জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশে বজ্রপাতের আঞ্চলিক ও ঋতুভিত্তিক তীব্রতা

সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাত অন্যতম একটি আলোচিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সরকার প্রাণহানি ও ক্ষতির ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে বজ্রপাতকে ২০১৬ সালে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও বজ্রপাতে প্রাণহানিসহ নানা প্রকার আর্থিক ক্ষতির ঘটনা ঘটছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ থেকে এই এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ বছরে বজ্রপাতে দেশে মোট ৪ হাজার ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ২০১৬ ও ২০২১ সালে যথাক্রমে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩৯১ ও ৩৬৩। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে ৬০ জনের মতো মারা গেছেন, তার মধ্যে ২৬ এপ্রিল সারা দেশে এক দিনেই অন্তত ১৫ জন মারা গেছেন।
সাধারণত একটি শীতল বায়ুপুঞ্জ যখন একটি উষ্ণ বায়ুপুঞ্জের মুখোমুখি হয় তখন পারস্পরিক আকর্ষণে যে চার্জ বিনিময় হয় ও বিদ্যুৎ চমকায়, আমরা তাকে বজ্রপাত বলে থাকি। বজ্রপাত হচ্ছে বিশালাকার বৈদ্যুতিক বিচ্ছুরণ যা মেঘ থেকে মেঘে অথবা মেঘ থেকে ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে। বজ্রপাতে গড় চার্জের পরিমাণ ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন ভোল্ট এবং এর মধ্যে রয়েছে প্রতি ঘণ্টায় ২২০ মাইল গতিসম্পন্ন ৩০ কিলো এম্পেয়ারসের কারেন্ট। প্রাকৃতিকভাবে বিপরীত বিদ্যুৎ শক্তিসম্পন্ন দুটি মেঘ কাছাকাছি এলে পারস্পারিক আকর্ষণে চার্জ বিনিময়ের ফলে বিদ্যুৎ চমকায় বা বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। যার স্থায়িত্ব হয় এক সেকেন্ডের ১০ ভাগের এক ভাগ এবং তাপমাত্রা থাকে ৩০●-৬০০০০● ফারেনহাইট। আবহাওয়া সম্পৃক্ত অন্যতম ঘাতক বজ্রপাত দেশের মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়াসহ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বজ্রপাতের প্রাথমিক কারণ হচ্ছে দীর্ঘ শুষ্ক সময় শেষে আর্দ্রতাপূর্ণ বায়ু। বজ্রপাত সংঘটিত হওয়ার পেছনে যেসব নিয়ামক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ভূপৃষ্ঠের উচ্চতা, অক্ষাংশ, বায়ুপ্রবাহে ধরন, বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং শীতল ও উষ্ণ বায়ুপুঞ্জের নৈকট্য; এই সবগুলো নিয়ামক তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পৃথিবীতে মানব বসতির জন্য সঠিকমাত্রার অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বজ্রপাতও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানব সৃষ্ট কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো নানা উপাদনগত পরির্বতন যখন জলবায়ুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে বিশৃঙ্খল করে তোলে তখন তার প্রভাবে বজ্রপাতের ঘটন সংখ্যা ও ঋণাত্মক চার্জের বৃদ্ধি ঘটে।
যার ফলে বজ্রপাতে প্রাণহানিসহ নানা প্রকার অর্থনৈতিক ক্ষতি সংঘঠিত হয়। বজ্রপাত নতুন কোনো ঘটনা নয়, পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে বজ্রপাত ও বজ্রঝড় ছিল। পেলিওলাইটিনিং বা বজ্রবিদ্যার বিভিন্ন রকম গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু প্রাথমিকভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল গঠনই নয় পৃথিবীতে প্রাণের সূচনাতেও বজ্রপাতের ভূমিকা রয়েছে। বজ্রপাত একটি অজৈবিক প্রক্রিয়া হওয়া সত্ত্বেও অক্সিডেশন এবং অজৈব পদার্থ দূরীকরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে নানা প্রকার জৈবিক বস্তু উৎপাদনে সহায়ক হয়েছে। বজ্রপাত হতে নির্গত চার্জ মাটিতে ও বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এবং চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরিতে বজ্রবিদ্যুৎ বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
