logo
হেলাল হাফিজের জন্মদিন

কোথাও কোনো কথা ছিল না…

খান মুহাম্মদ রুমেল
খান মুহাম্মদ রুমেল
কোথাও কোনো কথা ছিল না…
কবি হেলাল হাফিজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

‘অনাদর, অবহেলা, প্রত্যাখ্যান আর ঘৃণাই আমাকে কবি বানিয়েছে’, হেলাল হাফিজ বলেছিলেন এক ঘরোয়া আড্ডায়। তার ভাষায়, ৭২ বছরের জীবন পেলাম। সময়টা নেহাত কম নয়। দীর্ঘই বলা যায়। এই দীর্ঘ জীবনের পেছনে ফিরে তাকালে তিনটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। তিনটি ঘটনাই আমার জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে। আমি সফল নাকি ব্যর্থ, হিসাব কষতে বসলেও ওই তিনটি ঘটনা অবধারিতভাবে সামনে চলে আসে। আজ আমার সফলতা, ওই তিনটি ঘটনা তার পেছনে দায়ী। আবার আমার যতটুকু ব্যর্থতা, তার পেছনেও আছে ওই তিন ঘটনা।

প্রথম ঘটনা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) থাকি। ওইদিন সন্ধ্যায় নিউ মার্কেটের দিকে আড্ডা দিয়ে রাতে হলে ফিরেছি। ক্যান্টিন বন্ধ। খেতে গেলাম মেডিকেল গেটের কাছে পপুলার নামে একটা রেস্টুরেন্টে। খাওয়া শেষে মনে হলো, ফজলুল হক হলে বন্ধু হাবিবুল্লাহ থাকে, ওর সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। গেলাম ফজলুল হক হলে। হাবিবুল্লাহর কক্ষে গিয়ে আমি আড্ডা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর, রাত তখন পৌনে ১০টা হবে, হঠাৎ গোলাগুলির বিকট আওয়াজ। আমরা হলের ছাদে উঠে দেখলাম নীলক্ষেত, নিউ মার্কেটের দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।

২৭ মার্চ সকালে ইকবাল হলে গিয়ে দেখি, মাঠের মাঝখানে, এখানে ওখানে শুধু লাশ আর লাশ। নিজের কক্ষে গিয়ে সুটকেস গুছিয়ে দ্রুত বের হয়ে পড়লাম। এখান থেকে পালাতে হবে, না হলে বাঁচা সম্ভব নয়। হলের গেটে এসে দেখি নির্মলেন্দু গুণ দাঁড়িয়ে আছে। সে বললো, আমি ভেবেছি তুমি মারা গেছো, তোমার লাশ নিতে এসেছি। বলেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আমিও সজোরে কাঁদতে লাগলাম। তারপর সেখান থেকে আমার বড়ো ভাইয়ের বাসায় গিয়ে উঠলাম।

এই ঘটনা আমার হৃদয়ে ব্যাপকভাবে ছাপ ফেললো। আমার তখন কেবলই মনে হতো, ওই রাতে আমি যদি ফজলুল হক হলে না গিয়ে নিজের হলে ফিরতাম, তাহলে তো বাঁচতাম না। একটা বোনাস জীবন পেয়েছি— এই অনুভূতি আমার ভেতর বিরাট বৈরাগ্য এনে দিলো। এক ধরনের সন্ন্যাস জীবন যাপন শুরু করলাম আমি।

এরপরের ঘটনা ১৯৭৩ সালের জুনের। ১৯ জুন আমার পিতার মৃত্যু হলো। তিন বছর বয়সে মা মারা যাওয়ার পর আব্বাই ছিলেন আমার সবকিছু। তার মৃত্যু প্রবলভাবে ধাক্কা দিলো আমাকে। মনে হলো, জগৎ সংসার তুচ্ছ। সব অর্থহীন। আমার বৈরাগ্য আরো প্রগাঢ় হলো।

আব্বার মৃত্যুর মাসখানেক পর ঘটলো তৃতীয় ঘটনা। ঘটনা ঘটালো হেলেন, আমার প্রেমিকা। হেলেন হঠাৎ ডেকে বললো, কবি তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। আমরা গিয়ে বসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে। সে বললো, আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। বাবা মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।

ছোটোবেলা থেকে আমি খুব সহনশীল ছিলাম। প্রচণ্ড সহ্যশক্তি আমার। তাই ভেতরের ঝড় বুঝতে দিলাম না হেলেনকে। ওখান থেকে উঠে রিকশা নিয়ে সোজা হলে চলে গেলাম। ওটাই হেলেনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা ও শেষ কথা।

এই তিনটি ঘটনা আমাকে চিরস্থায়ীভাবে সংসার বিমুখ করে ফেললো। আমার আর ঘর হলো না, সংসার হলো না, অর্থকড়ি হলো না, প্রতিষ্ঠা হলো না।

এখন জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। এখন কেবলই আমার মনে হয়, জীবনের সময়গুলো বৃথাই অপচয় করেছি। কত সুন্দর সুন্দর কবিতার পঙ্ক্তি এসেছে মাথায়, আমি টেবিলে বসিনি, লিখিনি। জীবনটা অপচয়ই করেছি বলা যায়। এজন্য এখন আমি ভীষণভাবে লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। এই দীর্ঘ জীবনে যারা আমাকে ভালোবেসেছেন, তাদের সবার প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। আর যারা আমাকে ভালোবাসেননি তাদের প্রতি আরো বেশি কৃতজ্ঞতা। কারণ তাদের অবহেলা, অনাদর, প্রত্যাখ্যান আর ঘৃণাই আমাকে কবি বানিয়েছে।

এক টানে এই কথাগুলো লেখার পর আমার মনে পড়ল কয়েকটা বাক্য–

‘মানুষ না বোঝে যদি আরেক মানুষ

আমি আহত হবো না,

আহত হবো না।

কবিতার কসম খেলাম আমি শোধ নেবো সুদে ও আসলে,

এবার নিহত হবো’

আসলেই আবাসিক হোটেলের নির্জন কক্ষে একা মারা গিয়ে সুদে আসলে শোধ নিলেন হেলাল হাফিজ? তিন বছরেই মাতৃহারা শিশুর কাছে বাবা ছিলেন সব। ছাত্র বয়সেই ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি লিখে পাহাড় সমান খ্যাতি অর্জন করলেন। ’৭১-এর ২৫ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের হলে না থাকায় বেঁচে গেলেন। দু’দিন পর, ২৭-এ বন্ধু কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁকে খুঁজতে এলে পরস্পরকে জড়িয়ে এক শরীর কান্না।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’তে নিজেকে উজাড় করে দিলেন। একান্ত প্রেমিকা হেলেনের অন্যত্র বিয়ে। ১৯৭৩ সালে সম্পর্কচ্যুতি আর পিতৃবিয়োগ হেলাল হাফিজের সারা জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। বিপুলা পৃথিবীতে সম্পূর্ণত একা হতে হল তাকে। কবি-বন্ধু আবুল হাসান ছিলেন, ছিলেন হুমায়ুন কবিরও। নিজেদের আন্তরিক আড্ডা আর রোমাঞ্চ অভিযানের কোনও কমতি ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় নয় মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের দিনগুলোতে যে তরুণ সমাজ আশাভঙ্গের বেদনায় দীর্ণ হচ্ছিলেন, তিনি তাঁদের একজন। নিজেদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে জৈবসারে অরণ্য নির্মাণের কথা বলেছিলেন তিনি। “দু’জনে মিলে গোলাপ গোলাপ স্বদেশ” চেয়েছিলেন। কিন্তু তেমন স্বদেশ তো অধরাই।

তবুও হেলাল হাফিজ বেদনার অনুভূতি জমা দিতে চেয়েছিলেন যৌথখামারে। সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে চেয়েছিলেন সুখের সমান ভাগ।

অনেক বছর ধরেই পৃথিবী তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। ধরা যাক, কুরোসাওয়ার ’৫৫ সালের চলচ্চিত্র– ‘আই লিভ ইন ফিয়ার’ এর কথা। মহান ঋত্বিক ঘটক ১০ বছর পর নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রায় একই ধরনের অসহ ভার থেকে। সেই পথে হেঁটে হেলাল হাফিজ লিখলেন মাত্র দুই লাইন– ‘নিউট্রন বোমা বোঝ/ মানুষ বোঝ না!’ কবিতার কেন্দ্রে মানুষের যুদ্ধ পরিস্থিতি, হৃদয়ভাঙার বিপন্নতা আর ভবিষ্যত সুখের সম্ভাবনা এমন করে আর কয়জন বলতে পেরেছেন?

হেলেনের কথা আরেকটু বলি। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ বইটি বইমেলা থেকে কিনে এনে দিয়েছিলেন হেলেনের বর। নিজের নামের অব্যাহত জপ দেখে, নিজের নামটিকে কবিতাগ্রন্থের শীর্ণ অথচ দিগন্তবিস্তারী চরাচর জুড়ে বার বার বর্ণিত হতে দেখে তিনি মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারেননি। স্বামী নিতান্তই ভালো মানুষ ছিলেন, দেশে-বিদেশে চিকিৎসার একাধিক চেষ্টাও হয়েছিল। হেলেন নিজেকে ফিরে পেলেন না আর।

আর হেলাল হাফিজ? সংসার করলেন না, থিতু হলেন না। শাহবাগের একটি হোটেলে কাটালেন জীবনের অনেকগুলো বছর। প্রেসক্লাবে গিয়ে খেয়ে আসতেন। প্রথম জীবনে তিনি লিখেছিলেন– ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়; এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,’ মিছিল আর যুদ্ধে অংশগ্রহণের স্পষ্ট সময় নির্দেশ করে কবির পাশাপাশি গণবুদ্ধিজীবিতার দায়ও তিনি পালন করেছিলেন।

‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে কোনো পত্রিকা ছাপতে রাজি হয়নি। কিন্তু, অমোঘ, অমোচনীয় কালির মতো বাক্য দু’টি বন্ধু-কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা আর কবি হুমায়ুন কবির ওই গনগনে ঊনসত্তরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর দেওয়ালে দেওয়ালে উৎকীর্ণ করেছিলেন। তখন থেকেই তিনি ইতিহাস। প্রথম কাব্যগ্রন্থে তিনি তাঁর সময়টাকে ধরতে পেরেছিলেন বলেই অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় কেটে গেলেও পরেও বইটি প্রাচীন হয়নি।

হেলাল হাফিজের কাছে শিক্ষা নেওয়ার আছে একটাই। নিজেকে নিঃশেষ করে কবিতায় নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে জীবনের সর্বক্ষেত্র ব্যাপ্ত করে, সাফল্য-ব্যর্থতার তোয়াক্কা না রেখে।


লেখক: কথা সাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]