Advertisement

অসমতার অর্থশাস্ত্র ও বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২৭

অসমতার অর্থশাস্ত্র ও বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২৭
এম এম মুসা। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন হয়েছে এমন একটি সময়ে যখন বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসানের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে বিশ্লেষণ করতে হলে কেবল সংখ্যার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পড়ে থমাস পিকেটির মূলধন ও অসমতার তত্ত্বের আলোয় বাংলাদেশের কাঠামোগত অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিচার করা।

পিকেটি তার ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ গ্রন্থে যে মূল সূত্রটি উপস্থাপন করেছেন— r > g অর্থাৎ মূলধনের উপর মুনাফার হার যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে বৈষম্য কাঠামোগতভাবে বাড়তেই থাকে— সে সূত্রটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ সত্যকে সামনে আনে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষ মোট জাতীয় আয়ের ৪০.৯২ শতাংশ ভোগ করছে। গিনি সহগ ০.৪৯৯-এ পৌঁছেছে, যা ২০০৫ সালের ০.৪৬৭ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

কর ব্যবস্থা ও পুনর্বণ্টনের সংকট

বর্তমান বাজেটে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই সর্বনিম্ন। পিকেটির দৃষ্টিতে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সম্পদের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভূতকরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে রাষ্ট্র কার্যত বিত্তশালীদের স্বার্থেই পরিচালিত হয়।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ৯.৬ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক ঘোষণা, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি কখনো।

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিকর কাঠামোয় কিছুটা প্রগতিশীলতার লক্ষণ দেখা যায়। করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার থেকে পর্যায়ক্রমে ২০৩০-৩১ সালে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চআয়ের স্তরে ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কর হারের বিধান রাখা হয়েছে। তবে পিকেটির তাত্ত্বিক কাঠামোয় যা দরকার তা হলো সম্পদ কর— বিশেষত উত্তরাধিকার কর ও মূলধনী লাভ করের একটি শক্তিশালী কাঠামো, যা এই বাজেটে অনুপস্থিত।

বাংলাদেশে মূলধনের কেন্দ্রীভূতকরণের একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রধানত অনানুষ্ঠানিক ও ছায়া-অর্থনীতির মাধ্যমে ঘটেছে। বিগত দেড় দশকে বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংক খেলাপি ঋণের মাধ্যমে সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের বেসরকারীকরণ একটি নতুন অলিগার্ক শ্রেণির জন্ম দিয়েছে। খেলাপি ঋণ এখন ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ঋণাত্মক (-২.৬৪ শতাংশ)। এটি শুধু একটি আর্থিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর বৈষম্যতার প্রকাশ, যেখানে রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে অর্থ লুট করে সম্পদ কুক্ষিগত করা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা: পুনর্বণ্টনের প্রচেষ্টা

পিকেটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, রাষ্ট্রের মাধ্যমে উদার সামাজিক বিনিয়োগই বৈষম্য কমানোর প্রধান হাতিয়ার। এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তাবিত বাজেটের সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৫.৩ শতাংশ এবং জিডিপির ২.১ শতাংশ—একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। বিএনপির সিগনেচার প্রোগ্রাম ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৪১ লাখ নারীকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হবে।

তবে স্থানান্তর প্রদান কার্যক্রম কাঠামোগত বৈষম্য দূর করার জন্য পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশে ২৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা কোনো পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে না, কারণ ২০২৫ সালে ঢাকায় মাথাপিছু মাসিক ব্যয় ১৬ হাজার টাকার উপরে ছিল। সুতরাং এই বরাদ্দ সামাজিক বীমা হিসেবে মূল্যবান, কিন্তু গভীর কাঠামোগত বৈষম্যের সমাধান নয়।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। এটি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি (২০২৫-২৬ সালে ছিল ১.৩৯ শতাংশ)। স্বাস্থ্য বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ। এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ। এই বৃদ্ধি প্রশংসনীয়, তবে এখনও ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত জিডিপির ৬ শতাংশ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে।

মূলধনী বাজার ও বৈষম্য

প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজার সংস্কার এবং বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। পুঁজিবাজার মূলত উচ্চবিত্তদের সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার। কারণ শুধুমাত্র সম্পদশালীরাই সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কার্যত সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত এবং ঐতিহাসিকভাবে বাজারটি কারসাজি ও স্ক্যামের শিকার হয়েছে বহুবার।

তবে বাজেটে প্রস্তাবিত মিউনিসিপ্যাল বন্ড, সুকুক এবং কর্পোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা যায়, কারণ এটি ব্যাংকনির্ভর ঋণব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করতে পারে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য মিউচুয়াল ফান্ড ও পেনশন ফান্ড সম্প্রসারণ ‘মূলধনের গণতান্ত্রিকীকরণ’ ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ।

সমালোচনামূলক মূল্যায়ন

এই বাজেটের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো একটি প্রগতিশীল সম্পদ করের অনুপস্থিতি। বাংলাদেশে শীর্ষ এক শতাংশ মানুষের হাতে কতটুকু সম্পদ কেন্দ্রীভূত সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যই নেই, কারণ ভূমি রেজিস্ট্রি, বিদেশি সম্পদ এবং অনানুষ্ঠানিক সম্পদের কোনো ব্যাপক ডেটাবেস নেই।

দ্বিতীয় সমালোচনা হলো বাজেটের আকার এবং ঘাটতি নিয়ে। ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হবে। যদি এই ঋণগ্রহণ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না যায়, বরং সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হয়, তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ঋণের বোঝা বাড়ানো ছাড়া আর কিছু হবে না।

তৃতীয়ত, বাজেটে প্রস্তাবিত বিভিন্ন কর ছাড় ও প্রণোদনার বেশিরভাগই বৃহৎ শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতের জন্য। এতে শ্রমিক শ্রেণি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের তুলনায় পুঁজিপতি শ্রেণি অধিক সুবিধা পাবেন, যা কার্যত মূলধনের পক্ষে বৈষম্য বাড়াবে।

পথ কোথায়

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু অপর্যাপ্ত শুরু। সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা এবং কর প্রগতিশীলতার দিকে যাত্রা—এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু কাঠামোগত বৈষম্য মোকাবিলায় দরকার একটি কার্যকর সম্পদ কর প্রবর্তন, কর ফাঁকির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা নীতি, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কার্যকর উদ্যোগ এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা।

বাজেট বক্তৃতায় ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’ শব্দটি বারবার উঠে এসেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রগতিশীল কর ব্যবস্থাই পুঁজিবাদের মধ্যে বৈষম্য নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ। বাংলাদেশ সঠিক পথে যাত্রা করেছে—কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে কেবল ঘোষণা নয়, চাই প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।