পৃথিবীতে বজ্রপাতের বিন্যাস সরাসরি পৃথিবীর জলবায়ুর সঙ্গে সম্পৃক্ত যা মূলত সূর্যরশ্মি দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শোষণের কয়েক ঘণ্টা পরে বজ্রপাতের আধিক্য দেখা যায় এবং ঋতুগত দিক দিয়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মাস শেষ হওয়ার পরে বজ্রপাতের তীব্রতা দেখা যায়। অঞ্চলভিত্তিক তুলনায় উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত সংঘটিত হয়ে থাকে। মানুষের নানা প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন-মনোঅক্সাইড, মিথেন ও সিএফসির মতো নানা প্রকার গ্যাস নির্গমন পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ জলবায়ুর ভারসাম্য অবস্থা নষ্ট করছে। এই ভারসাম্যহীনতা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের ধরন, উৎপন্ন বৈদ্যুতিক চার্জ এবং ঘটন সংখ্যাকে চরমভাবে প্রভাবিত করছে। বজ্রঝড়ের সময় বজ্রপাত বায়ুমণ্ডলীয় পরিচালন প্রক্রিয়ার ফল মাত্র, যা মূলত ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রার বায়ুপুঞ্জের মুখোমুখি সংর্ঘষ অথবা মিশ্রনের ফলে যে অস্থিতিশীল অবস্থার তেরি হয় তা থেকে উৎপন্ন হয়। আর এই অস্থিতিশীলতা যথেচ্ছভাবে ঘটে না বরং জলবায়ু সংশ্লিষ্ট একটি সুসংগঠিত প্যাটার্নে হয়ে থাকে; যার মূল চালিকাশক্তি হলো সূর্য রশ্মি দ্বারা পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও তার হার। আমরা বিশ্ব উষ্ণায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরির্বতন করছি, ফলে পরিচালন প্রক্রিয়া, অঞ্চল (উলম্ব ও আনুভূমিক) এবং প্রবলতা প্রভাবিত হচ্ছে ফলে পৃথিবীব্যাপী বজ্রপাতের ধরনেও পরির্বতন ঘটছে।
আবহাওয়ার সাধারণ সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় স্থলভাগ সমুদ্রের তুলনায় দ্রুত উত্তপ্ত হওয়ার কারণে মহাদেশীয় ও সমুদ্র বায়ুপুঞ্জের মধ্যে তাপমাত্রাগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আবার অক্ষাংশ ও ভূভাগের উচ্চতা গত পার্থক্যের কারণে মহাদেশীয় বায়ুপুঞ্জের মধ্যে তাপমাত্রাগত পার্থক্য তৈরি হয়। যেহেতু বর্তমানে তাপমাত্রা বেশি ও তাপমাত্রাগত পার্থক্যও বেশি ফলে প্রাচীন প্রক্রিয়া বেশি অস্থিতিশীল হয়ে পরেছে এবং বজ্রপাত থেকে তুলনামূলক বেশি চার্জ নির্গত হয়। ফলে পৃথিবীব্যাপী মৃত্যু ও আর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৪ সালে আবহাওয়া বিজ্ঞানী উইলিয়ামস বজ্রপাতের সাটেলাইট ইমেজ পরীক্ষা করে দেখান, দিনের বেলায় সমুদ্রের তুলনায় ভূভাগ দ্রুত উত্তপ্ত হওয়ার ফলে সেখানকার বায়ুমণ্ডলীয় পরিচালন অতিমাত্রায় অস্থিতিশীল এবং তা বেশি সংখ্যক শক্তিসম্পন্ন বজ্রপাতের সৃষ্টি করে। বিশ্বে প্রতিদিন ৮৬ লাখ বজ্রপাত সংঘটিত হয়, যার ফলে প্রতিবছর সারা বিশ্বে বজ্রপাতের কারণে প্রায় দুই থেকে ২৪ হাজার মানুষ মারা যায় এবং আড়াই লাখ মানুষ আহত হয়।
বাংলাদেশ ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত ফলে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে কিরণ দেয়। যার ফলে এ অঞ্চলের বায়ু অতিদ্রুত উষ্ণ হয়ে ওপরে উঠে যায় এবং বায়ুতে আপেক্ষিক আদ্রতা বেশি থাকে। ফলে দ্রুত ঘনীভূতের ফলে মেঘের সৃষ্টি হয় এবং অধিকাংশ সময় যখন কিউমুলনিম্বাস (গভীর ও উলম্ব আকারের) মেঘ তৈরি হয়, তখন বজ্রঝড় শুরু হয় এবং বজ্রপাত সংঘঠিত হয়। তাই গভীর ও উলম্ব আকারের মেঘের উপস্থিতিকে বজ্রপাতের পূর্বাভাস বলে ধরে নেওয়া হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলের অধিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুর