খামেনিকে হত্যা করে কি নতুন বিপদ ডেকে আনল ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধের পুরোনো ও জনপ্রিয় কৌশলগুলোর একটি হলো শত্রুপক্ষের শীর্ষ নেতার ‘মাথা কেটে ফেলা’ অর্থাৎ নেতাকে হত্যা বা অপসারণ করা। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় এ কৌশল প্রায়ই বিপরীত ফল বয়ে এনেছে।
যুদ্ধকালীন সময়ে শীর্ষ নেতাকে হত্যার ঘটনা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যায় সম্ভাব্য ‘সাফল্য’ নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন।
তবে ৮৬ বছর বয়সি, শারীরিকভাবে দুর্বল এক নেতাকে হত্যা করা যিনি ইতোমধ্যে উত্তরাধিকার ঠিক করে রেখেছেন তাকে হত্যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির বিচারে বড় কোনো কৌশলগত অর্জন নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, খামেনিকে সরিয়ে দিলে পরবর্তী নেতৃত্ব বা শাসনব্যবস্থা যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থের পক্ষে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বরং মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা বলছে, নেতৃত্ব হত্যার কৌশল স্থিতিশীলতা আনে না; অনেক সময় আরও কঠোরপন্থি উত্তরসূরি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিক ইতিহাস তার প্রমাণ বহন করে। ইরাকে মার্কিন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে ইরাকি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়; পরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এতে ইসরায়েলবিরোধী এক শাসনের অবসান ঘটলেও ক্ষমতার শূন্যতায় ইরানপন্থি শক্তির উত্থান ঘটে।
পরবর্তী দুই দশকে ইরাক ইরানের আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্তার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। মার্কিন আগ্রাসনের পর সৃষ্ট নিরাপত্তা শূন্যতা থেকে বিভিন্ন বিদ্রোহের জন্ম হয়; এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল আইএসআইএলের উত্থান। সংগঠনটি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়, হাজারও মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ইউরোপমুখী শরণার্থী সংকট তীব্র হয়।
হামাসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০০০ সালের শুরু থেকে ইসরায়েল সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালায়। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন ও তার উত্তরসূরি আবদেল আজিজ রান্তিসি নিহত হন। পরবর্তী সময়ে ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজায় হামাসের নেতৃত্বে আসেন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখেন।
হিজবুল্লাহর ইতিহাসেও নেতৃত্ব হত্যার প্রভাব স্পষ্ট। ইসরায়েল যখন সংগঠনটির তৎকালীন নেতা আব্বাস আল-মুসাভিকে হত্যা করে, তখন পরবর্তীতে হাসান নাসরুল্লাহ নেতৃত্বে আসেন এবং সংগঠনটিকে আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে রূপ দেন।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও নেতৃত্ব হত্যার ধারাবাহিকতা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাঠামো দুর্বল করতে পারে, কিন্তু তাদের পেছনের আদর্শ বা ‘প্রতিরোধের’ ধারণাকে নির্মূল করতে পারে না। ফলে সাময়িক স্থবিরতার পর নতুন সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যায়।
ইরানের ক্ষেত্রে খামেনির উত্তরসূরি কে হবেন, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে তিনি খামেনির মতো আলোচনায় আগ্রহী হবেন—এমনটি নিশ্চিত নয়। ওমানের মধ্যস্থতায় মাস্কট ও জেনেভায় হওয়া আলোচনায় খামেনির নেতৃত্বে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিল বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়। নতুন নেতৃত্বের সেই রাজনৈতিক পরিসর থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়ার মতো চাপ সৃষ্টি করে, তবে তার পরিণতি কী হবে তা অনুমান করা কঠিন। তবে ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্রীয় ভাঙন দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে, যার প্রভাব শুধু অঞ্চলেই নয়, ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছায়।
এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—ইরানে ‘মাথা কেটে ফেলার’ কৌশল থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লাভ কী?
নেতানিয়াহুর জন্য এটি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সাফল্য হতে পারে। সম্ভাব্য নির্বাচন ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে তার জন্য জনপ্রিয়তা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের রাজনীতিতে নিরাপত্তা ইস্যু প্রায়ই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়।
কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে হিসাবটা জটিল। যুদ্ধবিমুখ এক মার্কিন জনমতের সামনে দূরবর্তী দেশের এক প্রবীণ নেতাকে হত্যার সাফল্য তুলে ধরা কতটা রাজনৈতিক সুফল দেবে, তা অনিশ্চিত। জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটের সময়ে বিদেশি সংঘাতে বিপুল অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। অনেক আমেরিকানের চোখে এটি ‘ইসরায়েলের যুদ্ধ’ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
এ মুহূর্তে এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেনা মোতায়েন করছেন না। কোনো এক পর্যায়ে তাকে বোমাবর্ষণও বন্ধ করতে হবে এবং বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে। তিনি পেছনে রেখে যাবেন এমন এক বিপর্যয়, যার ভার আঞ্চলিক মিত্রদের বইতে হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক জোট ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর দেশের অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠবেই।
এটি হবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি সামরিক অভিযান, যা করদাতাদের অর্থ, মার্কিন সেনাদের জীবন এবং পররাষ্ট্র নীতির প্রভাব—সবকিছুর ক্ষতি হবে, কিন্তু বিপরীতে বাস্তব কোনো সুফল মিলবে না। আশা করা যায়, ওয়াশিংটন অবশেষে এই শিক্ষা নেবে যে হত্যা ও শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার কৌশল কখনো কার্যকর সমাধান নয়।
লেখক: পুরস্কারপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক।