দ্য হিন্দুর কলাম/ টানা ২৫ বছর ক্ষমতায় থেকে ভারতকে যেভাবে বদলে দিলেন নরেন্দ্র মোদি

নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে একটানা ২৫ বছর পূর্ণ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। এর মধ্যে সাড়ে ১২ বছর ছিলেন গুজরাটের গান্ধীনগরে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে, আর বাকি সাড়ে ১২ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে নয়াদিল্লিতে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে হারেননি। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতিতে এটি এক বিরল ঘটনা। যেখানে প্রতি পাঁচ বছর পরই সরকার বদলে দেওয়ার রেওয়াজ সাধারণ বিষয়, সেখানে এমন ধারাবাহিকতা সত্যিই ব্যতিক্রমী। তবে এই দীর্ঘ স্থায়িত্ব নিছকই একটি পরিসংখ্যান। আসল প্রশ্ন হলো, মোদি কি ভারত, দেশটির সমাজ আর জনগণকে এমনভাবে বদলে দিতে পেরেছেন যা তাঁর পরও স্থায়ী হবে? তিনি কি ভবিষ্যতের পথ দেখানোর মতো কোনো দর্শন রেখে যাচ্ছেন?
ইতিহাসের পাতায় এর একটা মাপকাঠি আছে। দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রনায়কেরা শুধু নথিপত্র বা রেকর্ড রেখে যান না, রেখে যান স্থায়ী নীতি ও আদর্শ। আর সেই নীতির আসল সার্থকতা প্রমাণিত হয় তখন, যখন বিরোধীরা ক্ষমতায় এসেও তা মেনে চলতে বাধ্য হয়। ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের ‘নিউ ডিল’ নীতি বহাল রেখেছিলেন। মার্গারেট থ্যাচারের মুক্তবাজার অর্থনীতির কাঠামোর ভেতর দাঁড়িয়েই টনি ব্লেয়ার গড়ে তুলেছিলেন ‘নিউ লেবার’। বড় সরকারের বিরুদ্ধে রোনাল্ড রেগানের অবস্থান মেনে নিয়েছিলেন বিল ক্লিনটনও। আর সিঙ্গাপুর তো এখনো চলছে লি কুয়ান ইউয়ের বেঁধে দেওয়া নিয়মেই। এই মানদণ্ডেই মোদির ২৫ বছরকে বিচার করা যাক।
কাজের শতভাগ শেষ করা
প্রথমত, নেওয়া কাজ পুরোপুরি শেষ করার মানসিকতা। ভারতের প্রশাসনে আগে একটা অদ্ভুত চল ছিল—কোনো লক্ষ্য ঘোষণা করা হতো, তার এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন করা হতো, আর বাকিটা ছেড়ে দেওয়া হতো পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। মোদির কাজের ধারা এর ঠিক উল্টো। কোনো কাজ হাতে নিলে তিনি তা সব দিক দিয়ে শেষ করেই ছাড়েন। গুজরাটের কথাই ধরা যাক। সেখানে বহুদিনের পানির সংকট ছিল নিত্যদিনের ভোগান্তি। তিনি লাখ লাখ ছোট চেক ড্যাম থেকে শুরু করে বিশাল নর্মদা বাঁধের কাজ শেষ করলেন। রাজ্যের সৌরাষ্ট্র ও কচ্ছে ঘরে ঘরে এবং চাষের জমিতে পানি পৌঁছে দিলেন। ফলে গুজরাটের পানির অভাব এখন দুঃস্বপ্নের ইতিহাস। ২০১১ সালে ভারতে মাত্র ৫৮ শতাংশ পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল। এরপর ৫৯ কোটির বেশি জনধন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা হলো। প্রায় ৭০ বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা কাশ্মীরের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ২০১৯ সালে পাকাপাকিভাবে বাতিল করলেন। নকশাল আন্দোলনকে সব সরকারই নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছিল। তিনি দিনক্ষণ ঠিক করে দিলেন এবং ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের সময়সীমার আগেই পার্লামেন্টে জানালেন নকশাল সমস্যার প্রায় ইতি ঘটেছে। ৫০০ বছরের লড়াইয়ের পর অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি হলো, যেখানে প্রতিবছর ১০ কোটির বেশি পুণ্যার্থী আসছেন। মোদির কাছে শতভাগ কাজ শেষ করাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য হিসাব।
হীনম্মন্যতার অবসান
দ্বিতীয়ত, পরমুখাপেক্ষী দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান। দশকের পর দশক ভারত পশ্চিমের দিকে চেয়ে থাকত। তারা কোনো পথে হাঁটলে ভারত পিছু নিত। প্রযুক্তি বা বড় কোনো নীতির ক্ষেত্রে ভারত কখনোই নিজে ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগোনোর সাহস দেখাত না। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। শ্রীহরিকোটা থেকে বেসরকারি উদ্যোগে মহাকাশ রকেট উৎক্ষেপণ হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শান্তি (শান্তি) আইনের মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আজ ভারতের তৈরি কিউআর কোড দিয়ে দিনে কোটি কোটি লেনদেন হচ্ছে। এই ডিজিটাল বিপ্লবের ধারণা ভারতের মাথা থেকেই এসেছে এবং বিশ্বজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে পাহেলগামের ঘটনার পর পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিপক্ষের বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত। বিশ্বের ইতিহাসে এমন ঘটনা এটাই প্রথম। এরপর ভারত অপেক্ষা করেছে প্রতিপক্ষ কখন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। ৩০ বছরের সামরিক জড়তা মাত্র চার দিনে মুছে দেওয়া হয়েছে।
উচ্চাশার বিস্তৃতি
তৃতীয়ত, বিশাল স্বপ্নের পরিধি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিমা বিশ্বে যখন করোনার টিকা দেওয়া শুরু হলো, ভারতীয়রা কিন্তু ভাবেননি তাদের পালা কবে আসবে। তারা ধরেই নিয়েছিল—টিকা এখনই মিলবে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে ভারতে দুটি টিকা তৈরি হলো এবং পরে ২২০ কোটির বেশি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। অথচ অতীতে কোনো টিকার জন্য ভারতকে কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হতো। বর্তমান ভারতীয় প্রজন্ম বিশ্বমানের নিচে কোনো কিছু ভাবতেই রাজি নয়। এর চেয়ে কম কিছুকে তারা ব্যর্থতা মনে করে। একই উচ্চাশা এখন ভারতের নতুন ট্রেন, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর, মাইক্রোচিপ কিংবা বিশ্বমানের স্মার্টফোন তৈরির ক্ষেত্রেও চোখে পড়ছে।
গণতন্ত্রের নতুন সংজ্ঞা
চতুর্থত, সাধারণের গণতন্ত্রকে নতুন রূপ দেওয়া। জাতিভেদ বা আঞ্চলিক পরিচয় একেবারেই গুরুত্ব হারিয়েছে তা নয়, তবে কেবল পরিচয়ের জোরে এখন আর জাতীয় স্তরে কোনো নির্বাচন জেতা সম্ভব নয়। ‘আমি অমুক জাতের’ কিংবা ‘আমি অমুক বংশের লোক’—এই রাজনীতি এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। প্রতিটি দলকেই এখন কাজের হিসাব দিতে হয়। বিরোধী দলগুলোর ইশতেহারেও এখন কেবল প্রতিশ্রুতির বদলে বাস্তবায়নের ‘গ্যারান্টি’ দিতে হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো পরপর তিন মেয়াদে কেন্দ্রে ক্ষমতায় ফেরা এবং একের পর এক রাজ্যে পুরো মেয়াদ শেষ করেও বারবার নির্বাচিত হওয়া। অর্থাৎ, মানুষের কাছে সেবা ও প্রতিশ্রুতি পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় ভোট ব্যাংক।
সভ্যতার আত্মমর্যাদা
পঞ্চমত, নিজস্ব সভ্যতার পুনর্জাগরণ। এই প্রথম ভারতের শীর্ষ পদে এমন এক নেতা বসেছেন, যিনি ভারতের সনাতন ঐতিহ্য, বহুত্ববাদী শিকড় আর ঐতিহাসিক অর্জন নিয়ে কোনো রাখঢাক না রেখে গর্ব করেন। তাঁর কাছে রামমন্দির প্রতিষ্ঠা আর মহাকাশ অভিযান গগনযানের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই। মোদি ভারতের সভ্যতা ও ঐতিহ্যে উত্তর ভারতের আধিপত্যের পুরোনো বাম-নেহরুভিয়ান বয়ান ভেঙে দিয়েছেন। তিনি তামিল সংস্কৃতিকে ঠিক ততটাই আগ্রহ নিয়ে তুলে ধরেন, যতটা বাঙালি নবজাগরণ নিয়ে কথা বলেন। এই ভাবনা ভারতের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও গভীরভাবে শেকড় গেড়েছে। তা কান্তারা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়। বক্স অফিস এখন সেসব ছবিকেই পুরস্কৃত করছে। ভবিষ্যতে কোনো নেতা বা দল এই জাতীয় পরিচয়কে অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারবে না। এই পুনর্জাগরণ শত্রুর সামনে মাথানত না করে আধুনিক জাতি হিসেবে ভারতকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে।
মানুষের আত্মসম্মান রক্ষা
ষষ্ঠত, মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। বিগত ৬০ বছর ধরে দরিদ্র মানুষ ছিল রাজনীতির এক প্রদর্শনীর মতো। তাদের গণনা করা হতো, ছবি তোলা হতো, নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো; অথচ তাদের ঠিক ততটাই গরিব রাখা হতো যাতে ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মোদি এই লোকদেখানো রাজনীতি ভেঙে মানুষের দোরগোড়ায় অধিকার পৌঁছে দিয়েছেন। নারীর নামে পাকা বাড়ি, শৌচাগার, রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার, জামানতবিহীন ঋণ এবং পরিবারের সবার জন্য স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করেছেন। মাত্র নয় বছরে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। মহিলারা এখন নিছক ভাতার গ্রাহক নন, তাঁরা ‘লাখপতি দিদি’ হয়ে উঠেছেন। আইন করে আইনসভায় তাঁদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করা হয়েছে। পুরোনো সেই লোকদেখানো রাজনীতিতে ফিরে গিয়ে এখন আর কোনো নেতার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
মোদি যেসব পরিবর্তনকে স্থায়ী রূপ দিয়েছেন, সেগুলোকে অস্বীকার করা এখন অসম্ভব। কোনো কাজে অর্ধেক সমাধান রাখা চলবে না, সমস্যা জিইয়ে রাখা যাবে না। ভারতকে সবসময় সামনের সারিতে থাকতে হবে। উচ্চাশা হতে হবে বিশ্বমানের। রাজনীতি টিকবে সেবা দেওয়ার ওপর। প্রান্তিক মানুষকে হাত পেতে নয়, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার সুযোগ দিতে হবে।
আজ চারপাশের দিকে তাকিয়ে ভেবে দেখুন—এর কোনো একটি নীতি কি কেউ আর বদলে ফেলতে চাইবে? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে পরিষ্কার বোঝা যায় কেন নরেন্দ্র মোদি টানা ২৫ বছর ধরে দেশের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এবং আগামী বহু দশক ধরে তিনিই ভারতের জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেবেন।
লেখক পরিচিতি:
অখিলেশ মিশ্র ভারতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্লুক্রাফট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।
