দেওয়ার’ শামিল বলে বর্ণনা করেন।
একই কমিটির সদস্য অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলিও জ্যাক রিডের সতর্কবার্তার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই মহড়াগুলো কেবল প্রতীকী নয়, বরং যেকোনো সংকটে এই দুই দেশের জোটের কার্যকারিতার ভিত্তি। কেলি বলেন, ‘উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনো তাত্ত্বিকভাবে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের মিত্রকে রক্ষা করার সক্ষমতা তখনই বজায় থাকবে যখন আমাদের বাহিনী ভালোভাবে প্রশিক্ষিত থাকবে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবে। এই যৌথ মহড়াকে অকার্যকর করা একটি অদূরদর্শী এবং বড় ভুল সিদ্ধান্ত।’
গত সোমবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প দাবি করেন যে কিম জং-উন তার কূটনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছেন, তবে তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি তাকে বুঝি। সেও আমাকে বোঝে।’
ট্রাম্প এখন যে জোটে ফাটল ধরাচ্ছেন, তা মূলত কোরিয়া যুদ্ধের অবসানের পর ১৯৫৩ সালে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’র ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। দক্ষিণ কোরিয়ায় এখনও প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তাদের পেছনে রয়েছে একটি যৌথ মার্কিন-দক্ষিণ কোরীয় কমান্ড কাঠামো এবং সিউলকে পরমাণু সুরক্ষার ছাতার নিচে রাখার ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি।
ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে ‘হুমকিহীন’ বললেও তার নিজের প্রশাসনের ২০২৬ সালের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়নে উত্তর কোরিয়াকে ‘ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসী শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে উত্তর কোরিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র, প্রচলিত বাহিনী এবং সাইবার অপারেশনগুলো যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জন্য হুমকিস্বরূপ। ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড গত মার্চে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার আইসিবিএম (আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র) ইতোমধ্যেই মার্কিন ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে।’
ট্রাম্প তার এই সিদ্ধান্তকে ইরান যুদ্ধের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে অংশ নিতে সিউলের অস্বীকৃতির কারণে তিনি নিজের অসন্তুষ্টির কথা জানান। ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানের কারণে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ শেষ হয়ে গেছে এবং তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে এই দুটি বিষয়ের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, তবুও তিনি উভয়ের জের ধরেই সিউলকে শাস্তি দিচ্ছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কোরিয়ার বিষয়টি কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও আমি সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ অভিযানে আমাদের সাথে যোগ দিতে চায় কি না, এবং তারা বলেছিল, “না, ধন্যবাদ”!’
সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সদস্য ও নিউ জার্সির সিনেটর অ্যান্ডি কিম বলেছেন, যৌথ মহড়াকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়াটা তাদের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের প্রতি অসম্মানজনক মনোভাব প্রকাশ করে।
অ্যান্ডি কিম বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আমাদের জোট মার্কিন নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমি চিন্তিত যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আজকের পোস্টটি এই অংশীদারত্বের প্রতি চরম অবজ্ঞাকে নির্দেশ করে। দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি অপরিহার্য অংশীদার। সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ না ঝেড়ে আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে যথোপযুক্ত সম্মানজনক আচরণ করা।’
যৌথ সামরিক মহড়াকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ট্রাম্প এবারই প্রথম ব্যবহার করছেন না। এর আগে ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে কিম জং-উনের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এই মহড়াগুলোকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং উসকানিমূলক বলে সরাসরি স্থগিত করেছিলেন। পরবর্তীতে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে পরমাণু কূটনীতি ভেস্তে গেলে নিঃশব্দে এই মহড়াগুলো পুনরায় চালু করা হয়েছিল।
এই বিরোধের সমান্তরালে দক্ষিণ কোরিয়া বিগত বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে নিজস্ব কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পদক্ষেপে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছিল এবং ইসরায়েলকে ‘অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের’ আহ্বান জানিয়েছিল।
গত এপ্রিলে জাতিসংঘে নিযুক্ত সিউলের রাষ্ট্রদূত নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড একতরফাভাবে দখল করার যেকোনো সিদ্ধান্ত ‘অবশ্যই বাতিল’ করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে দুইবার বিরোধে জড়িয়েছেন। প্রথমবার এপ্রিলে, যখন তিনি এক ফিলিস্তিনি নাগরিকের লাশের প্রতি ইসরায়েলি সেনার নির্মম আচরণকে নাৎসি ‘হলোকস্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। দ্বিতীয়বার মে মাসে, যখন গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী জাহাজে থাকা দুজন দক্ষিণ কোরীয় সক্রিয় কর্মীকে আটক করেছিল ইসরায়েল।
উত্তর ক্যারোলিনার বিদায়ী রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস মন্তব্য করেছেন যে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব বা ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ পরোক্ষভাবে রাশিয়ার পক্ষেই যাবে। সামাজিক মাধ্যমে টিলিস লিখেছেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়া ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের একটি শক্তিশালী সামরিক মিত্র এবং তাদের চমৎকার সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়া কমানোর ফলে উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার সেনা মূলত যুদ্ধক্ষেত্রের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে, যা পুতিনকে ইউক্রেনীয় নাগরিকদের নিয়মতান্ত্রিক অপহরণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে সাহায্য করবে।’
লেখক পরিচিতি: জোসেফ গিডিওন মূলত ওয়াশিংটনভিত্তিক একজন সাংবাদিক। যিনি রাজনৈতিক ব্রেকিং নিউজ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন।



