logo
Advertisement

আলজাজিরার কলাম/লাতিন আমেরিকায় কি মার্কিন সামরিক আধিপত্যবাদ ফিরছে?

কার্লোস এইচ ব্র্যান্ড এস
কার্লোস এইচ ব্র্যান্ড এস
লাতিন আমেরিকায় কি মার্কিন সামরিক আধিপত্যবাদ ফিরছে?
পানামা সিটিতে বহুজাতিক সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণকারী সামরিক সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ছবি: এপি

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরের মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকাস কাউন্টার-কার্টেল কোয়ালিশন’ (এসিসি) গঠন করেন। এই জোটের আড়ালে মার্কিন বাহিনী এখন মাদক পাচারের সন্দেহে বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করছেন।

লাতিন আমেরিকায় বর্তমানে বামপন্থি রাজনীতির প্রভাব কমছে। এই সুযোগে ওয়াশিংটন পুরো অঞ্চলকে সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতায় মূলত এই প্রবণতাই প্রকাশ পাচ্ছে। এর ফলে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রশাসনের সেই পুরোনো বলপ্রয়োগের নীতি আবার ফিরে আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে এই অঞ্চলে নিজের সামরিক শক্তি জাহির করতে চাইছে। তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বিত অভিযান চালাচ্ছে, সরাসরি সেনা পাঠাচ্ছে এবং স্থানীয় সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করছে। তবে এই শক্তি প্রদর্শন অঞ্চলের নিরাপত্তা বাড়াতে বা অপরাধ কমাতে কোনো কাজে আসবে না। উল্টো এটি সেখানকার গণতন্ত্রকে বিপন্ন করবে এবং নতুন করে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা ডেকে আনবে।

মুনরো ডকট্রিনের প্রত্যাবর্তন

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া এই নতুন জোটে (এসিসি) লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ১৭টি দেশ যোগ দিয়েছে। এই দেশগুলো হলো আর্জেন্টিনা, বাহামা, বেলিজ, বলিভিয়া, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, গায়ানা, গুয়াতেমালা, প্যারাগুয়ে, জ্যামাইকা, পানামা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, হন্ডুরাস, এল সালভাদর, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, কলম্বিয়া ও পেরু।

ভেনেজুয়েলা আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের অংশ নয়। তবে মনে হচ্ছে, তারা মার্কিন অভিযানের জন্য নিজেদের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার এই অপ্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের ফলে জোটটি ‘আন্দিজ বৃত্ত’ সম্পূর্ণ করতে পেরেছে। এই অঞ্চল থেকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সরবরাহ করা সব কোকেন উৎপাদিত হয়। এছাড়া এই অঞ্চলেই লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।

তবে এই জোটের লক্ষ্য কেবল মাদক চোরাচালান বন্ধ করা নয়। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, পশ্চিম গোলার্ধের বাইরে থেকে আসা ‘ক্ষতিকর বিদেশি প্রভাব’ মোকাবিলা করাই এই জোটের কাজ। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প আসলে পরোক্ষভাবে চীনে ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথাই বুঝিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনাবাহিনী স্থল অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর মাত্র দুই মাস পর ফ্লোরিডায় এসিসি জোট গঠন করা হয়। এই বিষয়টিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

গত ৪ আগস্ট এ লক্ষ্যে আরেকটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) ‘ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ার জয়েন্ট টাস্কফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এই টাস্কফোর্সের কাজ হলো মার্কিন সামরিক অভিযানগুলোর সঙ্গে মিত্রদের অভিযানের সমন্বয় করা। এর মাধ্যমে তারা হুমকি মোকাবিলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্রুত সংকট নিরসনে কাজ করবে। এই নতুন টাস্কফোর্স এসিসি-র ১৮টি দেশের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেবে।

স্পষ্টতই ওয়াশিংটন লাতিন আমেরিকার ওপর আবারও নিজের জোরালো আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা এ অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে আগ্রহী। এটি মূলত ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক ‘মুনরো ডকট্রিন’-এরই একটি নতুন সংস্করণ, যাকে এখন ‘ট্রাম্প অনুসিদ্ধান্ত’ বলা চলে।

লাতিন আমেরিকার সামরিকীকরণ

সাম্প্রতিক কিছু অভিযানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই শক্তি প্রদর্শনের রূপ কেমন হতে পারে। গত জুনে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন সেনাবাহিনী বলিভার রাজ্যে একটি বিমান হামলা চালিয়েছে। অপরাধী দল ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’র নেতা হেক্টর গেরেরো ফ্লোরেসকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। পরে ভেনেজুয়েলা সরকার এক বিবৃতিতে দুই দেশের এই যৌথ অভিযানের কথা স্বীকার করে।

