logo

মার্কিন স্বার্থেই ট্রাম্পের উচিত দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করা

মার্কিন স্বার্থেই ট্রাম্পের উচিত দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণাই সঠিক, তিনি যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাত শেষ করতে চান। আর এজন্য তিনি ‘গুড় ও মুগুর’ (Carrot and Stick) উভয় পদ্ধতি প্রয়োগের জন্যই প্রস্তুত। একদিকে যেমন তিনি ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে আরও ধ্বংস না করার প্রস্তাব দিচ্ছেন, অন্যদিকে প্রবল বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানের হুমকিও ঝুলিয়ে রেখেছেন। তবে বাস্তবসম্মত কূটনীতির স্বার্থে ট্রাম্পের উচিত নমনীয় পদ্ধতিতেই সংকটের সমাধান খোঁজা।

ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা হলে তা শুধু একটি দেশের ক্ষতি করবে না, বরং এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনবে। এর ফলে ইরান দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, যা থেকে জন্ম নেবে অগণিত শরণার্থী।

এই শরণার্থীরা ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর দেশ ছাড়া ব্যক্তিদের মতো হবে না, তারা তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য আয়াতুল্লাহদের দোষারোপ করবে না। বরং তারা তাদের এবং তাদের জন্মভূমির এই অবস্থার জন্য আমেরিকাকে ঘৃণা করবে। বিশ্বজুড়ে এই ক্ষোভ এক অস্থিতিশীল শক্তির জন্ম দেবে, যার চড়া মাশুল শেষ পর্যন্ত খোদ আমেরিকাকেই দিতে হতে পারে।

আলোচনার মাধ্যমে শান্তি চুক্তিই সেরা পথ। তবে কোনো চুক্তি যদি সম্ভব না হয়, তবুও আমেরিকার জন্য এই অঞ্চল ত্যাগ করা শ্রেয়। আমরা যদি একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ফিরে আসি, তবে হরমুজ প্রণালি সচল রাখা ইরানের নিজেরই অর্থনৈতিক প্রয়োজনে পরিণত হবে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে কমে আসবে। যদি ইরান এরপরও কার্গো জাহাজে হামলা চালায়, তবে সেটি আর শুধু আমেরিকার একার সমস্যা থাকবে না। তখন আমাদের মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী সবাই মিলে ইরানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। বৈশ্বিক এই চাপের মুখে ইরান খুব দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হবে।

বর্তমান সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। ইতিহাস বলে, কেবল বোমা বর্ষণ করে কোনো শাসনকাঠামো উপড়ে ফেলা যায় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বর্তমান প্রচেষ্টাগুলো শাসকগোষ্ঠীকে একটুও দুর্বল করতে পারেনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত চলমান অভিযান স্থগিত করার পাশাপাশি সেইসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করা, যারা বর্তমান ব্যবস্থাকে উৎখাত করতে চায় কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে তা পারছে না। অভ্যন্তরীণ মিত্রদের কাছ থেকে ‘তলোয়ার দিয়ে বন্দুকযুদ্ধে’ জেতার আশা করা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।

এই যুদ্ধ এখনই থামানোর সবচেয়ে বড় কারণ হবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। মার্কিন নাগরিকরা এই যুদ্ধ চায় না, বিশেষ করে যুদ্ধের প্রভাবে তেলের আকাশচুম্বী দাম তাদের চরম অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো ‘ক্রয়ক্ষমতা’।

এর মধ্যে যুদ্ধের অনিশ্চয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে জীবিকার হুমকি এবং ক্রমবর্ধমান ইউটিলিটি বিল—সব মিলিয়ে আমেরিকান জনজীবন এখন অস্থির। এই অস্থিরতা কোনোভাবেই নির্বাচনে জয়ের জন্য সহায়ক নয়।

রিপাবলিকানদের সামনে এখনও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—হাউস ও সিনেট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ আছে। তবে তার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সংঘাত থেকে মনোযোগ সরিয়ে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নজর দিতে হবে। বিদেশের দুঃসাহসিক অভিযানের চেয়ে আমেরিকান জনগণ তাদের প্রতিবেশীর খবর এবং খাবারের দাম নিয়ে বেশি চিন্তিত।

আমার এখনও মনে আছে, প্রথম ইরাক যুদ্ধের পরপরই প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল আকাশচুম্বী ৯১ শতাংশ। কিন্তু যখন তিনি পুনর্নির্বাচনে লড়লেন, তখন ভোটাররা ১৯৯১ সালের জুনে ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত সেই জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজের চেয়ে নিজেদের পকেটের অবস্থার দিকেই বেশি নজর দিয়েছিলেন।

একদিকে, বুশের যেমন ভবিষ্যৎমুখী কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না, অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিল ক্লিনটন, যিনি কিনা ‘ড্রাফট ডজার’ (সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তি) এবং নারী কেলেঙ্কারির জন্য সমালোচিত ছিলেন। তিনি কেবল অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। ক্লিনটন তার প্রচার দলকে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, অর্থনীতিটাই আসল, গাধার দল ইটস দ্য ইকোনমি, স্টুপিড।

ট্রাম্প যদি চান কংগ্রেস রিপাবলিকানদের হাতেই থাকুক, তবে তাকে মনে রাখতে হবে, এখনও ‘অর্থনীতিটাই আসল’। আর এই যুদ্ধ যত দ্রুত শেষ হবে, ট্রাম্প তত দ্রুতই আমেরিকার জনগণ ও মার্কিন অর্থনীতির দিকে মনযোগ দিতে পারেবেন। আর মানুষ এটাই চায়।

লেখক: ইএফবি অ্যাডভোকেসির পার্টনার। তিনি ওয়াশিংটনের প্রথম সারির লবিস্ট হিসেবে পরিচিত।