logo

এবার লিসবনের ওয়েব সামিটের চমক এআই হিউম্যানয়েড রোবট

ওমর ফারুক নাঈম
এবার লিসবনের ওয়েব সামিটের চমক এআই হিউম্যানয়েড রোবট
লিসবনে ‘ওয়েব সামিট ২০২৬’-এ হিউম্যানয়েড রোবটের পারফরমেন্স। ছবি: লেখক সূত্রে পাওয়া

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), হিউম্যানয়েড রোবট, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে আবারও বিশ্ব প্রযুক্তি অঙনের নজর কাড়তে যাচ্ছে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সম্মেলন ‘ওয়েব সামিট ২০২৬’-এ এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের মতো দেখতে এবং মানুষের মতো কাজ করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবট। সেই চমক মাতাবে এবারের ওয়েব সামিটের আসর। একই সথে আন্তর্জাতিক স্টার্টআপ, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সম্মেলনটি পরিণত হচ্ছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলায়।

আগামী ৯ থেকে ১২ নভেম্বর লিসবনে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন উদ্ভাবন, পণ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবে। প্রযুক্তি খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবারের আয়োজনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এবং বাস্তব জগতে রোবটের ব্যবহার। বিশেষ করে হিউম্যানয়েড রোবটের উন্নয়ন প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উৎপাদনব্যবস্থা, শিল্পকারখানা, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। মানুষের মতো চলাফেরা, বস্তু শনাক্ত করা, নির্দেশনা বুঝে কাজ সম্পাদন এবং বিভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে আধুনিক রোবট প্রযুক্তি। ফলে রোবট আর কেবল গবেষণাগার কিংবা প্রদর্শনীর বিষয় হয়ে থাকছে না।

শিল্প উৎপাদন, গুদাম ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা, বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতে এর ব্যবহার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এবারের ওয়েব সামিটে ইউনিট্রি ও আগিবটের মতো রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারে চীনসহ এশিয়ার রোবট নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কথাও তুলে ধরছে।

স্নোভ.আইও-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ওলেক্সি ক্রাটকো বলেন, আরও বেশি সম্ভাব্য গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করলেই যে বেশি সাড়া পাওয়া যাবে, বিষয়টি এমন নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন সহজেই বিপুলসংখ্যক বার্তা তৈরি করতে পারে। কিন্তু আপনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং কেন আপনার বার্তাটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, সেটি বোঝাই কার্যকর যোগাযোগের মূল বিষয়। যাচাইকৃত তথ্য, গবেষণা এবং প্রচারাভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু বেশি ইমেইল পাঠানোর পরিবর্তে অর্থবহ যোগাযোগ ও কার্যকর ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরিতে মনোযোগী হতে সহায়তা করছি।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, আগামী কয়েক বছরে হিউম্যানয়েড রোবট কতটা মানুষের দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠবে এবং এর ফলে প্রচলিত শ্রমবাজারে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে। একদিকে রোবট ও এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সহজ করতে এবং ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে।অন্যদিকে স্বল্প ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীদের চাকরি, শ্রমিকের অধিকার এবং প্রযুক্তির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। তাই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের পাশাপাশি এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রভাবও এবারের সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এআইয়ের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তন করছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার, স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট, রোবটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এসব উদ্ভাবনকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে ওয়েব সামিটের মতো আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

১৫ বছরের নিজস্ব অর্থায়নে বিকাশের পর আলবেনীয় সফটওয়্যার কোম্পানি কালেমি এই নভেম্বরে লিসবনে অনুষ্ঠিতব্য ওয়েব সামিট ২০২৬-এ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে। সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পাবলার এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত কালেমি, ২০১১ সালে এক ব্যক্তির প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়ে বর্তমানে ২০ জনের একটি দলে পরিণত হয়েছে, যারা পাবলার, লিঙ্কি এবং কিবো এই তিনটি পণ্য তৈরি করছে।

