মিডল ইস্ট আইয়ের কলাম/৯/১১-এর ২৫ বছরেও ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কি কিছুই শিখল না?

হুজুগ থেকে ইতিহাসকে আলাদা করতে, উদ্দেশ্য থেকে ফলাফল বুঝতে এবং রাজনৈতিক অপপ্রচার থেকে বাস্তবতাকে চিনে নিতে সিকি শতাব্দী বা ২৫ বছর যথেষ্ট সময়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এক ভয়াবহ হামলায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারান। সেই নিষ্ঠুর ঘটনা পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। ওয়াশিংটন চাইলে ওই হামলাকে একটি জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে পারত। অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি করতে তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগ নিতে পারত। একই সঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বের বহু অঞ্চলে কেন আমেরিকার বিরুদ্ধে এমন তীব্র ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল, তা নিয়ে নিজেদের দেশে গভীর পর্যালোচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেছে নেয় সম্পূর্ণ বিপরীত এক পথ।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা দেন, সন্ত্রাসীরা যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করেছে কারণ ‘তারা আমাদের স্বাধীনতাকে ঘৃণা করে’। এটি ছিল ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক এক যুক্তি। কারণ, এই তত্ত্ব মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির যাবতীয় দায় এক নিমেষেই মুছে দেয়। আরব ও মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদের প্রতি ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের সমর্থন নিয়ে তখন আর কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকল না। নব্বইয়ের দশকে ইরাকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া প্রাণঘাতী নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সেনাঘাঁটি স্থাপন কিংবা ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখলকারী ইসরায়েলের প্রতি তাদের অন্ধ সমর্থন—কোনো কিছু নিয়েই দেশটিতে কোনো আত্মোপলব্ধি হলো না।
যুক্তরাষ্ট্রের কাজের কারণে নয়, বরং তাদের জীবনযাত্রার কারণেই যদি অন্যরা তাদের ঘৃণা করে থাকে, তবে তো মার্কিন নীতি বদলানোর কোনো প্রয়োজন পড়ে না। নীতি বদলাতে হবে বাকিদেরই। এই চরম একপেশে ধারণাই তথাকথিত বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর মূল মতাদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর বিশ্ব দেখল একের পর এক যুদ্ধ, সামরিক আগ্রাসন, দখলদারিত্ব, নির্যাতন, বন্দীদের গোপনে অপহরণ, আবু গারিব ও গুয়ানতানামো কারাগারের বর্বরতা, ড্রোন হামলা, নির্বিচার নজরদারি আর প্রাচীন সব জনপদের চরম ধ্বংসযজ্ঞ। আর নিজ দেশের ভেতরে তারা চালু করল প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট, সন্দেহভাজনদের তালিকা, গোয়েন্দা চর নিয়োগ, মসজিদে নজরদারি, বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক বৈষম্য এবং জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার নজিরবিহীন বিস্তার। ২৫ বছর পর আজ বড় প্রশ্ন—এ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী শিখল?
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ ছিল না। অনেক মার্কিন কৌশলবিদ ভেবেছিলেন, একক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার এই দাপট প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তখন আত্মতুষ্টিতে ঘোষণা করেছিলেন ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’। নব্য রক্ষণশীল মার্কিন নীতিপ্রণেতা এবং তাদের জায়নবাদী মিত্ররা ৯/১১-এর সুযোগ নিয়ে সেই বিপুল শক্তিকে একটি সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পে রূপ দেয়।
২০০১ সালে তারা আফগানিস্তানে হামলা চালায়। এরপর ২০০৩ সালে সম্পূর্ণ মিথ্যা অজুহাতে আক্রমণ করে ইরাকে। দাবি করা হয়েছিল, সেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং সাদ্দাম হোসেন ৯/১১-এর সঙ্গে জড়িত। তবে ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য কেবল আল-কায়েদাকে দমন করা ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল বন্দুকের নলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়া, সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং নিজেদের অনুগত এক নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া।
এই সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প শেষ পর্যন্ত চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ ২০ বছর যুদ্ধ চালানোর পর ২০২১ সালের আগস্টে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে আফগানিস্তান ছাড়ে মার্কিন সেনারা। আর কাবুলের ক্ষমতায় আবার ফিরে আসে সেই তালেবানই, যাদের উৎখাত করতে তারা লড়াই শুরু করেছিল। অন্যদিকে ইরাক পরিণত হয় এক ধ্বংসস্তূপে। সেখানে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং উসকে দেওয়া হয়েছে জাতিগত সংঘাত। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা আজও পঙ্গু হয়ে আছে।