গত আগস্টের শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে সদ্য গঠিত জয়েন্ট টাস্কফোর্স সন্দেহভাজন বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায়। এতে অন্তত দুজন নিহত হন। মূলত এটি ছিল ‘সাউদার্ন স্পিয়ার’ অভিযানেরই অংশ। এই অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২২০ জন নিহত হয়েছেন। তবে নিহতরা আসলেই মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, তা নিয়ে কোনো তদন্ত করা হয়নি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের একটি ঘোষণা। তিনি জানান, কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা মার্কিন বাহিনীকে কলম্বিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। ‘মাদক-সন্ত্রাস’ দমনের নামে কলম্বিয়া এই অনুমতি দেয়।

এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় তার সামরিক হাত আরও বাড়াতে চায়। তারা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে যৌথ অভিযান চালাচ্ছে। আবার অনেক সময় একতরফাভাবে অন্য দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করছে, এমনকি তাদের সামরিক ঘাঁটিতেও প্রবেশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যে বিষয়গুলোকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করবে, সেগুলো নির্মূল করতে তারা সরাসরি লাতিন আমেরিকার মাটিতে সেনা নামাতে পারে।

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে মূলত গোপনে নানা তৎপরতা চালাত। তবে কিউবার ‘বে অব পিগস’ এবং গ্রেনাডায় তারা সরাসরি সামরিক আক্রমণও চালিয়েছিল। মার্কিন হস্তক্ষেপের কারণে সে সময় স্থানীয় সাধারণ মানুষকে চরম সহিংসতার শিকার হতে হয়েছিল।

স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন হস্তক্ষেপ মাদকবিরোধী অভিযানের রূপ নেয়। তবে এই অভিযানগুলোও স্থানীয় মানুষের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনেনি। উদাহরণ হিসেবে ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলা ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’র কথা বলা যায়। মাদক পাচার ঠেকাতে ও বামপন্থী বিদ্রোহী দলগুলোকে দমনে এই পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল।

এই অভিযানের ফলে বিদ্রোহী সংগঠনগুলো দুর্বল হলেও পুরো অঞ্চলে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কলম্বিয়ার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। নিজেদের সাফল্য দেখাতে তারা সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহী সাজিয়ে হত্যা করত। প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কলম্বিয়ায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ডজনখানেক নারী ও শিশুকে ধর্ষণ, মাদক এবং অস্ত্র পাচারের অভিযোগও উঠেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’র পেছনে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছিল। তবে এই পরিকল্পনা কলম্বিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সামরিকীকরণের দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে সশস্ত্র সংঘাত ও মাদক কার্টেলের সহিংসতা আরও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ, কৃষক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা চরম নির্যাতনের শিকার হন। এত কিছুর পরও কোকা চাষ বন্ধ করা যায়নি।

অতীতের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দিয়ে কিংবা সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করে কখনোই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

লাতিন আমেরিকার সমাজগুলোতে এর প্রভাব

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব কেবল নিরাপত্তা খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এসিসি জোটের সদস্য দেশগুলোকে তাদের জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। এর অর্থ হলো, দেশগুলোর বাজেট ভারসাম্য হারাবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হবে। ফলে সামাজিক সেবাগুলো ব্যাহত হবে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধবে।

এর পর আসে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি কেমন হবে, তা নির্ধারণ করতে চাইবে। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা ও সামরিক সহযোগিতার পরিধি নির্ধারণে তারা হস্তক্ষেপ করবে। মার্কিন প্রশাসন নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী নীতি তৈরি করতে অন্য দেশের সরকার ও আইনসভার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

ইতিমধ্যে মার্কিন কর্মকর্তারা এসিসি জোটভুক্ত দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। এই ঘটনাটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য চরম উদ্বেগজনক। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের বিচার থেকে দায়মুক্তি দেওয়ার জন্যই যে এই চাল খাটা হচ্ছে, তা স্পষ্ট।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এই অভাব লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাকে আরও উস্কে দেবে। এর মারাত্মক কিছু পরিণতি ভোগ করতে হবে স্থানীয় জনগণকে। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে, সরকারের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা বাড়বে, আইনের শাসন ভেঙে পড়বে এবং ফলস্বরূপ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য হয়তো এসিসি জোট গঠন একটি বড় কূটনৈতিক জয়। কিন্তু লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের জন্য এটি তাদের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আরেকটি বড় আঘাত।


লেখক পরিচিতি

কার্লোস এইচ ব্র্যান্ড এস একজন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী। তিনি মূলত হাইড্রোকার্বন (জ্বালানি) খাতের বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বিষয়ক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]