লটারি থেকে ভর্তি পরীক্ষা: শৈশব চুরির নতুন আয়োজন

একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের শিক্ষা সম্পর্কিত দর্শনের ওপর। সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্তের কথা। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে মেধা অন্বেষণ সহজ হবে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা দর্শনের এক বড় ধরনের বিচ্যুতি। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সামাজিকভাবে বৈষম্যমূলক, মনস্তাত্ত্বিকভাবেও ক্ষতিকর; যা কোচিং বাণিজ্যেরও এক নতুন মহোৎসবের ক্ষেত্র তৈরি করবে।
অথচ ভালো স্কুলে মেধাবীদের নিয়ে আসা-রাষ্ট্রের কাজই নয়। রাষ্ট্রের কাজ হলো সবার জন্য সমান ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। লটারি পদ্ধতি যখন চালু ছিল, তখন একজন কম মেধাবী শিক্ষার্থীও দেশের সেরা স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেত এবং সেখানে সে ভালো শিক্ষকের সংস্পর্শে থেকে ধীরে ধীরে নিজের উন্নতি করতে পারত। কিন্তু লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার এই সিদ্ধান্তে রাষ্ট্র কেবল ‘মেধাবীদের’ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার ইঙ্গিত বহন করছে, যা আসলে পরোক্ষভাবে সাধারণ ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের দায়ভার অস্বীকার করে।
মেধার সংজ্ঞা ও রাষ্ট্রের ভুল অগ্রাধিকার
আমাদের প্রচলিত ধারণা, ভর্তি পরীক্ষায় যে শিশু বেশি নম্বর পায়, সে’ই মেধাবী। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বলে, মেধা কোনো স্থির বিষয় নয়। বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান মনস্তাত্ত্বিক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড গার্ডনারের 'মাল্টিপল ইন্টেলিজেন্স' তত্ত্ব অনুযায়ী, একেকটি শিশুর মেধা একেক দিকে থাকে। কেউ গণিতে ভালো, অনেকে ভাষা বা শিল্পকলায় সেরা - আবার কেউ ভালো খেলাধুলায়। অর্থাৎ, মাত্র ৫-৬ বছর বয়সী একটি শিশুকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে 'মেধাবী' বা 'অমেধাবী' হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবেই ভুল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ হওয়া উচিত ছিল - দেশের সব স্কুলকে সমান মানের করে গড়ে তোলা। কিন্তু তারা উল্টো পথে হাঁটছে। ভালো শিক্ষার্থীদের ভালো স্কুলে জড়ো করা কোনো কৃতিত্ব নয়, বরং একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলাই প্রকৃত সাফল্য। রাষ্ট্র যখন কেবল সেরা স্কুলগুলোর দিকে নজর দেয়, তখন প্রান্তিক পর্যায়ের স্কুলগুলো আরও অবহেলিত হয়ে পড়ে। এর ফলে তৈরি হয় এক ধরনের 'এলিটিজম' বা ‘অভিজাততন্ত্র’- যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শৈশব চুরি ও ‘বিষাক্ত’ মানসিক চাপ
প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তির জন্য একটি শিশুকে যখন যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা অপূরণীয়। তাদের শিশু মনেই এই ধারণা গেঁথে যায় যে, জীবনে জয়ী হওয়াটাই সবকিছু, শেখাটা গৌণ। একটি নামী স্কুলে সুযোগ না পেলে শিশুটি নিজেকে পরিবারের কাছে ‘বোঝা’ বা ‘ব্যর্থ’ ভাবতে শুরু করে। এই হীনম্মন্যতা তার আত্মবিশ্বাসকে সারাজীবনের জন্য ধসিয়ে দিতে পারে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তা তৈরি করে। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের অভিমতও ভিন্ন কিছু নয়। তাদের মতে, শিশুর মস্তিষ্ক ৭-৮ বছর বয়স পর্যন্ত অত্যন্ত নমনীয় থাকে। এই সময়ে তাদের সৃজনশীলতা ও খেলার মাধ্যমে শেখার কথা। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যখন তাকে মুখস্থ বিদ্যায় অভ্যস্ত করা হয়, তখন তার প্রাক-মস্তিস্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
ভর্তি পরীক্ষার এই অসম প্রতিযোগিতা শিশু মনে এক ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে। শৈশবেই তারা শিখতে শুরু করে যে, সহপাঠীরা তার বন্ধু বা খেলার সাথি নয়, বরং একেকজন ‘প্রতিপক্ষ’-যাদের টপকে তাকে ওপরে উঠতে হবে। এই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা শিশুর সহজাত সামাজিক সহমর্মিতা ও দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তি হতে না পারলে তার ছোট্ট মনেই তৈরি হয় হীনম্মন্যতা। বিখ্যাত জার্মান-আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসন তার ‘মনো-সামাজিক উন্নয়ন তত্ত্বে’ দেখিয়েছেন, যে শিশু ৫ বছর বয়সে নিজেকে ‘প্রত্যাখ্যাত’ মনে করে, তার পক্ষে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র বা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সরকার আসলে মেধাবী বাছাই করতে গিয়ে একটি সহানুভূতিহীন ও মানসিকভাবে বিভক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলার ঝুঁকি নিচ্ছে।
শুধু তাই নয়, একটি ৫-৬ বছরের শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের প্রধান শর্তই হলো অবাধে খেলাধুলা এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা শিশুকে অবশ্যই পড়ার টেবিলের চার দেয়ালে বন্দি করে ফেলবে। যখন একটি শিশুর দিনের সিংহভাগ সময় কাটবে কোচিং সেন্টারে অথবা মুখস্থ বিদ্যার চাপে, তখন তার জীবন থেকে ‘খেলার সুযোগ’ চিরতরে হারিয়ে যাবে। এতে তার মনের ওপরও প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু সামাজিকতা, সহমর্মিতা এবং ধৈর্য শেখে; অথচ ভর্তি পরীক্ষার বেড়াজালে অজান্তেই তাদের শৈশব চুরি হয়ে যাবে-তা কি আমরা আসলেই ভেবেছি?
কোচিং বাণিজ্যের পুনরুত্থান
ভর্তি পরীক্ষা ফিরে আসা মানেই হলো কোচিং সেন্টারের পৌষ মাস। অতীতে রাজধানীর ভিকারুননিসা বা মতিঝিল আইডিয়ালের মতো স্কুলগুলোয় এক আসনের বিপরীতে শত শত শিশুকে প্রতিযোগিতা করতে দেখেছি। এমনও চিত্র দেখেছি যে, একজন অভিভাবক তার সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য দুই বছর আগে থেকেই কোচিং করান। কোন কোন অভিভাবককে দেখেছি সন্তান ভর্তির সুযোগ না পেলে, তাকে অন্য স্কুলে ভর্তি না করে, ভালো স্কুলে চান্স পাওয়ার আশায় আরও এক বা কখনও কখনও দুই বছর পর্যন্ত কোচিং করান।
অর্থাৎ যে শিশুটি অনায়াসেই অন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত, সে কেবল একটি ‘ট্যাগ’ বা ‘ব্র্যান্ড’ অর্জনের জন্য জীবনের দুটি মূল্যবান বছর কোচিংয়ের পেছনে ব্যয় করে ফেলছে। এটি সময় আর অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। অথচ দেশের সব স্কুল যদি সমান মানের হতো-তাহলে কোন শিক্ষার্থীকে শিশু বয়সে এমন মানসিক চাপ সহ্য করতে হতো না। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য ওই শিশুটি তো দায়ী নয়। দেশের সব স্কুলগুলোয় সমহারে মানসম্মত শিক্ষা চালু করতে না পারার ব্যর্থতা অবশ্যই রাষ্ট্রের।
কোচিং মানেই মোটা অঙ্কের টাকা। যে অভিভাবক দিনমজুর, নিম্ন আয়ের মানুষ কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত তাদের পক্ষে কি সম্ভব সন্তানকে মাসে ৫-১০ হাজার টাকা দিয়ে কোচিং করানো? অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষা আসলে একটি ‘অর্থনৈতিক ফিল্টার’ হিসেবেও কাজ করছে আমাদের সমাজে। যেখানে কেবল টাকা থাকলেই ভালো স্কুলে পড়ার ৯০ ভাগ নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, যা সংবিধানের ২য় ভাগের ১৭ নং অনুচ্ছেদের পরিপন্থি, যেখানে সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগের কথা বলা হয়েছে।
দুর্নীতির নতুন দ্বার উন্মোচনের সম্ভাবনা
লটারি পদ্ধতিতে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সবার সামনে ফলাফল নির্ধারিত হতো বলে সেখানে দুর্নীতির সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তটি খাতা মূল্যায়ন এবং নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে এক গভীর অস্বচ্ছতার পথ তৈরি করতে পারে। একটি শিশু পরীক্ষার খাতায় ঠিক কত নম্বর পেল, কার মাধ্যমে সেই খাতা মূল্যায়ন করা হলো, যত নম্বর দেখানো হচ্ছে-সে আদৌ কি এতো নম্বর পেয়েছে? নাকি আরও কম নম্বর পেয়েছে- এসব তথ্য বরাবরই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থাকে। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং প্রভাবশালী মহলের মধ্যে এক ধরনের গোপন আঁতাত বা ‘ভর্তি বাণিজ্যের’ এক নতুন মহোৎসব শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ফাঁস একটি নিয়মিত ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে এসএসসি কিংবা এইচএসসি’র মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষাগুলোতেই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়, সেখানে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ভর্তি পরীক্ষা কতটা নিরাপদ থাকবে-সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রভাবশালী মহলের দাপটে বা অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার আগের রাতেই কোনো বিশেষ প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন পৌঁছে যাবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
ছোট্ট একটি শিশু যখন তার জীবনের প্রথম ধাপেই দেখবে যে, যোগ্যতার চেয়ে ‘প্রভাব’ বা ‘অনৈতিক পন্থা’ বেশি কার্যকর, তখন তার কোমল মনে সততা ও ন্যায়ের প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতের জন্য খুবই উদ্বেগের।
বৈশ্বিক বাস্তবতা
আমরা যখন মুখে ‘বিশ্বমানের শিক্ষা’র বুলি আওড়াই, তখন উন্নত বিশ্বের সফল দেশগুলো কীভাবে তাদের প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনা করছে-তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বলছে, শৈশবে প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘সহযোগিতা’ এবং ‘সমান সুযোগ’ একটি জাতির মেরুদণ্ড গঠনে বেশি কার্যকর।
সমতার রোল মডেল হচ্ছে ফিনল্যান্ড। দেশটিতে প্রাথমিক স্তরে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা নেই। সেখানে প্রতিটি শিশু তার নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। রাষ্ট্র কঠোরভাবে নিশ্চিত করে, দেশটির প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সমান। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের পেছনে অভিভাবকদের অন্ধ দৌড় বা বাড়তি চাপের প্রয়োজন হয় না।