কালেমির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এরভিন কালেমি বলেন, আমাদের পরিচিতি পাওয়ার অনেক আগেই আমাদের পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছিল। আমরা আলবেনিয়া থেকে বিশ্বের জন্য ১৫ বছর ধরে কাজ করে চলেছি। ওয়েব সামিটের মাধ্যমেই আমরা প্রথমবারের মতো কালেমিকে বিদেশে নিয়ে যাব এবং সেই বিশ্বের সামনে নিজেরাই উপস্থিত হব।

ওয়েব সামিটের একই জায়গায় মিলিত হচ্ছেন নতুন উদ্যোক্তা, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারী এবং বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকেরা। ফলে একটি নতুন ধারণা বা ছোট পরিসরে শুরু হওয়া উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সুযোগ পেতে পারে। সম্মেলনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হচ্ছে স্টার্টআপ ও বিনিয়োগকারীদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ।

নতুন উদ্যোক্তারা তাদের প্রযুক্তি, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বাজার সম্প্রসারণের কৌশল সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে দ্রুত সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে এমন প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ খুঁজে দেখছেন। বিশেষ করে এআই, রোবটিকস, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, জলবায়ু প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্থিক প্রযুক্তির মতো খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আন্তর্জাতিক স্টার্টআপ বাজারে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। একটি স্টার্টআপের জন্য শুধু অর্থায়ন নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ, অভিজ্ঞ পরামর্শক পাওয়া, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়েব সামিট সেই সুযোগগুলো তৈরির একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করছে। ২০২৫ সালের সম্মেলনে ১৫৭টি দেশের ৭১ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী, ২ হাজার ৭০০-এর বেশি স্টার্টআপ এবং প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জন বিনিয়োগকারী অংশ নিয়েছিলেন। ফলে লিসবনের এই আয়োজন যে শুধু প্রযুক্তি প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের একটি বড় নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, তা আগের আয়োজনের পরিসর থেকেই স্পষ্ট।

২০২৬ সালের সম্মেলনেও আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকার উদ্যোক্তাদের জন্যও এটি নিজেদের প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণ উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে নিজেদের উদ্ভাবন উপস্থাপন করে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের পথ তৈরি করতে পারেন।

এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এই অঞ্চলের তরুণদের মধ্যে সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, আর্থিক প্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবাভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। এসব উদ্যোগের অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার সক্ষমতা রাখে। ওয়েব সামিটের মতো আয়োজন থেকে এশিয়ান উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, বিনিয়োগের ধরন এবং প্রযুক্তির নতুন প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রও খুঁজে দেখতে পারেন।

তুরস্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও পিটগ্রোথের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সেরকান ইয়াগিজ জানান, প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির সাথে, কর্পোরেশনগুলোকেও ঠিক ততটাই দ্রুত সেরা প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছাতে হবে। আর একারণেই আমরা পিটগ্রোথ তৈরি করেছি। কর্পোরেশন এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলো কোনো স্থির তালিকায় নয়, বরং একটি জীবন্ত বাজারে একে অপরকে খুঁজে পায়, যা প্রতিদিন আপডেট হয়। সেই বাজারে দূরত্বের গুরুত্ব কম: লিসবনের একটি স্টার্টআপ দেখতে পারে ইস্তাম্বুলের একটি ব্যাংক কী খুঁজছে।

এবারের সম্মেলনে এআই ও হিউম্যানয়েড রোবটের অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক স্টার্টআপ বিনিয়োগের বিষয়টি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কারণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বড় একটি অংশ নির্ভর করছে এআই, রোবটিকস এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে নতুন সমাধান তৈরি করতে পারবে, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, এআইয়ের জবাবদিহি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সব মিলিয়ে ওয়েব সামিট ২০২৬ শুধু নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শনের একটি আয়োজন নয়; বরং ভবিষ্যতের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং মানবজীবনের পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।

লিসবনের এই সম্মেলনে কোন প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে নতুন নেতৃত্ব দেবে, কোন স্টার্টআপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সফল হবে এবং এআই ও হিউম্যানয়েড রোবট মানুষের জীবন ও কাজের ধরন কতটা বদলে দেবে, সেদিকেই এখন নজর প্রযুক্তি বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অঙ্গনের।