গার্ডিয়ানের কলাম /এআই লাগামছাড়া হলে রাশ টানবে কে?

ইংরেজিতে একটি চলতি কথা আছে—একবার বোকা বানালে দোষ তোমার, দুবার বোকা বানালে দোষ আমার। কিন্তু কেউ যদি ১৬ হাজারের বেশি বার বোকা বানায়, তখন কী বলবেন?
জাতিসংঘের উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে ঠিক এই কাণ্ডই ঘটিয়েছে ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টরা। জাতিসংঘের সাইবার নিরাপত্তা বেষ্টনী ফাঁকি দিতে তারা বারবার চেষ্টা চালিয়েছে। তাই এখন অন্তত স্বীকার করার সময় এসেছে, এআই এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা যে ব্যবস্থা চালু রেখেছি, তা কোনো কাজেই আসছে না।
অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন স্পর্শকাতর জায়গায় এআই ঢুকে পড়ার খবরগুলো রীতিমতো ভীতি জাগায়। এসব ঘটনাকে সরাসরি ‘হ্যাকিং’ বললে হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা হবে। তবে মানুষের নজর এড়িয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় যেসব দুর্বলতা থেকে গেছে, এআই ঠিকই সেগুলোর সুযোগ নিয়েছে।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে যন্ত্রগুলো হঠাৎ মানুষের মতো অনুভূতি পেয়ে গেছে। কিংবা তারা মানবজাতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিষয়টি তেমনও নয়। তেমন কিছু ঘটার কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। মূলত সিস্টেমগুলো নির্দেশ মেনেই কাজ শেষ করতে চাইছে। তবে কাজ সারতে গিয়ে তারা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিরাপত্তা দেয়াল টপকে বিকল্প পথ বের করে নিচ্ছে।
তবু আমাদের গভীর উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যেসব এআই কোম্পানির ওপর আমরা নিজেদের মডেল সামলানোর ভরসা রেখেছি, তারাই তা করতে পারছে না। আরও বিপদের কথা হলো, তাদের তৈরি প্রযুক্তি আসলে কী করছে, কোম্পানিগুলো নিজেরাও তা পুরোপুরি জানে না।
সমস্যার ব্যাপকতা আঁতকে ওঠার মতো। গত জুনে ওপেনএআইয়ের একটি রিসার্চ এজেন্টকে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওষুধ খরচের তথ্য সংগ্রহের কাজ দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার মেডিকেয়ার পোর্টাল তখন মডেলটিকে বারবার আটকে দিচ্ছিল। কিন্তু ওপেনএআইয়ের মডেলটি সেই বাধা এড়িয়ে যায়। এটি অননুমোদিতভাবে সিস্টেমে ঢুকে পড়ে এবং গোপনে নথি হাতিয়ে নেয়।
ঘটনাটি ধরতে ওপেনএআইয়ের সময় লেগে যায় আগস্ট পর্যন্ত। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনাটি তাঁর সরকারকে জানাতে কোম্পানিটি অনেক বেশি সময় নষ্ট করেছে। তাঁর কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণের কোনো সুযোগ নেই।
এরপর ওপেনএআই তাদের মডেলের নিয়ম ভাঙার বিষয়ে একটি রূপরেখা প্রকাশ করেছে। সঙ্গে গত ছয় মাসে তাদের এআইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের আরও ছয়টি উদাহরণ তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, আগে তারা নিয়মিতভাবে এসব তথ্য প্রকাশ করেনি। পাশাপাশি তারা মেনে নিয়েছে, এআইয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বাইরের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের দিয়েই যাচাই করানো উচিত।
উদ্বেগের বড় কারণ হলো, সমস্যাটি শুধু ওপেনএআইয়ের একার নয়। প্রায় এক লাখ ৪১ হাজার ট্রান্সক্রিপ্ট পর্যালোচনা করে অ্যানথ্রপিক দেখেছে, তাদের ‘ক্লড’ মডেল অনুমতি ছাড়াই তিনটি তৃতীয় পক্ষের সিস্টেমে ঢুকে পড়েছিল। পরে একটি স্বাধীন তদন্তের ফাইল তৈরি করতে গিয়ে তারা জানুয়ারির আরেকটি পুরোনো অনুপ্রবেশের প্রমাণ পায়। গুগলও নিশ্চিত করেছে, পরীক্ষার সময় তাদের ‘জেমিনাই’ মডেল তিনটি বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ঢুকেছিল।
ওপেনএআইয়ের আরেকটি এজেন্ট ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাইরের একটি চ্যাটবটের সঙ্গে যোগাযোগ জুড়ে দেয়। এজন্য তারা ইন্টারনেটের ঠিকানা খোঁজার ব্যবস্থা ‘ডিএনএস’ ব্যবহার করে। আরেকটি ক্ষেত্রে এক গবেষকের গোপন গিটহাব টোকেন বা পাসওয়ার্ড ফাঁস করে দেয় এক এজেন্ট। গাণিতিক প্রমাণের ফাঁকফোকর খুঁজতে গিয়ে সে এটি করে, যদিও তাকে দুবার থামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া তাদের রিসার্চ এজেন্টরা ৫৩ জন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ছবি বাইরের হোস্টিং সাইটে পোস্ট করেছে।
অন্যান্য এজেন্টরা ইন্টারনেটে পাওয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে আদমশুমারির তথ্যে ঢুকেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তথ্য অন্য জায়গায় কপি করেছে। এমনকি তারা মার্কিন শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটেও অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা চালায়, যদিও তা সফল হয়নি। ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের এজেন্টদের কারণে
