Advertisement

আলজাজিরার কলাম/ইসরায়েলের ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা ভেতর থেকে রাষ্ট্রকে বদলে দিচ্ছে

ইসরায়েলের ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা ভেতর থেকে রাষ্ট্রকে বদলে দিচ্ছে
ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলে অতি-রক্ষণশীল ইহুদি ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। এর প্রভাব এখন আর শুধু তাদের নিজস্ব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং নারী-পুরুষের আলাদা চলাফেরা, ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্ব, ধর্মীয় ও বেসামরিক আইনের সম্পর্ক এবং বসতি স্থাপন ও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রশ্নেও তা দৃশ্যমান হচ্ছে।

Advertisement

এই পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তিগুলোকে যদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বা রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদ করতে না হয়, বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই রাষ্ট্রের কাঠামো ও নীতিকে ভেতর থেকে বদলে দেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে কী হতে পারে?

ধরা যাক, কয়েক বছর পরের তেলআবিব। শহরের ক্যাফেগুলো খোলা আছে, নারীরা রাস্তায় চলাফেরা করছেন, নির্বাচন হচ্ছে, পার্লামেন্ট অধিবেশন বসছে এবং সুপ্রিম কোর্টও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হয়নি, সরকারও উৎখাত হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই রাষ্ট্রের চরিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

নারী-পুরুষের আলাদা চলাচলের জন্য পৃথক স্থান আরও বাড়তে পারে, যা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান দেখানোর নামে বৈধতা পাবে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি সরকারি অর্থ পেতে পারে, অথচ বিজ্ঞান, গণিত বা ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয় পড়ানোর বাধ্যবাধকতা থেকে তারা অনেকটাই মুক্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মীয় দাবির গুরুত্ব বাড়তে পারে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমারেখা ক্রমেই ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নির্ধারিত হতে পারে।

ইসরায়েল কোনো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ধর্ম দেশতে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, ধর্মান্তর, সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও ইহুদি পরিচয়ের স্বীকৃতির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলে থাকা ফিলিস্তিনিরা কখনোই এসব বিষয়ে সমান অধিকার পাননি।

তবে এখন যে পরিবর্তনটি স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো রাষ্ট্রের ইহুদি চরিত্রকে আরও প্রকাশ্য ধর্মীয় অর্থে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি।

বর্তমান ইসরায়েলি পার্লামেন্টে বেশ কয়েকটি অতি-ধর্মীয় ও ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী দল রয়েছে। এর মধ্যে শাস, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, রিলিজিয়াস জায়োনিজম, ওতজমা ইয়েহুদিত ও নোয়াম উল্লেখযোগ্য। দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জোট সরকারে তাদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে ধর্মীয় দাবিগুলো রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

অতি-ধর্মীয় দলগুলো মূলত ধর্মীয় শিক্ষার স্বাধীনতা, সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে ছাড়, সরকারি বাজেট এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসনের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী ও কাহানপন্থী ডানপন্থীরা ধর্মকে জাতীয়তাবাদ, বসতি স্থাপন, যুদ্ধ এবং ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে একীভূত করে দেখছে।

ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করছে না; বরং বিদ্যমান জাতিগত-জাতীয়তাবাদী কাঠামোর সঙ্গে ধর্মীয় অধিকারের ধারণাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করছে।

ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের ওপর ইহুদি জাতীয় দাবির সঙ্গে যদি এই বিশ্বাস যুক্ত হয় যে ওই ভূমির ওপর ইহুদি নিয়ন্ত্রণ ঈশ্বরের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, তাহলে ফিলিস্তিনিদের শুধু জনসংখ্যাগত বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না। তারা ক্রমেই একটি ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী সার্বভৌমত্বের পথে বাধা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

ইসরায়েলের নেগেভ অঞ্চলে এর কিছু চিত্র ইতোমধ্যেই দেখা যায়। বেদুইন জনগোষ্ঠীর গ্রাম ও বাড়িঘর উচ্ছেদ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং আরব শহরগুলোর সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রভাব আরও স্পষ্ট। ইহুদি বসতি স্থাপন, বসতিস্থাপনকারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং ধর্মীয় মতাদর্শ ক্রমেই একে অপরকে শক্তিশালী করছে। নিরাপত্তার নামে দখলদারত্ব এবং ধর্মীয় মুক্তির ধারণায় বসতি স্থাপন—দুই প্রবণতা একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

এর ফলে ভূখণ্ড নিয়ে সমঝোতাও আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কোনো ভূমির নিয়ন্ত্রণকে যদি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সেই ভূমি থেকে সরে আসাকে আর শুধু রাজনৈতিক বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয় না; বরং তা পবিত্র অধিকার ত্যাগের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