অভিসরণ ও পুবালি বায়ু বাংলাদেশ মতো অঞ্চলকে বজ্রঝড় সৃষ্টির উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে সামুদ্রিক ঝড় ও সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো নানা প্রকার দুর্যোগের কথা আলোচনা করে থাকলেও তার মধ্যে বজ্রপাত কম গুরুত্ব পায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রান্তীয় অবস্থান (২০●৩৪’ উত্তর থেকে -২৬●৩৮’ উত্তর) এবং জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যগত প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতই সবচেয়ে বেশি পরিবর্তিত হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে প্রভাবিত করবে।
বঙ্গোপসাগর থেকে আগত উষ্ণ বায়ুপুঞ্জের প্রবাহ যখন হিমালয় থেকে নেমে আসা শীতল বায়ুপুঞ্জের মুখোমুখি হয় তখন উষ্ণ বায়ুপুঞ্জ ক্রমে ওপরে উঠে যায় এবং তখন আর্দ্রতাপূর্ণ ও প্লাবনশীল হওয়ার ফলে ঝোড়োপুঞ্জ মেঘের ও বায়ু প্রাচীরজনিত বজ্রঝড় সৃষ্টি হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শোষনের পরে বজ্রপাতের আধিক্য দেখা যায়। ফলে ঋতুগত দিক দিয়ে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে এপ্রিল মাস শেষ হওয়ার পরে মে মাস থেকে বজ্রপাতের তীব্রতা শুরু হয় এবং মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও বজ্রঝড় সংঘটিত হয় ও বজ্রপাতের ফলে প্রাণহানি ঘটে। এ ছাড়া গবাদিপশুসহ, ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। বাংলাদেশ একটি ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশ ফলে এখানে বজ্রপাতের তীব্রতা অনেক বেশি, তবে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঞ্চল ও ঋতুভেদে এর ভিন্নতা রয়েছে।

বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঋতুভিত্তক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বজ্রপাত সংগঠিত হয় যা মধ্যে মে এবং জুন এই দুই মাসে সর্বোচ্চসংখ্যক বজ্রপাত হয়ে থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বজ্রপাতে সারা দেশে মোট মৃতের সংখ্যা ৩৬৩ জন; যার মধ্যে এই দুই মাসে মৃতের সংখ্যা ২০৮ জন। (কলাম চার্ট-১) গত ১৬ বছরের মাসিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ৩২ শতাংশ বজ্রপাত হয়ে থাকে মে মাসে। এরপর ২৬.৯৫ শতাংশ বজ্রপাত হয়ে থাকে জুন মাসে ও ২৩.৫ শতাংশ হয় জুলাই ও আগস্টে মৌসুমি বায়ু প্রবাহকালীন সময়ে। বাকি ৬.৭ শতাংশ হয় অন্যান্য মাসগুলোতে (তথ্য সূত্র চ্যানেল-৯ এর প্রতিবেদন)।
বাংলাদেশে বজ্রপাতকে আঞ্চলিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ সালে বিভাগসমূহের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে মৃতের সংখ্যা ১১১ জন ও ঢাকা বিভাগে মৃতের সংখ্যা ৬৩ জন। অন্যান্য বিভাগসমূহে মৃতের সংখ্যা আনুপাতিক হারে একই রকম (কলাম চার্ট-২)। বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় দেখা যায়, মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে গ্রামীণ পরিবেশের মানুষ এবং যারা খোলা যায়গায় খেলাধুলা বা মাঠে খালি পায়ে কর্মরত অবস্থায় বজ্রপাতের স্বীকার হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে উক্ত অঞ্চলে বড় কোনো গাছপালা না থাকায় বজ্রপাত সরাসরি মানুষ অথবা গবাদি পশুকে পরিবাহক হিসেবে বেছে নিয়েছে। যেমন রাজশাহী বিভাগে দেখা য়ায়, বড় গাছপালা কম থাকায় ও বিস্তীর্ণ অঞ্চল ফসলি জমি হওয়ায় খোলা মাঠে কর্মরত অবস্থায় বজ্রপাতের স্বীকার হয়ে মৃত্যু সংখ্যা বেশি।