অপরদিকে, জাপানে প্রাথমিক স্তরের প্রথম কয়েক বছর কোনো ‘গ্রেডিং পদ্ধতি’ বা নম্বরভিত্তিক লড়াই নেই। সেখানে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে ‘চরিত্র গঠন’ এবং ‘সামাজিক শিষ্টাচার’ শেখানোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। জাপানিদের মতে, শিশুকে আগে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, তারপর আসবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।
জনবহুল দেশ চীনের কাছ থেকেও আমরা শিক্ষা নিতে পারি। চীন বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়েও সম্প্রতি তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সেখানে ‘নেইবারহুড পলিসি’ বা নিজ এলাকার স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করা হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, চীন সরকার ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাণিজ্যিক কোচিং এবং শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি প্রায় নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব শিশু যাতে সমান সুযোগ পায় এবং অভিভাবকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ না পড়ে।
এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দুই দেশ ভারত এবং পাকিস্তানে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতে ইতিমধ্যেই ‘শিক্ষার অধিকার আইন’ বা রাইট টু এডুকেশন অনুযায়ী শিশুর কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তির আইনি বিধান রয়েছে।
এরপরও সরকার যদি মেধাবীদের আলাদা করে বাছাই করতেই চায়, তাহলে তা অবশ্যই ভিন্ন পদ্ধতিতে হওয়া উচিত।
মেধাবী বাছাইয়ে বিকল্প প্রস্তাব
সরকার যদি সত্যিই মেধাবীদের বিশেষ যত্ন নিতে চায়, তবে পুরো দেশকে অস্থিতিশীল না করে একটি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে শুরুতে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৪টি এবং ঢাকা ও প্রধান শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্কুল মিলিয়ে মোট ১০০টি স্কুলকে ‘কেন্দ্রীয় উৎকর্ষ কেন্দ্র’ বা ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে। তখন কেবল এই স্কুলগুলোতেই ভর্তি পরীক্ষা হতে পারে এবং এই ১০০টি স্কুলের জন্য একটি বিশেষ বোর্ড বা ইউনিটের অধীনে আলাদা সিলেবাস ও মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।
তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই এই বিশেষ স্কুলগুলোর তুলনা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এসব স্কুলের সঙ্গে দেশের অন্য স্কুলের ফলাফল কখনোই তুলনা করা যাবে না। এটি করতে পারলে-প্রাথমিকভাবেই আমরা প্রতিবছর ১ হাজার ‘প্রবল মেধাবী’ শিক্ষার্থী পাব। তবে অবশ্যই এটি মেধা বাছাইয়ের খণ্ডকালীন একটি সমাধান। স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমমানের শিক্ষা নিশ্চিতের মধ্যে। আার এটা তখনই করা সম্ভব, যখন শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে-সেখানে মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। আর এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে ফিনল্যান্ডের মতোই আমাদের কোনো শিশুর ওপর মানসিক চাপ তৈরি হবে না। অভিভাবকরাও থাকবেন নিশ্চিন্তে।
আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি মৌলিক অধিকার। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুদের শৈশব কেড়ে নেওয়া এবং কোচিং বাণিজ্যের রাস্তা প্রশস্ত করা কোনোভাবেই একটি প্রগতিশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি স্কুল হবে এক-একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ। লটারি পদ্ধতি হয়তো শতভাগ নিখুঁত ছিল না, কিন্তু তা অন্তত একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ভর্তি পরীক্ষার এই 'প্যানডোরা বক্স' খোলার আগে আমাদের আরও একবার ভাবা উচিত- আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রতিযোগিতার মেশিন হিসেবে দেখতে চাই, নাকি একজন সুস্থ ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে? উত্তরটি আমাদের পলিসি মেকারদের হাতে।
লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ, শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়ন বিশ্লেষক