ইসরায়েলি সমাজের অভ্যন্তরীণ জনজীবনেও ধর্মীয় শক্তির প্রভাব বাড়ছে। নারী-পুরুষের পৃথকীকরণ এর অন্যতম উদাহরণ। এর বিস্তারকে অনেক সময় ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হিসেবে না দেখে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সম্মান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নারী-পুরুষকে আলাদা রাখা হয়ে ওঠে ‘সাংস্কৃতিক সমন্বয়’, আর নারীদের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাকে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা রক্ষার উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়।

ফলে কোনো অনুষ্ঠানে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা জনপরিসরে নারীদের পেছনে বসানো কিংবা তাদের অংশগ্রহণ সীমিত করার বিষয়টি বদলে যায়। প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে রাষ্ট্র কতটা ছাড় দিতে পারে।

এ নিয়ে ইসরায়েলের আদালত ও সমাজে এখনও তীব্র বিতর্ক রয়েছে। নারী-পুরুষের পৃথকীকরণ দেশটির সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়নি। তবে এসব দাবি যে এখন পার্লামেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতেই ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সম্প্রতি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট উচ্চশিক্ষায় নারী-পুরুষের পৃথকভাবে পড়াশোনার সুযোগ বাড়িয়ে উন্নততর ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত নেওয়ার আইন পাস করে। এতে বোঝা যায়, একসময় প্রান্তিক বলে বিবেচিত ধর্মীয় দাবিগুলো এখন মূলধারার প্রতিষ্ঠানেও প্রবেশ করছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন এবং রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ইসরায়েল সরকারের বড় একটি অংশ অতি-ধর্মীয় শিক্ষা খাতকে অর্থায়ন করে। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মৌলিক বিষয় পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী সন্তানদের শিক্ষিত করার স্বাধীনতা পাবে কি না—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, সরকারি অর্থ নেওয়ার বিনিময়ে রাষ্ট্র এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে কতটা সাধারণ শিক্ষাক্রম অনুসরণের দাবি করতে পারে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যেও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের প্রভাব বাড়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্র ও সামরিক নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মীয় জায়োনিস্টদের উপস্থিতি বেড়েছে। সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করতে ধর্মীয় ভাষার ব্যবহার এবং বসতি সরিয়ে নেওয়া বা কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামরিক নির্দেশ ও ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্বের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সৈনিক তার কমান্ডারের বদলে কোনো ধর্মীয় নেতার নির্দেশ মানবেন কি না—তা নয়। বরং সামরিক ক্ষমতা, ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং এমন একটি ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক, যেখানে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণকে শুধু রাজনৈতিক বা কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয় না।

যুদ্ধকে যদি ধর্মীয় মুক্তির পথে একটি ধাপ কিংবা ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সমঝোতা দুর্বলতা, প্রত্যাহার পাপ এবং রাজনৈতিক সমাধানকে পবিত্র কিছু ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা সহজ হয়ে যায়।

ধর্মীয় দলগুলোর উপস্থিতি বা প্রভাব বাড়লেই ইসরায়েলকে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যায় না। দেশটিতে এখনও আদালত, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং বড় একটি ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠী রয়েছে। ধর্মীয় দাবির বিরুদ্ধে আদালত ও সমাজের বিভিন্ন অংশে প্রতিরোধও রয়েছে।

তবে গণতন্ত্র সব সময় একদিনে ভেঙে পড়ে না। কখনো কখনো নির্বাচন চলতে থাকে, আদালত খোলা থাকে এবং পার্লামেন্ট অধিবেশন বসে—কিন্তু এর মধ্যেই রাষ্ট্রের নিয়ম ও নাগরিক জীবনের ধারণা ধীরে ধীরে বদলে যায়। ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির জন্য নির্বাচন বাতিল করা বা আদালত বন্ধ করা অপরিহার্য নয়। বিদ্যমান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব।

তেলআবিবের ক্যাফেগুলো খোলা থাকতে পারে, নির্বাচনও হতে পারে, শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী জনগোষ্ঠীও টিকে থাকতে পারে। তারপরও নাগরিকত্ব, সমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অর্থ বদলে যেতে পারে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ওপর বিদ্যমান বৈষম্য ও নিপীড়ন আরও শক্ত হতে পারে, যদি ভূমি ও সার্বভৌমত্বের ওপর ধর্মীয় দাবিগুলো আরও বেশি রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে।

তাই মূল প্রশ্ন শুধু ইসরায়েলে নির্বাচন, আদালত বা পার্লামেন্ট থাকবে কি না—তা নয়। বরং এসব প্রতিষ্ঠান কেমন রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেই রাষ্ট্র কার শর্তে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।


লেখক: ইসরায়েলের অধিবাসী একজন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক।