শিশুর পাঠাভ্যাসে খাদ্যনিরাপত্তার শিক্ষা: প্রাথমিক শিক্ষায় কৃষি ও তথ্যকেন্দ্রের অংশীদারত্ব

একটি শিশুর জ্ঞান, চিন্তাভাবনা, আদর্শ ও অভ্যাস গঠনের মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। এ সময় শিশুরা যা পড়ে, দেখে এবং অনুশীলন করে সেটাই তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করে থাকে। সেজন্য কৃষি ও খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর জায়গাগুলোর একটি। একটি শিশুর হাতে যখন কৃষিবিষয়ক বই তুলে দেওয়া হয়, তখন শুধু তার জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হয় না বরং তৈরি হয় প্রকৃতি, খাদ্য, মাটি, পানি ও কৃষকের সঙ্গে তার একটি সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, লাইব্রেরি এবং ব্যবহারিক কৃষিশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে একটি শিশুকে ভবিষ্যতের একজন সচেতন ভোক্তা, কৃষি-উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা এবং খাদ্যনিরাপত্তার দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টির চাহিদা পূরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্পর্কে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। আর এই জ্ঞানকে শিশুদের কাছে সহজে পঠনযোগ্য করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি একটি সক্রিয় লাইব্রেরি, লাইব্রেরিতে বাচ্চাদের উপযোগী কৃষিবিষয়ক বই, একজন দক্ষ শিক্ষক এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের একপাশে ছোট একটি সবজি বাগান থাকে তাহলেই এই চারটি উপাদান মিলে কৃষি শিক্ষার একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বিভিন্ন দেশে অনেক বছর ধরেই স্কুলভিত্তিক বাগান ও কৃষিশিক্ষাকে শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এফএও-এর মতে, “স্কুল বাগানকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের জায়গা হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত একটি শেখার প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিশুরা কৃষি, পুষ্টি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং জীবনদক্ষতা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে”।
আইএফএলএ-ইউনিসেফের ২০২৫ সালের স্কুল লাইব্রেরি মেনিফেস্টোতে স্কুল লাইব্রেরিকে মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সহজ ভাষায় লেখা কৃষিবিষয়ক শিশুতোষ বই, ছবির মাধ্যমে কৃষিশিক্ষা বই, কৃষি-ভিত্তিক ছোটদের গল্পের বই, স্থানীয় ফল ও সবজির পরিচিতি বই, পুষ্টি ও খাদ্যবিষয়ক বই, পরিবেশ ও কৃষি প্রযুক্তির বই রাখতে পারি যাতে করে শিশুরা খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হয়, কোন খাদ্য পুষ্টিকর এবং খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক কী এসব বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি তিন শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন শিশু খাদ্য-দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে এবং প্রায় ১০ মিলিয়ন শিশুর খাদ্যবৈচিত্র্যের ঘাটতি রয়েছে।”। সুতরাং শিশু পাঠ থেকেই শিশুদের নিরাপদ খাদ্য ও কৃষি সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয় লাইব্রেরি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ শিশু । তবে শিশু অপুষ্টি এখনও বড় সমস্যা। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বতা ও অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক। এ বাস্তবতায় শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতকল্পে টেকসই কৃষি উন্নয়নের জ্ঞান থাকা প্রতিটি নাগরিকের দ্বায়িত্ব। প্রাথমিক শিক্ষায় কৃষিকে কার্যকর করতে হলে শিশুদের কৃষি বিষয়ক বই পড়ানোর অভ্যাসের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, কৃষি গবেষক, পুষ্টিবিদ এবং লাইব্রেরিয়ানদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। মাসে একদিন ‘কৃষি জ্ঞান বিতরণ দিবস’ আয়োজন করা যেতে পারে। স্থানীয় একজন কৃষক এসে শিশুদের বলতে পারেন কীভাবে তিনি ধান বা সবজি চাষ করেন। কৃষি কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করতে পারেন নিরাপদ খাদ্য বা জলবায়ু-সহনশীল কৃষি কী। একজন লাইব্রেরিয়ান কৃষিবিষয়ক বই প্রদর্শন করতে পারেন। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে পারে। এতে শিশুরা বুঝতে পারবে, কৃষি শুধু বইয়ের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, “২০২৪ সালে জলবায়ুজনিত বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে কোনো কোনো অঞ্চলের শিশুরা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত নিয়মিত শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে”। এ বাস্তবতায় প্রাথমিক পর্যায়ে জলবায়ু ও কৃষির সম্পর্ক বোঝানো আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হবে-বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কেন দরকার, মাটি ক্ষয় কীভাবে হয়, গাছ কেন গুরুত্বপূর্ণ, লবণাক্ততা কৃষিতে কী প্রভাব ফেলে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষিকে কীভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি অর্জন করলেও মৌলিক শিখন নিয়ে এখনও চ্যালেঞ্জ লক্ষ্য করা যায়। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের এমআইসিএসের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে। একই জরিপের আর্লি-গ্রেড লার্নিং ফলাফলে বয়স অনুযায়ী দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণির স্তরে থাকা শিশুদের মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশ মৌলিক পাঠদক্ষতার সবগুলো মানদণ্ড পূরণ করেছে এবং মাত্র ১৮ শতাংশ মৌলিক গণনা দক্ষতার সবগুলো মানদণ্ড পূরণ করেছে। এই বাস্তবতায় কৃষিশিক্ষা চালু করতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুয়ায়ী যাতে বাংলা,ইংরেজি ও গণিত শেখার মূল লক্ষ্য দুর্বল না হয় বরং কৃষি ও স্কুল লাইব্রেরিকে ব্যবহার করতে হবে প্রয়োগিক জ্ঞান হিসাবে যাতে করে শিশুরা আনন্দের সাথে উক্ত জ্ঞানকে উপভোগ করতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারে।
কৃষিশিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হলো প্রাণিজ আমিষ। শিশুদের শরীরে পুষ্টির চাহিদা পূরণে আমিষ বা প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মাছ, ডিম, দুধ ও মাংসের মতো প্রাণিজ খাদ্য উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্যভেদে আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি১২ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে যা শিশুদের শরীরের কোষ ও টিস্যু গঠন, পেশির বিকাশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা গড়ে ওঠে মূলত পরিবারের রান্নাঘর থেকে কিন্তু অনেক পরিবার এখনো নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ খাদ্য সম্পর্কে সচেতন না। এক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো অভিভাবক সম্মেলনের আয়োজন করে পরিবারগুলোকে শেখাতে পারে কীভাবে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপাদান দিয়ে বয়সোপযোগী সুষম খাবার তৈরি করা যায়। প্রয়োজনে স্কুল লাইব্রেরিতে ছোটদের জন্য প্রাণিজ আমিষ বিষয়ক ছবির বই রাখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে কৃষি, পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক বই অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিশুদের সুস্বাস্থ্য, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং কৃষি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বই মূলত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণয়ন ও উন্নয়নের কাজ করে থাকে। উক্ত প্রতিষ্ঠান চাইলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে কৃষি, পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক বই অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (ব্র্যাক), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান, তথ্য ও বিশেষজ্ঞ মতামতের মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগে শিশুদের উপযোগী গল্প, ছবি, ও শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরি করে ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, শাকসবজি, ফলমূলের পুষ্টিগুণ, প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ আমিষের গুরুত্ব, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে শিশুদের ধারণা দিতে পারে। এছাড়া বিদ্যালয় গ্রন্থাগারগুলোর মাধ্যমে কৃষি ও পুষ্টিবিষয়ক শিশুতোষ বই এবং সম্পূরক পাঠসামগ্রী সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর ফলে শিশুদের মধ্যে কৃষি ও পুষ্টিবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতে সুস্থ, বিজ্ঞানমনস্ক ও কৃষিবান্ধব প্রজন্ম গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।
মো. আশরাফুল আলম বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি তথ্য কেন্দ্রের লাইব্রেরি এন্ড রিপ্রোগ্রাফিক শাখায় ক্যাটালগার হিসেবে কর্মরত আছেন।
মোছা. তাহেরা আক্তার নলডাঙ্গা ২ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