এই ব্যর্থতা কিন্তু সামরিক দক্ষতার অভাব নয়, এটি চিন্তার ব্যর্থতা। কারণ, বন্দুকের নলে কিংবা বোমা মেরে রাজনৈতিক বৈধতা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষ বিপুল সামরিক শক্তিকে হয়তো সাময়িকভাবে ভয় পেতে পারে, কিন্তু ভয় কখনো স্থায়ী আনুগত্য তৈরি করে না। দখলদারিত্ব সবসময় প্রতিরোধেরই জন্ম দেয়। ওয়াশিংটন বহু লড়াইয়ে জিতেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা গেছে। এই বিপুল সম্পদ অন্য কোনো গঠনমূলক কাজে ব্যয় করা যেত। অন্তহীন এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ব রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তনগুলোর দিকেও ওয়াশিংটন নজর দিতে পারেনি, বিশেষ করে চীনের উত্থানকে তারা দীর্ঘদিন অবহেলা করেছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক নেতৃত্বের। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন শুধু সামরিক ক্ষমতার জোরে নয়, বরং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের আদর্শ দেখিয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখত। কিন্তু ৯/১১-এর পর তাদের সেই নীতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের বৈপরীত্য ঢেকে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের একক মোড়লিপনা কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় হারিয়ে যায়নি; গত ২৫ বছরে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই তাদের একচ্ছত্র প্রভাব নষ্ট হয়েছে। বিশ্ব আজ বহুমুখী ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গেছে।
আমেরিকাকে নিরাপদ করার নামেই ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করা হয়েছিল। অথচ বাস্তবে তাদের ইরাক আক্রমণ একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে এমন এক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়, যা বিভিন্ন সহিংস গোষ্ঠীকে মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। কারাগারের নির্যাতন তাদের জন্য যোদ্ধা সংগ্রহের বিজ্ঞাপনে রূপ নেয়। আবু গারিব ও গুয়ানতানামো বে হয়ে ওঠে পশ্চিমা নিপীড়নের প্রতীক। আর ড্রোনের নির্বিচার হামলায় নিরীহ মানুষের মৃত্যু পুরো অঞ্চলের মনে মার্কিনদের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক সহিংসতা এমনি এমনি তৈরি হয় না। এই সত্য স্বীকার করার অর্থ নিরপরাধ মানুষের হত্যাকে সমর্থন করা নয়; বরং সহিংসতা বন্ধ করতে হলে তার পেছনের কারণগুলো বোঝা জরুরি। অথচ দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সহিংসতার ‘মূল কারণ’ নিয়ে আলোচনা করাকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এর মাশুল শুধু আফগানিস্তান বা ইরাক দেয়নি। ৯/১১-এর পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের হাতে বিরোধীদের দমনের মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। তারা যেকোনো রাজনৈতিক বিরোধীকে ‘চরমপন্থী’ আখ্যা দিয়ে জরুরি আইন জারি করতে শুরু করে। পশ্চিমা সরকারগুলো মুখে গণতন্ত্রের বুলি আউড়ালেও পর্দার আড়ালে এই রক্তচক্ষু স্বৈরশাসকদের সঙ্গেই নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জমতে থাকে।
২০১০ সালের মধ্যে লাখ লাখ তরুণ এমন এক সমাজে বড় হয়ে ওঠে, যেখানে রাজনৈতিক অধিকার বা অর্থনৈতিক সুযোগ—কোনোটাই ছিল না। এরপরই শুরু হয় ‘আরব বসন্ত’। আরব তরুণরা রাজপথে নেমে প্রমাণ করেছিল যে মুসলিম বিশ্বের মানুষকে স্বৈরতন্ত্র আর উগ্রবাদের যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে—আমেরিকার এই ধারণাটি কতটা মিথ্যা ছিল। কিন্তু তাদের এই জাগরণ যখন কায়েমি স্বার্থকে নাড়িয়ে দিল, তখন শুরু হলো পাল্টা আঘাত। মিসরের গণতান্ত্রিক উদ্যোগ ভেঙে দেওয়া হলো, লিবিয়া খণ্ডবিখণ্ড হলো, সিরিয়ায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এল, আর ইয়েমেন পরিণত হলো ধ্বংসস্তূপে। পশ্চিমারা দিনশেষে অনুগত স্বৈরশাসকদেরই ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা বেছে নিল।
গত ২৫ বছরে সবচেয়ে বড় যে সর্বনাশটি হয়েছে, তা হলো আন্তর্জাতিক সব নিয়মনীতির বিলোপ। আন্তর্জাতিক আইন যদি শুধু দুর্বল শত্রুর ওপর প্রয়োগ করা হয় আর বন্ধুদের ক্ষেত্রে শিথিল থাকে, তবে সে আইনের কোনো মর্যাদা থাকে না। ৯/১১-এর পর ওয়াশিংটন একের পর এক এমন সব সীমা লঙ্ঘন করেছে, যা আগে কেউ ভাবতেও পারত না। অন্য দেশে আগাম আক্রমণকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, নির্যাতনের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা হয়েছে, বিচার ছাড়া অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখাকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করা হয়েছে এবং ড্রোন দিয়ে মানুষ হত্যাকে সরকারি নীতি বানানো হয়েছে।
যে দেশ গুয়ানতানামো আর আবু গারিবের মতো বন্দিশালা চালায়, তারা কীভাবে অন্যদের মানবাধিকারের ছবক দেবে? জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া ইরাক আক্রমণ করে আমেরিকা কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনের কথা বলে? অন্যের সীমান্ত লঙ্ঘন করে মানুষ হত্যা করে তারা কীভাবে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবি তোলে?
