logo
Advertisement

মিডল ইস্ট আইয়ের কলাম/তুরস্কের জন্য মক্কা চুক্তিতে নতুন সুযোগের পাশাপাশি থাকছে ঝুঁকিও

তুরস্কের জন্য মক্কা চুক্তিতে নতুন সুযোগের পাশাপাশি থাকছে ঝুঁকিও
মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান (বাম থেকে), সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: আনাদোলু

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি একটি বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে। ‘মক্কা চুক্তি’ নামের এই নতুন উদ্যোগ আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো অঞ্চলে যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এই অঞ্চলের দেশগুলোর হাতেই ফিরিয়ে দেওয়া।

Advertisement

মক্কা চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, তিন সদস্যরাষ্ট্রের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এই শর্তের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে চুক্তিটিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ‘ন্যাটো’র সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জোটটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। মাঠপর্যায়ে এটি কতটা কার্যকর হবে, রাজনৈতিক বিশ্বাস কতটুকু বজায় থাকবে এবং তিন দেশের সামরিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য কীভাবে ভাগাভাগি করা হবে—তা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

তুরস্কের জন্য এই চুক্তির সময়কাল এবং অংশীদারদের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য যখন কমছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা যখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে, ঠিক তখনই আঙ্কারা এমন একটি আঞ্চলিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলল। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান তুর্কি গণমাধ্যমকে জানান, এই চুক্তি নিয়ে বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরে তিন দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি তুরস্ককে সরাসরি সামরিক নিরাপত্তার চেয়ে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা দেবে। এটি রিয়াদের সঙ্গে আঙ্কারার নিরাপত্তা সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। তবে এর বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে। তুরস্ক নিজের অজান্তেই এমন কোনো সংকটে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তার নিজস্ব সমস্যা নয়। এ ছাড়া ন্যাটো সদস্য হিসেবে নিজস্ব দায়বদ্ধতার সঙ্গেও এই নতুন চুক্তি সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক ড. ইয়াসির আতান মনে করেন, অঞ্চলে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগেই এই চুক্তি আলোর মুখ দেখেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে তুরস্ক সৌদি আরবকে তার প্রধান সহযোগী হিসেবে বেছে নিয়েছে। তবে এই অংশীদারত্ব ওয়াশিংটনের সঙ্গে আঙ্কারার দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে।

আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ড. বেতুল দোগান-আক্কাস বলেন, এই জোটের দেশগুলো মার্কিন নীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল-ঘেঁষা নীতিই এই দেশগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চুক্তিতে কোনো ‘সাধারণ শত্রু’র বদলে ‘সাধারণ হুমকি’র কথা বলা হয়েছে। ফলে এটি কোনো আক্রমণাত্মক জোট নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ।

তবে এই চুক্তির সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আরদা মেভলুতোগলু। তিনি জানান, তিন দেশের সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। তুরস্কের সামরিক অবকাঠামো ন্যাটো মানের। সৌদি আরব পশ্চিমা ও মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। আর পাকিস্তান চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মিশ্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ফলে এই তিন দেশের সামরিক প্রযুক্তির সমন্বয় করা বেশ কঠিন হবে। সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে যুদ্ধবিমান তৈরি করতে তাদের অন্তত এক দশক সময় লাগবে।

মক্কা চুক্তি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা হয়ে থাকবে নাকি কার্যকর কোনো প্রতিরক্ষামূলক রূপ নেবে, তা কেবল প্রথম কোনো বড় সংকটের সময়ই প্রমাণ হবে।


লেখক পরিচিতি: ফাতমা মেনাল আকিন একজন মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্কবিষয়ক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও বিশ্লেষক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আঙ্কারার ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত লিখছেন।