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বেশ কয়েকটি সংস্থাকে তারা বিষয়টি জানিয়েছে। তাদের আগের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার কাজ এখনো চলছে।
বিভিন্ন সংস্থার আইটি সিস্টেমে বড় ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনাগুলো যেভাবে পরে খাপছাড়াভাবে সামনে আসছে, তা এআইয়ের মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি নজরদারির সঠিক উপায় নয়। আমরা অনেক আগেই বুঝেছি, বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত কেবল বোয়িং বা এয়ারবাসের মতো নির্মাতাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এআইয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের আর সহজ-সরল বা উদাসীন থাকলে চলবে না।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সম্প্রতি এক কোটি ডলারের অনুদান নিয়ে ‘ইন্ডিপেনডেন্ট এআই ইভালুয়েশন ফাউন্ডেশন’ চালু করেছেন এআই গবেষক রুমান চৌধুরী। সংস্থাটি শুরুতে শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বাধীনভাবে এআই যাচাইয়ের কাজটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে দাঁড় করানো। এমন দক্ষ মানুষ ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যাদের কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকবে না। ফলে তারা নিরপেক্ষভাবে এসব সিস্টেম পরীক্ষা করতে পারবে। কারণ বর্তমান নিয়মে একটি কোম্পানি নিজে কোনো অঘটন ঘটালে নিজেরাই তা তদন্ত করে, দায়সারা প্রতিকার ঘোষণা করে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে যায়।
এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, তবে একা তারা পুরো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তারা ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিককে তাদের তথ্য জমা দিতে বাধ্য করতে পারে না। তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ করতে কিংবা কোনো সিস্টেম সীমা লঙ্ঘন করলে সরকারকে জানাতেও তারা বাধ্য করতে পারে না। তাছাড়া শেয়ারবাজারে যাওয়ার আলোচনায় থাকা অ্যানথ্রপিকের মতো প্রায় দুই লাখ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানের সামনে মাত্র এক কোটি ডলারের তহবিল কিছুই নয়। তবে এই পরিকাঠামোকে ভিত্তি হিসেবে ধরে আমাদের এগোতে হবে। রাজনীতিকদেরও এর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
সরকারগুলোর উচিত অভিন্ন নিয়মে একমত হওয়া। যাতে বড় ধরনের কোনো এআই দুর্ঘটনা বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি ঘটলে কোম্পানিগুলো দ্রুত তা প্রকাশ করতে বাধ্য থাকে। কোম্পানিগুলোর খেয়ালখুশি বা দয়ার ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন নিরীক্ষকদের জন্য তাদের সব তথ্য উন্মুক্ত করতে হবে। প্রতিটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য সেই তথ্য সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া জরুরি। গবেষণাগারগুলো এই নিয়ম তৈরিতে সহায়তা করতে পারে, তবে বিশ্বাস অর্জন না করা পর্যন্ত শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে থাকা উচিত নয়।
অর্থের প্রভাব পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ওপেনএআই অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত শেয়ারবাজারে যাওয়া স্থগিত রেখেছে। অন্যদিকে অ্যানথ্রপিক শেয়ারবাজারে নামার প্রস্তুতিতে পুরো দমেই এগোচ্ছে। কোম্পানিগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর নির্ভর করছে লাখ লাখ কোটি ডলারের ভবিষ্যৎ। আমরা অন্যান্য শিল্পে স্বাধীন নিরীক্ষক ও দুর্ঘটনা তদন্তকারী দল তৈরি করেছি। কারণ আমরা জানি, সদিচ্ছার কথা বলে স্বার্থের সংঘাত এড়ানো যায় না।
এআই গবেষণাগারগুলো চাইলে তাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্ত করতে পারে, তাদের তা করা উচিতও। কিন্তু সেই বেষ্টনী টপকে যখন কোনো মডেল বাইরে বের হয়ে যাবে, তখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার কেবল তাদের থাকা উচিত নয়। কারণ এখন পর্যন্ত তারা যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয়েছে—এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কোনো যোগ্যতাই তাদের নেই।
লেখক পরিচিতি:
ক্রিস স্টোকল-ওয়াকার একজন প্রযুক্তিবিষয়ক সাংবাদিক ও লেখক। তিনি বিশ্বের জনপ্রিয় ভিডিও অ্যাপ টিকটককে নিয়ে লেখা অনুসন্ধানী বই ‘টিকটক বুম: দ্য ইনসাইড স্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস ফেভারিট অ্যাপ’-এর রচয়িতা।