ওয়াশিংটন ভেবেছিল এই নিয়ম ভাঙার অধিকার কেবল তারই আছে। কিন্তু অন্য শক্তিগুলোও এখন তাদের সেই পথই অনুসরণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিরাপত্তার অজুহাতে আগাম হামলা চালাতে পারে, তবে অন্য কোনো দেশ কেন পারবে না? আন্তর্জাতিক আদালতের রায় নিজেদের বিপক্ষে গেলে ওয়াশিংটন যদি তা অগ্রাহ্য করতে পারে, তবে তাদের বিরোধীরাই-বা কেন তা মানবে?
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর গাজায় ইসরায়েলের বর্বর ধ্বংসযজ্ঞে যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থন এই ভণ্ডামিকে পুরোপুরি উন্মোচিত করে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে অস্ত্র জুগিয়েছে, অর্থ দিয়েছে এবং নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের হত্যা, অনাহারে রাখা ও গণহত্যার সময়ে তাদের বারবার কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়েছে। গাজা এই আন্তর্জাতিক সংকটকে এক বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে ঠেকিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো আইনের বদলে গায়ের জোরের শাসন কায়েম হওয়া—যা এই পারমাণবিক যুগে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
যে সরকার বিদেশের মাটিতে সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ করে, সে একদিন নিজের দেশের নাগরিকদের ওপরও সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে—মার্কিন মুসলিম সম্প্রদায় খুব দ্রুত এই তিক্ত শিক্ষা পেয়েছে। ৯/১১-এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আরব ও মুসলিমদের নাগরিক এবং রাজনৈতিক অবস্থান বেশ সংহত হয়ে উঠছিল। আমি নিজে সেই আন্দোলনের অংশ ছিলাম। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে আমরা অভিবাসন মামলায় সরকারের ‘গোপন তথ্যপ্রমাণ’ ব্যবহারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজীবীদের নিয়ে বড় এক জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলাম। সেই আন্দোলনের মুখে ২০০০ সালে অনেক নির্দোষ ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিল পাস হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বেলা তিনটায় হোয়াইট হাউস থেকে এ বিষয়ে বড় এক নীতিগত ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় সেই ভয়াবহ হামলা।
এরপর রাজনৈতিক অধিকার পাওয়ার বদলে মার্কিন মুসলিমদের জন্য শুরু হয় সন্দেহ ও নিপীড়নের অন্ধকার অধ্যায়। এফবিআই চর নিয়োগ করে, মসজিদে নজরদারি শুরু হয়, সাধারণ মুসলিম পরিবারগুলো আতঙ্কে দিন কাটাতে থাকে। পরবর্তীতে এফবিআইয়ের কর্মকর্তা টেরি আলবুরি নিজেই ফাঁস করেন যে কোনো অপরাধের জন্য নয়, বরং কেবল ধর্ম, বর্ণ আর রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেই নিরপরাধ মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল।
এভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক মুসলিমবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া প্রতিষ্ঠা পায়। ইসলামি পরিচয়ের কারণেই মুসলিমদের নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখা হতে থাকে। কারো লম্বা দাড়ি রাখা, ধর্মীয় কাজে বেশি সময় দেওয়া বা ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলাকে মুক্তচিন্তার অধিকার হিসেবে না দেখে ‘চরমপন্থা’ হিসেবে দেখা হতে থাকে। এই ভয়ের রাজনীতি মুসলিমদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। অথচ এটি কেবল মুসলিমদের সমস্যা নয়; কোনো একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন মেনে নিলে দিনশেষে দেশের সব নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারই ক্ষুণ্ন হয়।
রাজনৈতিক ক্ষমতা মানে কেবল হোয়াইট হাউসে গিয়ে পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলা নয়। সরকারের ইফতার পার্টিতে যোগ দেওয়া বা ক্ষতিকর নীতির পক্ষে সাফাই গাওয়াও ক্ষমতা নয়। আসল ক্ষমতা হলো নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে মানুষকে সংগঠিত করা। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যা ব্যক্তি চলে গেলেও টিকে থাকবে, আপসহীন নেতৃত্ব তৈরি করা, নিজস্ব স্বাধীন গণমাধ্যম ও আইনি সক্ষমতা অর্জন করা এবং অন্যান্য অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলা।
