
ওমার আরতান হতে পারতেন বিশ্বকাপ আসরে বাঁশি বাজানো প্রথম সোমালি রেফারি। ২০১৮ সাল থেকে তিনি ফিফার স্বীকৃত রেফারি। ২০২৩ সালে তিনি আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালে তিনি মহাদেশীয় বর্ষসেরা রেফারির খেতাবও পান। কিন্তু গত সপ্তাহে মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে আটকে দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি।
আরতানকে কেন নিষিদ্ধ করা হলো, তার কোনো দাপ্তরিক কারণ দেখায়নি যুক্তরাষ্ট্র সরকার। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় সোমালিয়ার নাম আছে।
সরকারি একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছে, আরতানের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ থাকতে পারে। এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে।
এই আচরণের সোজাসাপ্টা আরেকটি নাম হলো বর্ণবাদ।
এই কলঙ্কজনক সিদ্ধান্ত কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। সোমালিয়াসহ ৩৯টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে লাওস, সিয়েরা লিওন, বুর্কিনা ফাসো, মালি, নাইজার ও দক্ষিণ সুদানের মতো দেশগুলোও আছে।
এর অর্থ হলো, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া চারভাগের একভাগ দেশের দর্শক ও খেলোয়াড়েরা এখন ভিসা জটিলতায় পড়ছেন। ফিফা বলে, ‘ফুটবল বিশ্বকে এক করে’। অথচ এবারের বিশ্বকাপ মানুষকে আরও বিভক্ত করার হুমকি দিচ্ছে।
এমন এক প্রশাসন বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক, যারা যখন-তখন মানুষকে বন্দি করছে বা দেশ থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কয়েক মাস ধরেই এই টুর্নামেন্ট নিয়ে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এটি কেবল কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং খেলোয়াড়, দর্শক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও একটি মানবাধিকার সংকট।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতি ও গণগ্রেপ্তার প্রক্রিয়া।
গত জানুয়ারিতে মার্কিন অভিবাসন পুলিশ আইসিই-এর এজেন্টের গুলিতে রিনি গুড মারা যান। দুই সপ্তাহ পর মারা যান অ্যালেক্স প্রেত্তি। চলতি বছর আইসিই-এর হেফাজতে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত জুনে প্রায় ৫ লাখ বৈধ অভিবাসীকে তাড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যত মানুষ ফাইনাল খেলা দেখবে, এই সংখ্যা তার চেয়েও ছয় গুণ বেশি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আইসিই বাহিনীই বিশ্বকাপের নিরাপত্তা দেখভাল করবে।
ফিফা বা যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখনো সমর্থকদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। অন্যায় গ্রেপ্তার বা হয়রানি থেকে দর্শকেরা রক্ষা পাবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরও কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বাধা দেওয়া, গৃহহীনদের উচ্ছেদ এবং ব্যাপক নজরদারি। বিশেষ করে এলজিবিটিকিউ প্লাস সম্প্রদায়ের জন্য এই টুর্নামেন্ট কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়েও বড় ধরণের সংশয় রয়েছে।
চার বছর আগে কাতারে যখন বিশ্বকাপ হয়েছিল, তখন মানবাধিকার নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমকামীদের অধিকার ও শ্রমিকদের শোষণ নিয়ে আমি এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সোচ্চার হয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমাদের প্রধানমন্ত্রীসহ সেই সমালোচকদের মুখে কোনো কথা নেই। এই দ্বিচারিতা সত্যিই নজিরবিহীন। নিজের সুবিধা মতো মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা আসলে কাপুরুষতা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দেওয়া হয়। এর পর থেকেই মার্কিন সরকার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অবৈধভাবে তুলে নিয়ে গেছে। ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে এবং কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কঠোর করেছে। সবক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সরকারের নীরব সমর্থন পেয়েছে। এমনকি গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরাসরি জড়িত।
ব্রিটিশ মন্ত্রী লিজ কেন্ডাল বলেছেন, ‘আমেরিকার অভিবাসন নীতির জন্য আমি দায়ী নই’। কথাটি সত্যি। কিন্তু এটাও সত্যি যে, আমাদের মতো সরকারগুলোর নীরবতাই আমেরিকাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সাহস দিচ্ছে।
আমি ফুটবল ভালোবাসি। কিন্তু এটি কেবল একটি খেলা মাত্র। মানুষের জীবন কোনো খেলা নয়। এখন সময় এসেছে তোষামোদির নীতি ত্যাগ করার। সব জায়গায় সবার মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে সাহসী হওয়ার সময় এসেছে।
আলজাজিরা থেকে অনূদিত
লেখক পরিচিতি: জেরেমি করবিন যুক্তরাজ্যের উত্তর ইসলিংটন আসন থেকে নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি)। তিনি ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা ছিলেন।

