logo

হুতিরা কি ইরানের যুদ্ধে যোগ দেবে

হুতিরা কি ইরানের যুদ্ধে যোগ দেবে

যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হচ্ছে, তখন হুতি নেতা আব্দেল-মালিক আল-হুতির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়েছে যে তারা কি এ সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে নাকি দূর থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা ইরানের বিরুদ্ধে ২৮ ফেব্রুয়ারি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ উত্তেজনার অংশ ছিল না। এই হামলা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হত্যার ঘোষণা দেওয়ার পর। এই ঘটনার ফলে টেহরান যে আঞ্চলিক শক্তি কেন্দ্র তৈরি করেছে, তার ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে যায়।

ইয়েমেনে বিশেষভাবে একটি প্রশ্ন উঠেছে-  আব্দেল-মালিক আল-হুতি এই মুহূর্তে কিভাবে পদক্ষেপ নেবেন? এই পরিস্থিতি কি গ্রুপটিকে নতুন সংঘাতে নামতে প্ররোচিত করবে, নাকি তারা সাবধানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং যুদ্ধের গতিপথ স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে?

সানায়ায়, যেখানে হুতি দল রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে ইরানের সাথে সংযুক্ত, নেতা আব্দেল-মালিক আল-হুতির বক্তব্যের দিকে স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি যায়।

যুদ্ধের শুরু থেকে তিনি তিনবার ভাষণ দিয়েছেন। প্রথম ভাষণে তিনি ইরানের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন এবং ‘সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত’ থাকার কথা জানান, যা রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে সামরিক প্রস্তুতির ঘোষণা মনে হয়। দ্বিতীয় ভাষণে তিনি খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন এবং টেহরানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তৃতীয় ভাষণেও একই বার্তা পুনর্ব্যক্ত হয়।

কিন্তু এই ভাষণে যা বলা হয়নি, তা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

হুতিরা স্পষ্টভাবে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি, যেমন তারা অতীতে করেছে, যখন তারা শত্রুদের জন্য সতর্কবার্তা বা মিত্রদের প্রতি প্রায়োগিক সমর্থন দেখাত। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি হুমকির কোনো নথি নেই। মিডিয়ায় বার্তাও এবার তুলনামূলকভাবে সংযত এবং নিয়ন্ত্রিত, যা অতীতের মতো উত্তেজনাপূর্ণ নয়।

এটি দেখায় যে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সহজ নয়। ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ ধারণার উপর রাজনৈতিক ভাবনা গড়ে তোলা এই দলটি জানে যে সরাসরি সংঘাতে নামা বিপজ্জনক হতে পারে এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফল নিয়ে আসতে পারে।

অন্য দিকে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্সি হিজবুল্লাহ লেবানন যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত জড়িয়ে পড়ে। ইরানের অক্ষের অংশ হিসেবে তাদের তৎপরতা প্রমাণ করে যে ইরান তার প্রক্সিগুলো সক্রিয় করতে শুরু করেছে। হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি অংশীদাররা ইতিমধ্যেই সংঘাতে অংশ নিচ্ছে, তাই হুতির অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

হুতির পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, তারা ভৌগলিক এবং রাজনৈতিকভাবে আলাদা পরিবেশে কাজ করে। অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক জটিলতা বড়সড় হস্তক্ষেপকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

গত অভিজ্ঞতা দেখায় হুতিরা প্রয়োজনে বাস্তববাদী হতে পারে। ২০২৫ সালের মে মাসে ওমান মধ্যস্থতায় হুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যা রেড সি-তে উত্তেজনা কমায়। ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধেও তারা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে সমর্থনের ভাষণে সীমাবদ্ধ থাকে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো – যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় – হুতিরা সূচকাত্মক বা সংযত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের প্রতি সমর্থন দেখাবে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে নামবে না। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ সমর্থন বজায় রাখতে সাহায্য করবে, বড়সড় আঘাত এড়াতে সাহায্য করবে।

অন্য সম্ভাবনা হলো হুতিরা সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে রেড সি এবং বাব আল-মানদেবের মাধ্যমে ইরানকে সাহায্য করতে পারে। এই জলপথ বিশ্ব বাণিজ্য এবং শক্তির গুরুত্বপূর্ণ পথ। তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক এবং সামরিক বার্তা পাঠিয়েছে।

সরাসরি হস্তক্ষেপ, যেমন ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত বা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলা, এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও হস্তক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং নিরাপত্তা-সামাজিক চাপগুলোও বড়সড় যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ায়।

এই মুহূর্তে হুতিরা সাবধানে পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছেন। তারা টেহরানের প্রতি সমর্থন দেখাচ্ছে, কিন্তু সামরিক সিদ্ধান্ত অব্যাহতভাবে পিছিয়ে রাখা হয়েছে।

ভবিষ্যতের সপ্তাহগুলো এই দলের পদক্ষেপের দিক নির্দেশ করবে। মূল প্রশ্ন এখন শুধু হৌথির যুদ্ধ অংশগ্রহণ নয়, বরং তারা কিভাবে এই আঞ্চলিক পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করবে। তারা কি ইরানের প্রভাবশালীর অংশ হিসাবে থাকবে, নাকি স্বাধীনভাবে নিজস্ব কৌশল অনুসারে অবস্থান স্থাপন করবে।

লেখক : আহমেদ আল-শালাফি একজন বিশিষ্ট ইয়েমেনি সাংবাদিক এবং আল জাজিরার ইয়েমেন বিষয়ক সম্পাদক, যিনি ইয়েমেনি গৃহযুদ্ধ, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলি কভার করার জন্য পরিচিত।

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]