দেশের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলসমূহ বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা এবং এসব এলাকায় বজ্রপাতজনিত ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে বজ্রপাতের কারণে ১৫০ থেকে ৩০০ জন মানুষ মারা যায়। তবে ২০১৬ সালের মে মাসে হঠাৎ করে বজ্রপাতে মাত্র চার দিনে ৮১ জন মারা যায়, যা ছিল আমাদের দেশের জন্য একটি সতর্কবাণী।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে এই এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ বছরে বজ্রপাতে দেশে মোট ৪ হাজার ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ২০১৬ ও ২০২১ সালে মৃতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩৯১ ও ৩৬৩ জন (কলাম চার্ট-৩)। বাংলাদেশে মাঠে কর্মরত কৃষক, খোলা আকাশের নিচে খেলারত শিশু, সমুদ্র, নদী, লেকসহ অন্যান্য জলাশয়ে মাছ ধরতে থাকা মৎস্যজীবী, রিকশা-ভ্যানচালকসহ শ্রমজীবী মানুষেরা সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঝুঁকিতে থাকেন।

বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিং ১৭৫২ সালে তার বিখ্যাত এক্সপেরিমেন্ট ‘কাইট ফ্লাইং’-এর মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, বজ্রপাত বিদ্যুতের প্রবাহমাত্র যা ইলেকট্রনের ধারক ও বাহক। পরবর্তীতে তিনি বজ্রপাতের হাতে থেকে রক্ষার জন্য ‘লাইটিনিং রড’ নামে একটি ধারণা প্রবর্তন করেন যা এখনও পৃথিবীতে বহুল প্রচলিত। বজ্রপাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য খোলামাঠে, রাস্তা, খাল, নদীর পাশে তাল-খেজুরের পাশাপাশি কদমের মতো দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষরোপণসহ আমরা যেসব সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি সেগুলো হলো :
>> দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্তৃক সমন্বিতভাবে বজ্রপাতের ১৫-২০ মিনিট পূর্বে মোবাইলের মাধ্যমে আর্লি ওয়ার্নিং মেসেজ জনগণের কাছে পৌছানোর ব্যবস্থা করা, যাতে তারা নিরাপদ স্থানে যেতে পারে।
>> বজ্রপাতের আশঙ্কা হলে শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা। যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া। বজ্রঝড় সাধারণত ৩০-৪৫ মিনিট স্থায়ী হয়। এ সময়টুকু ঘরে অবস্থান করা। অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে যাওয়া।
>> বজ্রপাতের সময় ধান ক্ষেত বা খোলা মাঠে থাকলে একত্রে না থেকে তাড়াতাড়ি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ও কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়া।
>> বজ্রপাতের সময় উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার, ধাতব খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা এবং বিল্ডিংয়ের ছাদে, খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু ভূমিতে না যাওয়া।
>> বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজসহ সব ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ বা সুইচ বন্ধ রাখা।
>> বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে বা পূর্বাভাস থাকলে নদী, পুকুর, ডোবা বা জলাশয় থেকে দূরে থাকা এবং ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে না যাওয়া, সমুদ্র বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করা।
>> বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতর অবস্থান করলে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ না রাখা।
>> বজ্রপাতের নিরাপত্তাবিষয়ক কার্যক্রমসমূহ জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের আরও বেশিমাত্রায় প্রাথমিক সেবা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
>> বজ্রপাত প্রতিরোধকারী বজ্রনিরোধক দণ্ড প্রতিটি বিল্ডিং এ লাগানোর বিষয়টি বিল্ডিং কোডে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
লেখক: শেখ মো. শিপন আলী, যুব পরিবেশবিদ সমিতি বাংলাদেশের (ইয়েসবিডি) সভাপতি।