নাইন-ইলেভেনের পরের দমনপীড়নের লক্ষ্য ছিল মার্কিন মুসলিমদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলা। কিন্তু বাস্তবে তা এক সাহসী ও সচেতন তরুণ প্রজন্ম তৈরি করেছে। নজরদারি আর সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে বড় হওয়া তরুণ মার্কিন মুসলিমরা আজ অনেক বেশি রাজনৈতিক সচেতন। তারা বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, অভিবাসী অধিকার এবং ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামে সামনের সারিতে লড়াই করছে। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আমেরিকার তরুণ ইহুদি, খ্রিষ্টান, কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো অধিকারকর্মীরা। ইতিহাস সাক্ষী—সংগঠিত মানুষ রুখে দাঁড়ালে কোনো একক ক্ষমতাই চিরকাল অজেয় থাকে না।
কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন চেষ্টা করেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে আলাদা করে দেখতে। কিন্তু তাদের এই ভণ্ডামি এখন আর টিকছে না। ফিলিস্তিন সংকট কোনো সাধারণ সীমান্ত বিরোধ নয়; এটি একটি জাতির ওপর চালানো দখলদারিত্ব, বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিকতা এবং একটি গোটা জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার নির্মম ইতিহাস।
৯/১১-এর পর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ইসরায়েলকে এক বিরাট সুযোগ এনে দেয়। তারা ফিলিস্তিনিদের মুক্তির সংগ্রামকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ তকমা দেয় আর নিজেদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে প্রচার করে ‘সন্ত্রাস দমন’ হিসেবে। দখলদার বনে যায় ভুক্তভোগী, আর নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের বানানো হয় নিরাপত্তার হুমকি। এর আড়ালে গাজায় বছরের পর বছর অবরোধ চাপিয়ে রাখা হয় আর পশ্চিম তীরে বাড়ানো হয় অবৈধ ইহুদি বসতি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনা কোনো শূন্যতা থেকে ঘটেনি। প্রতিরোধের ধরন নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু যে চরম অবরুদ্ধ পরিস্থিতি এর জন্ম দিয়েছিল, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এরপর গাজায় যে বর্বর গণহত্যা চালানো হলো, তা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সব মুখোশ খুলে দিয়েছে। বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি একটি অবরুদ্ধ জাতিকে অনাহারে রেখে বোমা মারার জন্য অস্ত্র ও রাজনৈতিক সুরক্ষা জুগিয়ে যাচ্ছে—বিশ্বের সচেতন তরুণ প্রজন্ম এই দ্বিচারিতা আর মেনে নিচ্ছে না।
নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পর আজ বিশ্বব্যবস্থার হিসাবটা কী দাঁড়াল? ৯/১১ হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সিকি শতাব্দী ধরে এমন এক যুদ্ধ চালাল যা একের পর এক অঞ্চলকে ধ্বংস করেছে, নিজ দেশের সাংবিধানিক নিরাপত্তাকে পদদলিত করেছে এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও সুনাম নষ্ট করেছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, এই যুদ্ধগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে ৯ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন, পরোক্ষভাবে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ।
এই ২৫ বছরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোনো একক সাম্রাজ্যের দাপট চিরস্থায়ী নয়। প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক, নির্যাতিত মানুষ কখনো তার ন্যায়ের দাবি ছেড়ে দেয় না। আজকের বিশ্ব আর ২০০১ সালের বিশ্ব এক নয়। আমেরিকার সামরিক শক্তি এখনো অনেক বড়, কিন্তু তার একক পরাশক্তির দিন শেষ হয়ে আসছে। গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো আজ ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া একতরফা বিশ্বব্যবস্থাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে—যেখানে কেবল একটি শক্তিই ঠিক করত কোন দেশে হামলা চালানো বৈধ, কাদের প্রতিরোধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আর কাদের জীবনের আদৌ কোনো মূল্য আছে।
২৫ বছর আগে ভয়ের সংস্কৃতি যুক্তরাষ্ট্রকে অন্ধ করে দিয়েছিল। এখন সময় এসেছে শুধু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কী ঘটেছিল তা স্মরণ করার নয়, বরং সেই ঘটনার নাম দিয়ে গত ২৫ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে কী নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তার বস্তুনিষ্ঠ বিচার-বিশ্লেষণ করার। অতীতের কেবল শোকগাথা রচনা করে কোনো লাভ নেই; ইতিহাস থেকে মানুষ তখনই শিক্ষা নেয়, যখন সমাজ সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে সরাসরি অস্বীকার করে।

