Advertisement

শিক্ষার মানোন্নয়ন হতে হবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের নেতৃত্বে

জগজ্জীবন বিশ্বাস
শিক্ষার মানোন্নয়ন হতে হবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের নেতৃত্বে
জগজ্জীবন বিশ্বাস। ছবি: সংগৃহীত

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি শিক্ষা সংস্কারের একটি রূপরেখা শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেছেন খুব সাবলীল ভঙ্গীতে। তার অফিসিয়াল লিখিত বক্তব্যকে পাশে রেখে মিলনায়তনে উপস্থিত শিশুদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণগুলি আমাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি যে শিক্ষাকে উন্নয়নের কেন্দ্রে স্থান দিতে চান সেটা তার দূরদর্শী ও পরিণত নেতৃত্বের পরিচায়ক। তিনি এবং তার শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েট মাহাদী আমিন বহুদিন ধরে এসব পরিকল্পনা করছেন সেকথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। একজন প্রান্তিক শিক্ষাকর্মী হিসেবে সরকার প্রধানের এই বক্তব্যে আমি নতুন আশা দেখছি। আর সেজন্যই নিজের ভাবনাকে তুলে ধরার তাগিদ বোধ করছি। যাতে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রান্তিক অভিজ্ঞতাকে আমলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের আলোচনাগুলো একটি নির্দিষ্ট এবং উপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া ধারা অনুসরণ করে আসছে। উচ্চপর্যায়ের গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, ঢাকায় বসে বড়ো বড়ো নীতিগত রূপরেখা নিখুঁতভাবে তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর থেকে নিচের স্তরে একের পর এক নির্দেশনা বা সার্কুলার পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ, এই খাতে সাধ্যমতো রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সত্ত্বেও সামষ্টিক নীতিমালার উদ্দেশ্য এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি বড়ো ও উদ্বেগজনক দূরত্ব রয়েই গেছে। শিক্ষা সংস্কারে গৃহীত কৌশলের ত্রুটি এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিহিত। বিদ্যমান ব্যবস্থাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে একটি প্রশাসনিক পাইপলাইনের চূড়ান্ত প্রান্তবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ, বিদ্যালয়গুলোর হওয়া প্রয়োজন ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি বা কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষার এই পদ্ধতিগত ব্যবধান দূর করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে ফেলতে হবে। প্রকৃত সংস্কার তখনই সম্ভব, যখন প্রতিটি বিদ্যালয়কে কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা যাবে যা পরিচালিত হবে বিকেন্দ্রীকৃত ও এলাকাভিত্তিক স্থানীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে, আর কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো একে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল সহায়কের ভূমিকা পালন করবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোরভাবে কেন্দ্রীভূত। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পাঠ্যক্রমের গতিসীমা থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সবকিছুই ওপর থেকে নির্ধারণ করে দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক এই একমুখীতা শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধিতে সহায়তা করলেও, এটি একই সাথে স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগ এবং প্রশাসনিক গতিশীলতাকে স্থবির করে দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালন কাঠামোর এই ঢালাও এককেন্দ্রী করণের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এটি দেশের অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে আমলে নেয় না। উদাহরণস্বরূপ, হাওর অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়কে যে ধরনের ভিন্ন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়, ঢাকা শহরের একটি ব্যস্ত এলাকার বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। যখন হাজার হাজার বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর একটি অভিন্ন রূপরেখা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন স্থানীয় বাস্তবতা অনিবার্যভাবেই উপেক্ষিত হয়। ফলস্বরূপ, উপজেলা ও ক্লাস্টার স্তরের শিক্ষা অফিসগুলো কেবল প্রশাসনিক কাগজপত্রের হিসাব মেলানো এবং নিয়ম পালনের তদারকিতেই ব্যস্ত থাকে। শিক্ষাদানের গুণগত মানোন্নয়ন কিংবা শিখন প্রক্রিয়াকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তাদের থাকে না।

একটি কার্যকর, বিকেন্দ্রীকৃত এবং বিদ্যালয়-কেন্দ্রিক মডেল দেখতে কেমন হতে পারে? এর সূচনা হতে হবে শিক্ষকের নেতৃত্বে, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় ইকোসিস্টেমকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে। যেন তারা স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো নিজেরা চিহ্নিত করতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে সমাধান সূত্র তৈরি করতে পারেন।

একটি কঠোর ও অপরিবর্তনীয় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে, আর্থিক সম্পদের বরাদ্দ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সরাসরি বিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো সুনির্দিষ্ট বিদ্যালয় মৌসুমি বন্যার কারণে কম উপস্থিতির সমস্যায় ভোগে, তবে কেন্দ্রীয় আমলাতান্ত্রিক অনুমোদনের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা না করে, স্থানীয় ব্যবস্থাপনার হাতেই শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার পরিবর্তন বা বিশেষ ঘাটতি পূরণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্বায়ত্তশাসন থাকা দরকার। তবে মনে রাখতে হবে, বিকেন্দ্রীকরণ মানেই কিন্তু মন্ত্রণালয় বা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে অকার্যকর বা অপ্রয়োজনীয় করে তোলা নয়। বরং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা Command-and-control মডেল থেকে পরিবর্তিত হয়ে Support-and-enable কাঠামোয় রূপান্তর করতে হবে। কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর মূল কাজ হওয়া উচিত সামষ্টিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা, সম্পদের সমবণ্টন নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের জন্য উচ্চমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। একই সাথে, আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যবর্তী স্তরগুলো, যেমন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের কাঠামোগতভাবে শিক্ষাবিষয়ক মেন্টর বা পরামর্শদাতা হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। কেবল পরিদর্শকের মতো ফাইল বা চেকলিস্ট পূরণ করার সনাতন দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে, তাদের উচিত হবে ক্লাস্টারের বিদ্যালয়গুলোকে সাথে নিয়ে স্থানীয় উপযোগী পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করা, সর্বোত্তম চর্চাগুলো নিজেদের মধ্যে বিনিময় করা এবং তাৎক্ষণিক সম্পদের ঘাটতি দূর করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। তাদের হতে হবে অ্যাকাডেমিক লিডার এবং সহায়তা প্রদানকারী। এর সাথে উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টারকেও যুক্ত করতে হবে কার্যকরভাবে। যাতে শিক্ষকগণকে স্থানীয়ভাবে চাহিদাভিত্তিক পেশাগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা প্রদান করা যায়।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বিপক্ষে সাধারণত যে সমালোচনাটি করা হয় তা হলো আর্থিক অপব্যবস্থাপনা কিংবা শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে অসমতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা। তবে বাস্তবতা হলো, জবাবদিহিতা তখনই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয় যখন তা সরাসরি, স্বচ্ছ এবং স্থানীয় পর্যায়ের হয়। যখন স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজের এলাকার বিদ্যালয়ের প্রতি প্রকৃত মালিকানা বোধ অনুভব করে, তখন স্বভাবতই সেখানে নজরদারি ও সামাজিক তদারকি বৃদ্ধি পায়। অভিভাবকরা যখন দেখেন যে বিদ্যালয়ের স্থানীয় পরিকল্পনায় তাদের মতামত প্রতিফলিত হচ্ছে, তখন তারা শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সন্তানদের পড়াশোনার পরিবেশ গঠনে অনেক বেশি সক্রিয় ও সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। আমাদের সফল বিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে এর প্রমাণ মিলবে সহজেই। তাছাড়া, কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুকে বিদ্যালয় স্তরে নিয়ে আসার মাধ্যমে আমরা এমন একটি গতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারি যেখানে নতুন নতুন উদ্ভাবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হবে। ধরা যাক, কোনো একটি উপজেলার একটি বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পাঠন দক্ষতা উন্নয়নের একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায় উদ্ভাবন করল; সেই স্থানীয় সাফল্যকে ঢাকার কোনো নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে, সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের অন্যান্য প্রতিবেশী বিদ্যালয়গুলোতে অনেক দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার বা শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের পরবর্তী উন্নয়নের লক্ষ্য হলো শিক্ষার আপসহীন গুণগত মান নিশ্চিত করা। কিন্তু শিক্ষার এই গুণগত মান কেন্দ্রীয় কোনো মন্ত্রণালয়ে উৎপাদন করে প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়; একে প্রতিটি স্বতন্ত্র শ্রেণিকক্ষে স্থানীয়ভাবেই লালন করতে হবে। আমাদের সামনে বিদ্যমান বিস্তৃত গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও উপাত্তকে যদি আমরা সত্যিই কাজে লাগাতে চাই, তবে ‘কেন্দ্রীয় নির্দেশনাই প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতির একমাত্র চাবিকাঠি’ এই প্রশাসনিক মোহ আমাদের ত্যাগ করতে হবে। এখন সময় এসেছে আমাদের বিদ্যালয়গুলোকে ক্ষমতায়ন করার, মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের ওপর আস্থা রাখার এবং তৃণমূলকে সহায়তা করার জন্য শিক্ষা প্রশাসনকে কাঠামোগতভাবে পুনর্গঠন করার। যখন প্রতিটি স্বতন্ত্র বিদ্যালয়কে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব দেওয়া হবে, কেবল তখনই, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের শিশুদের কাছে দেওয়া তার প্রকৃত অঙ্গীকার পূরণ করতে পারবে।

(লেখক: জগজ্জীবন বিশ্বাস, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের একজন প্রান্তিক শিক্ষাকর্মী। তিনি শিশু শিক্ষা বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ইমেইল: jagazziban@gmail.com)