ধূমপান: আইন ও বাস্তবতা

বিশ্বজুড়ে পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে ধূমপানমুক্ত এলাকা তৈরির আইন অমান্য করলে তাৎক্ষণিক ভারী জরিমানা ও প্রশাসনিক শাস্তি ভোগ করতে হয়। বাংলাদেশও ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল’ (FCTC)-এ স্বাক্ষর করে এবং ২০০৫ সালে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ প্রণয়ন করে। সম্প্রতি এই আইনকে আরও কঠোর করে প্রকাশ্যে ধূমপানের জরিমানা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে এবং ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী যেখানে আইন দিয়ে ধূমপান হ্রাস করা হচ্ছে, বাংলাদেশে আইনি অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সঠিক তদারকি ও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে এটি কেবল কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যে ধূমপানের ভয়াবহতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (CDC)-এর বিশ্বস্ত গবেষণানুসারে, তামাকের ধোঁয়ায় ৭,০০০-এরও বেশি রাসায়নিক যৌগ থাকে, যার মধ্যে অন্তত ৭০টি সরাসরি ক্যান্সার সৃষ্টিতে দায়ী। আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ (Heart Attack), স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) এবং ভাস্কুলার ডিজিজ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য মতে, একজন নিয়মিত ধূমপায়ীর গড় আয়ু অধূমপায়ীদের তুলনায় অন্তত ১০ থেকে ১২ বছর কমে যায় এবং বিশ্বে প্রতি বছর আশি লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপানের মারাত্মক প্রভাব
ধূমপান কেবল সেবনকারীর শারীরিক ক্ষতি সাধন করে না, বরং তার আশপাশের পরিবেশ ও মানুষকে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে:
• প্রত্যক্ষ প্রভাব: সরাসরি ধূমপায়ী ধোঁয়ার বিষাক্ত নিকোটিন ও কার্বন মনোক্সাইড গ্রহণ করেন। এতে রক্তনালী সংকুচিত হয়, রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বাড়ে এবং ফুসফুসের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
• পরোক্ষ প্রভাব (Secondhand Smoke): পরোক্ষ ধূমপায়ীরা না চেয়েও বাতাসে ভেসে থাকা বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, পরোক্ষ ধূমপানের কারণে অধূমপায়ীদের হৃদরোগের ঝুঁকি ২৫-৩০% এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২০-৩০% বৃদ্ধি পায়। এছাড়া কাপড়ে, আসবাবপত্রে লেগে থাকা বিষাক্ত কণা (Thirdhand Smoke) দীর্ঘমেয়াদে ঘরে অবস্থানকারীদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
শিশুদের ওপর ধূমপানের ধ্বংসাত্মক প্রভাব
ধূমপানের সবচেয়ে অসহায় ও নিষ্পাপ শিকার হলো শিশুরা। গর্ভাবস্থায় কোনো মা ধূমপান বা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হলে গর্ভস্থ সন্তানের অকাল জন্ম, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া অথবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শিশুদের ফুসফুস সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। ফলে তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস এবং কানের ক্রনিক ইনফেকশনের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এছাড়াও, প্রকাশ্যে বড়দের ধূমপান করতে দেখে শিশুরা মানসিকভাবে তামাকের প্রতি কৌতুহলী হয়ে ওঠে, যা তাদের ভবিষ্যতে ধূমপায়ী হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
আইন অমান্যের জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী কারা?
বাংলাদেশে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে তা না মানার পেছনে অনেক বাধা কাজ করছে:
১. আইন রক্ষক নিজেই যখন আইন ভঙ্গকারী: সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যাদের ওপর আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব—যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য বা সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ—তারা নিজেরাই অনেক সময় পাবলিক প্লেসে বা ডিউটি অবস্থায় প্রকাশ্যে ধূমপান করেন। যখন রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের ভয় বা শ্রদ্ধা থাকে না।
২. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চরম উদাসীনতা: নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করা এবং জরিমানা আদায়ের ধারাবাহিকতা না থাকা।
৩. প্রকাশ্যে উন্মুক্ত ধূমপান সংস্কৃতি: রাস্তাঘাট, বাসস্ট্যান্ড, পার্ক ও রেস্তোরাঁয় প্রকাশ্যে ধূমপান করলেও আশপাশের মানুষের প্রতিবাদ না করার প্রবণতা এবং প্রশাসন কর্তৃক সেগুলোকে দেখেও না দেখার ভান করা।
৪. তামাক কোম্পানির প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতা: তামাক কোম্পানিগুলোর চতুর বিপণন এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠিন আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া আইন ভঙ্গ উৎসাহিত করে।
ইসলামি মূল্যবোধ, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাধান
ইসলামে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং সমাজকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করাকে অন্যতম প্রধান ফরজ বা দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর অনুশাসন কাজে লাগিয়ে এই সমস্যার কার্যকর সামাজিক সমাধান সম্ভব:
• নিজের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন—"এবং তোমরা নিজেদের হাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫) ধূমপান যেহেতু সরাসরি নিজের ফুসফুস ও জীবন ধ্বংস করে, তাই ইসলামি দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম কাজের অন্তর্ভুক্ত।
• অন্যকে কষ্ট দেওয়া ও ক্ষতি করা নিষেধ: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর একটি বিখ্যাত মৌলিক নীতি হলো— "নিজের কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্য কারও ক্ষতি সাধন করা যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০) পরোক্ষ ধূমপানের মাধ্যমে একজন ধূমপায়ী তার চারপাশের নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করেন, যা সুন্নাহর সরাসরি লঙ্ঘন।
• অপচয় রোধ করা: তামাক ও সিগারেটের পেছনে টাকা উড়ানো স্পষ্ট অপচয়। কুরআনে বলা হয়েছে— "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা আল-ইসরা: ২৭)
ব্যবহারিক সমাধান
দেশজুড়ে প্রতি জুমার খুতবায় ইমামদের মাধ্যমে ধূমপানের ধর্মীয় ও শারীরিক ক্ষতির বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা, স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধূমপানমুক্ত রেখে কঠোরভাবে জরিমানা আদায় করা।
আইন প্রণয়ন কেবল প্রথম পদক্ষেপ, কিন্তু এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগই একটি জাতিকে তামাকমুক্ত করতে পারে। রক্ষক যখন নিজে আইন মানবেন এবং জনসমক্ষে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হবে, তখনই সমাজ থেকে ধূমপানের অভিশাপ দূর হবে। স্বাস্থ্য ও জীবনের নৈতিক মূল্য বোঝাতে বিশ্বখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন— "স্বাস্থ্যই একমাত্র সম্পদ নয়, তবে স্বাস্থ্য ছাড়া অন্য কোনো সম্পদই উপভোগ করা যায় না।" একইভাবে সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মহামতি মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন— "তুমি বিশ্বে যে পরিবর্তনটি দেখতে চাও, সর্বপ্রথমে নিজের মাঝে সেই পরিবর্তনটি আনো।" সরকারি কঠোরতা, প্রশাসনিক নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিষমুক্ত, সতেজ ও ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হোক আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
_______________________________________________
তাইফুর রহমান, ব্যাংকার ও কলামিস্ট
Email: taifurrahmanibbl@gmail.com


