ঝামেলা বাধাতে পারেন ট্রাম্প, মীমাংসার পথ জানেন না

আমেরিকান গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী, যে কোনো সামরিক সংঘাতের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ওভাল অফিস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে সংশয়ী জাতিকে তথ্য দিতে এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তার এই ভাষণের আগে বিশেষজ্ঞরা জল্পনা-কল্পনা করছিলেন যে তিনি কী ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। একটি স্থল আক্রমণ? উত্তেজনা প্রশমন? নাকি ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা—যেহেতু হরমুজ প্রণালিতে তাকে সাহায্য করার মতো কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না?
তবে শেষ পর্যন্ত এর কোনোটিই ঘটেনি। তার বদলে অসংলগ্ন ভাষায় ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পুরোনো পোস্টগুলোরই পুনরাবৃত্তি করলেন। যেখানে তিনি একদিকে আমেরিকার সামরিক অগ্রগতির বড়াই করছিলেন, আবার অন্যদিকে ‘যুদ্ধাপরাধের’ হুমকি দিচ্ছিলেন। তার ভাষণ আমাদের খুব সামান্যই স্পষ্ট তথ্য দিয়েছে, কিন্তু নেপথ্যের অনেক কিছু উন্মোচিত করেছে।
প্রথমত, তিনি আমাদের কাছে স্পষ্ট করলেন যে, নিজের তৈরি করা এই জঞ্জাল থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তার নেই।
যুদ্ধ কোন দিকে যাচ্ছে তা বোঝার একটি উপায় হলো এটা খেয়াল রাখা যে, কোন পক্ষ এটি শেষ করার চেষ্টা করছে। বুধবার অ্যাক্সিওস প্রতিবেদন করেছে, জেডি ভ্যান্স মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের কাছে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে ইরান হয়তো আলোচনায় বসতে রাজি নয়।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, ‘ইরানের সরকার মনে করে তারা যুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং আমেরিকার কূটনৈতিক দাবি মেনে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন তাদের নেই।’
সম্ভবত ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনার আশায় ট্রাম্প বুধবার তার আগের আলটিমেটামগুলোর পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাদের প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’
চুক্তি না হলে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সম্ভবত তেলক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করার হুমকি দেন, যা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। যদিও প্রেসিডেন্টের তাতে কিছু যায় আসে না।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তেহরানের পাস্তুর ইনস্টিটিউট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা একটি চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র। ইরানি-মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন উপদেষ্টা ভ্যালি নাসর এই আক্রমণকে ‘ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠানোর প্রতিশ্রুতির’ অংশ হিসেবেই দেখছেন।
ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় আমি এই পাস্তুর ইনস্টিটিউট থেকেই টিকা নিতাম। আমার দাদা একজন ডাক্তার ছিলেন, যিনি সেখানে কাজ করতেন। আসলে এটি ইরানের সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান।’
ভ্যালি নাসর বলেন, ‘এই ইনস্টিটিউটে বোমা হামলা এমন এক সময়ে হলো যার কয়েক দিন আগেই দুটি ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্রে বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ওষুধের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এই কেন্দ্রগুলো ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করতে পারে, এগুলো হয়তো ‘সামরিক ও বেসামরিক’ উভয় কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু নাসরের মতে, ‘ইরানিরা বুঝতে পারছে যে, এটি এখন আর ইসলামিক রিপাবলিক বা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক স্থাপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। এটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এটি ইরানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রক্রিয়া।’
উল্টো এটি অভ্যন্তরীণভাবে দেশটির শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলি ভায়েজ উল্লেখ করেছেন যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতি রাতে সরকার দেশের বিভিন্ন চত্বরে সমর্থকদের জড়ো করছে। তিনি বলেন, ‘সেই জনসমাগম আসলে প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে। এমনকি যারা ইরানের ইসলামি শাসনকাঠামোর বিরোধী, তারাও এখন আমেরিকার বিরোধিতা করছেন। কারণ তাদের অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে, বেসামরিক লোক হতাহত হচ্ছে, ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রাম্পের হুমকি তো আছেই।’
এদিকে ইরানের নেতারা নিশ্চিতভাবেই দেখতে পাচ্ছেন যে, ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। যুদ্ধের কারণে তার জনপ্রিয়তার রেটিং ক্যারিয়ারের সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। সাম্প্রতিক ইউগভ ও দ্য ইকোনমিস্টের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জপ্রিয়তা এখন মাত্র ৩৫ শতাংশ। এটি জর্জ ডব্লিউ বুশের সেই সময়ের কাছাকাছি রেটিং, যখন তিনি একটি ব্যর্থ যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক পতনের দায়ে কলঙ্কিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়েছিলেন।
সম্ভবত ট্রাম্পের ওভাল অফিস থেকে ভাষণ দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, আমেরিকানদের এটি বোঝানো যে, তার ইরান অভিযান মানুষের ধারণার চেয়ে ভালো চলছে।
যুদ্ধ শেষ করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মরিয়া ভাব এখন স্পষ্ট। নাসর বলেন, ‘এই ভাষণ ইরানের কাছে একটি সংকেত যে, তিনি নিজের দেশের জনগণের কাছে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই এবং তিনি চাপের মধ্যে আছেন।’
এই চাপ আরও বাড়িয়ে দেওয়া এখন ইরানের স্বার্থই রক্ষা করবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সে কারণেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এই যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী নয়।
লেখক: মার্কিন সাংবাদিক