Advertisement

আসুন পাসপোর্ট না বদলিয়ে দেশকে বদলাই

আসুন পাসপোর্ট না বদলিয়ে দেশকে বদলাই
ছবি: সংগৃহীত

বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, অথচ কোনো বিমানবন্দরে বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত কিংবা অন্যান্য যেসব দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা, কিংবা সন্দেহভরা দৃষ্টির মুখোমুখি হননি, এমন বাংলাদেশি খুব কমই আছেন। অনেক সময় একই বিমানে আগত অন্য দেশের যাত্রীরা কয়েক মিনিটের মধ্যে ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশিদের আলাদা সারিতে দাঁড় করিয়ে অতিরিক্ত যাচাই করা হয়।

Advertisement

একজন বাংলাদেশি হিসেবে এটি আমাদের জাতীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ‘ইস! যদি অন্য দেশের পাসপোর্ট থাকত!’

এই আকাঙ্ক্ষায় উন্নত বিশ্বের নাগরিকত্ব অর্জনের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি চেষ্টা করছেন। এই দলে রয়েছেন ছাত্র-শিক্ষক, আমলা, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষই। আজকের বাস্তবতায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে অনেকেই বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের পথ বেছে নিতেন।

কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি: পাসপোর্ট বদলালেই কি সত্যিই মর্যাদা বদলে যায়? উত্তর সঙ্গত কারণেই, না।

হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের কোনো দেশের পাসপোর্ট থাকলে ভিসা পাওয়া সহজ হয়, ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ বাড়ে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিক হিসেবে নানা অধিকার ও সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা কেবল তার হাতে থাকা পাসপোর্টের রঙে নির্ধারিত হয় না।

একজন প্রবাসী বাংলাদেশির সম্মান অনেকাংশেই নির্ভর করে তার মাতৃভূমির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, আইনের শাসন, মানবসম্পদের মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর। বিশ্ব যখন একটি দেশকে সম্মান করে, তখন সেই দেশের নাগরিকও স্বাভাবিকভাবেই সম্মান পান।

পাসপোর্ট আসলে একটি ভ্রমণপত্র নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বের আস্থার প্রতীক। সম্প্রতি প্রকাশিত হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বে বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান ৯৭তম। এই অবস্থানে বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। এই সূচকটি আন্তর্জাতিক ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল ভ্রমণের সুযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের পাসপোর্টের বৈশ্বিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে। বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসামুক্ত অথবা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় ৩৫টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন।

একই সূচকে সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপের অনেক দেশ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের অধিকারী। তাদের নাগরিকরা ১৯০টিরও বেশি দেশে সহজে প্রবেশ করতে পারেন। একসময় আমাদের মতো উন্নয়নশীল ছিল এমন অনেক দেশও আজ বৈশ্বিক আস্থা অর্জন করেছে। প্রশ্ন হলো; তারা কীভাবে পারল?

উত্তরটি ভিসানীতিতে নয়; উত্তরটি রাষ্ট্র পরিচালনায়। একটি দেশের পাসপোর্ট তখনই শক্তিশালী হয়, যখন বিশ্ব সেই দেশকে বিশ্বাস করে। সেই বিশ্বাস গড়ে ওঠে শক্তিশালী অর্থনীতি, স্থিতিশীল রাজনীতি, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ প্রশাসন, নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে।

অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, ভিসার অপব্যবহার, বিদেশে অপরাধে জড়িয়ে পড়া, কর্মচুক্তি লঙ্ঘন কিংবা নিয়মবহির্ভূতভাবে অবস্থান করার মতো ঘটনাগুলোও একটি দেশের পাসপোর্টের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কয়েকজনের অসতর্ক বা অসৎ আচরণের মূল্য অনেক সময় পুরো জাতিকেই দিতে হয়।

আমরা প্রায়ই ভাবি, বিদেশে আমাদের কেন এত প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু খুব কমই ভাবি, আমাদের রাষ্ট্র এবং আমাদের সমাজ বিশ্বের কাছে কী বার্তা পাঠাচ্ছে।

আমরা যদি সত্যিই চাই যে বিশ্বের বিমানবন্দরে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হোক, তাহলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং নাগরিকের মানসিকতা বদলাতে হবে।

আমাদের অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনশীল করতে হবে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও বুঝতে হবে, তারা শুধু নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তারা বাংলাদেশেরও প্রতিনিধি। তাদের সততা, কর্মনিষ্ঠা, আইন মেনে চলা, পেশাগত দক্ষতা এবং সামাজিক আচরণই বিদেশে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে।

আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি, ‘দেশ আমাকে কী দিল?’ কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘আমি দেশকে কী দিলাম?’

একজন উদ্যোক্তার সৎ ব্যবসা, একজন শিক্ষকের মানসম্মত শিক্ষা, একজন চিকিৎসকের মানবিক সেবা, একজন সরকারি কর্মকর্তার সততা, একজন শ্রমিকের নিষ্ঠা, একজন গবেষকের উদ্ভাবন, একজন প্রবাসীর আইন মেনে চলা সব মিলিয়েই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। আর সেই ব্র্যান্ডের প্রতিফলন ঘটে একটি ছোট্ট নীল পাসপোর্টের শক্তিতে।

অনেকে হয়তো ব্যক্তিগত কারণে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করবেন। সেটি তাদের ব্যক্তিগত অধিকার। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জন্মভূমির পরিচয় কখনো বদলানো যায় না। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি এবং শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কও কোনো নতুন পাসপোর্ট মুছে দিতে পারে না।

দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতও একদিন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ ছিল। আজ তাদের পাসপোর্ট শক্তিশালী হয়েছে শুধু ভিসা চুক্তির কারণে নয়; বরং কয়েক দশকের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং সুশাসনের কারণে।

বাংলাদেশও পারে। কারণ আমাদের রয়েছে সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠী, শক্তিশালী প্রবাসী সম্প্রদায়, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং অদম্য মানুষের শক্তি। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, সুশাসন, জবাবদিহি এবং জাতীয় অঙ্গীকার।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যার পাসপোর্টের মান, মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও সমানভাবে উন্নত হয়।

যেদিন বিশ্বের মানুষ ‘বাংলাদেশ’ নামটি উচ্চারণ করবে আস্থা, শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সঙ্গে, সেদিন পৃথিবীর প্রতিটি ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বাংলাদেশি পাসপোর্টও সম্মানের প্রতীক হয়ে উঠবে। তাই আসুন, আমরা শুধু নিজের পাসপোর্ট বদলানোর স্বপ্ন না দেখে, দেশকে বদলিয়ে পাসপোর্টের মান বাড়ানোর আন্দোলনে শামিল হই।


লেখক পরিচিতি: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ।