
আফ্রিকান নেতারা যখন মস্কোতে সমবেত হচ্ছেন, তখন ক্রেমলিন তার নিজের স্বার্থ নিশ্চিত করছে। কিন্তু সাধারণ আফ্রিকানদের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। মস্কো তৃতীয় রাশিয়া-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মহাদেশজুড়ে রাশিয়ার অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চান। তবে রাশিয়ার এই প্রভাব সাধারণ মানুষের সমৃদ্ধি দেওয়ার চেয়ে মস্কোর নিজস্ব স্বার্থ ও মিত্র শাসকদের রক্ষা করতেই বেশি কাজ করেছে।
পুতিন বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট এভারিস্ট এনদাইশিমিয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রধান সেশনে সভাপতিত্ব করবেন। সম্মেলনের পাশাপাশি, দুই দিনব্যাপী ফোরামে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অর্থ প্রদান ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। আয়োজকরা ২০২৭-২০২৯ সালের পরিকল্পনার মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন, যাকে তারা ‘পারস্পরিক সুবিধাজনক সহযোগিতা’ বলছেন।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারোভা সম্মেলনে বেশকিছু আন্তঃসরকারি ও বাণিজ্যিক চুক্তির পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ২০১৯ সালের সোচি সম্মেলনে ৯২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং পুতিন বাণিজ্য দ্বিগুণ করে ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের সম্মেলনে আরও ১৬১টি চুক্তি ও কার্যপরিকল্পনা গৃহীত হয়।
তবে অর্থনৈতিক ফলাফল মস্কোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি। রাশিয়ার নিজস্ব বাণিজ্য পরিসংখ্যানই এই ব্যর্থতা প্রকাশ করেছে: পুতিনের ৪০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের বিপরীতে ২০২৫ সালে আফ্রিকার সাথে রাশিয়ার বাণিজ্য পৌঁছায় মাত্র ২৭.১ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৬ সালেও এই বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা বজায় ছিল। প্রথম আট মাসে রাশিয়া আফ্রিকায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করলেও আমদানি করেছে মাত্র ৩.২ বিলিয়ন ডলার।
কৃষি রপ্তানি মূলত এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির প্রধান কারণ। ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধেকে রাশিয়া আফ্রিকায় ১০.২ মিলিয়ন টন গম পাঠিয়েছে, যার মধ্যে মিশর ছিল সবচেয়ে বড় গ্রাহক। এই সরবরাহ খাদ্য নিরাপত্তা মেটায় ঠিকই, তবে তা আফ্রিকার শিল্প উন্নয়নের চেয়ে রাশিয়ার উৎপাদকদেরই বেশি উপকৃত করে।
রাশিয়ার বিনিয়োগের রেকর্ড চুক্তি ও বাস্তবায়ন প্রকল্পের মধ্যে ব্যবধান প্রকাশ করে। ২০১৯ সালের সম্মেলনে, সার প্রস্তুতকারক ইউরালকেম এবং অ্যাঙ্গোলার গ্রুপো ওপায়া ১.২ বিলিয়ন ডলারের ইউরিয়া কমপ্লেক্স তৈরির বিষয়ে সম্মত হয়েছিল, যা ২০২৩ সালে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ইউরালকেম তা বাতিল করে দেয়।
মিশর অবশ্য কিছুটা অগ্রগতির প্রমাণ দেয়: রোসাটম এল দাবাতে চারটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করছে, যেখানে ১৮,০০০ এরও বেশি মিশরীয় কাজ করছেন। কিন্তু এই প্রকল্পটি ২৫ বিলিয়ন ডলারের রুশ ঋণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা মিশরকে সুদের সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে।
এমনকি যখন রাশিয়া-সমর্থিত প্রকল্পগুলো এগিয়ে যায়, তখনও চুক্তির শর্তগুলোই বলে দেয় কে আর্থিক ঝুঁকি বহন করবে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে, একটি পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন যৌথ উদ্যোগের ৯০ শতাংশ মালিকানা রুশ সংস্থাকে এবং কঙ্গোর রাষ্ট্রীয় কোম্পানিকে ১০ শতাংশ দেবে। সাথে থাকবে ২৫ বছরের ইজারা ও নিশ্চিত পরিবহন শুল্ক। আলেকজান্ডার নোভাক জানান যে নকশার কাজ চলতি বছর শুরু হবে। এই পাইপলাইনকে ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞা থেকে রুশ রফতানি রক্ষা করার মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতিও বিস্তৃত হচ্ছে। সুইডেনের সংস্থা ৩৯টি আফ্রিকান দেশে অন্তত ৫৭টি রুশ সামরিক চুক্তি চিহ্নিত করেছে। কিছু চুক্তি প্রশিক্ষণ ও সামরিক অবকাঠামো ব্যবহারের সুবিধা দেয়। রাশিয়া শুরুতে ওয়াগনার গ্রুপের উপর নির্ভর করলেও পরবর্তীতে আফ্রিকা কোর-এর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে। রুশ কর্মীরা মিত্র সরকারগুলোকে, বিশেষ করে মালি ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে, সরাসরি যুদ্ধ সহায়তা ও সুরক্ষা দেয়।
তা সত্ত্বেও, মালি রাশিয়ার সামরিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। ওয়াগনার ও মালিয়ান সৈন্যরা ২০২৩ সালে কিডাল শহর দখল করেছিল, যা আবার ২০২৬ সালে বিদ্রোহীদের কাছে হারিয়ে ফেলে। পরে বিমান অভিযানের মাধ্যমে রাশিয়া-সমর্থিত বাহিনী শহরটি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নেয়। মস্কো মালিকে ভূখণ্ড জয়ে সাহায্য করেছে, কিন্তু স্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
গবেষণায় দেখা যায়, মালিয়ান বাহিনী ও আফ্রিকা কোর এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৪৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে, যাতে ৮৯ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। বোমবোরি গ্রামে আফ্রিকা কোর চার শিশুসহ নয়জনকে হত্যা করেছে ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে বেসামরিকদের মারধর, বৈদ্যউতিক শক ও ওয়াটারবোর্ডিং।
একই সঙ্গে, রাশিয়া মিত্র শাসকদের কাছে নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছে। নাইজারে রাশিয়ার আফ্রিকা কোর জেনারেল তিয়ানিকে বিদ্রোহ দমন করতে সাহায্য করে। তিয়ানির সরকার টিকে থাকলেও নাইজারবাসীরা রাজনৈতিক দল বা নির্বাচন ছাড়াই রয়েছে এবং নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে, মস্কো প্রেসিডেন্ট তোয়াদেরাকে ক্ষমতা শক্ত করতে সাহায্য করেছে। তোয়াদেরা স্বীকার করেছেন যে রুশ বাহিনী নির্বাচন সম্ভব করেছিল, যা তার তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করে। তোয়াদেরার সরকারকে সুরক্ষার জন্য মস্কো প্রতি মাসে প্রায় ১৪ মিলিয়ন ইউরো দাবি করেছে, অন্যদিকে রাশিয়া-সংযুক্ত কোম্পানিগুলো সোনা থেকে লাভবান হচ্ছে।
মস্কো বন্ধুভাবাপন্ন শাসকদের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করছে। আরটি মালি, নাইজার ও বুরকিনা ফাসোর নতুন চ্যানেল তাফাউক টিভির সাথে চুক্তি করেছে। এটি সামরিক সাফল্য প্রচার করে এবং বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পশ্চিম আফ্রিকান সংবাদমাধ্যমে শত শত রুশপন্থি নিবন্ধ প্রচারে অর্থ দেওয়া হয়েছে।
অ্যাঙ্গোলায় আদালত রাজনৈতিক প্রভাব ছড়ানোর দায়ে দুই রুশ নাগরিককে সাজা দিয়েছে। তারা জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদকে কাজে লাগিয়ে অসন্তোষ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
রাশিয়ার বিস্তৃত উপস্থিতি একটি অসম সম্পর্ককে শক্ত করছে, যেখানে মস্কো খনিজ সম্পদ পাচ্ছে এবং স্বৈরশাসকদের রক্ষা করছে। বিপরীতে, সাধারণ আফ্রিকানরা নিরাপত্তাহীনতা ও দমনের শিকার হচ্ছে। যৌথ সমৃদ্ধির বদলে ক্রেমলিন আফ্রিকার দুর্বলতাকে শোষণ করছে। আফ্রিকার উচিত রাশিয়ার কাছ থেকেও স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু বাণিজ্য ও জবাবদিহিতা দাবি করা।
লেখক পরিচিতি
তাফি ম্যাকা আলজাজিরার কলামিস্ট, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।





