ডেভিড বার্গম্যানের কলাম/হেফাজত হত্যাকাণ্ড কি আসলেই ‘গণহত্যা’ ছিল?

বাংলাদেশের সাধারণ ফৌজদারি আদালতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল কোনো আসামিকে আটক বা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের নির্দেশ দিলে তা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। এমনকি সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হলেও কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি হাইকোর্টে এর প্রতিকার চাইতে পারেন না।
এর ফলে রায় বা খালাস দেওয়ার আগ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের ওপর অন্য কোনো আদালতের তদারকি থাকে না। বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনাল এক চরম রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট পরিবেশের মধ্যে কাজ করছে। এখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের শাস্তি দেওয়াকে যেন একপ্রকার নিশ্চিত বিষয় হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ না থাকলেও এমনটি ঘটছে। ট্রাইব্যুনাল যাতে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে, সে জন্য সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের এর প্রতিটি সিদ্ধান্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
গত ২৭ জুলাই আইসিটি ৪১ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিয়েছে। এই ঘটনাটি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজত সমর্থকদের হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযুক্তদের মধ্যে ১৬ জন রাজনৈতিক নেতা, ২১ জন পুলিশ কর্মকর্তা, ২ জন রাজনৈতিক কর্মী এবং ২ জন সাংবাদিক রয়েছেন। আদালত এই মামলাটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। কারণ, এখানে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘গণহত্যা’র মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
আইসিটিতে কোনো অভিযোগ ‘আমলে নেওয়া’ হলো বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। ট্রাইব্যুনালের নিয়ম অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং জমা দেওয়া নথিপত্র পর্যালোচনা করে যদি প্রাথমিক সত্যতা (প্রাইমা ফেসি কেস) পাওয়া যায়, কেবল তখনই অভিযোগ আমলে নেওয়া যাবে। অর্থাৎ, এমন তথ্যপ্রমাণ থাকতে হবে যা দিয়ে একটি নিরপেক্ষ আদালত আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করতে পারে।
এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ট্রাইব্যুনালকে তথ্যপ্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রমাণের আইনি মানদণ্ডগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখতে হয়।
গণহত্যা
শুনানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সেটি হলো ৪১ জন আসামির সবার বিরুদ্ধে আনা ‘গণহত্যা’র অভিযোগ। মনে হচ্ছে, শেষ মুহূর্তে হাতে লিখে এই অভিযোগটি মূল চার্জশিটে যোগ করা হয়েছে।
গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য থাকতে হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে যে হেফাজত কর্মীদের হত্যা করার মাধ্যমে আসামিরা বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতগুলো সব সময় একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। তা হলো, গণহত্যার অভিযোগ কেবল তখনই খাটবে, যখন সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস করার উদ্দেশ্য থাকবে।
রাষ্ট্রপক্ষ যদি প্রমাণও করতে পারে যে সেখানে ৬১ জন হেফাজত কর্মী মারা গেছেন, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশের প্রায় ১৫ কোটি মুসলমানের মধ্যে এই সংখ্যাটি কীভাবে একটি ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাছে বিবেচিত হলো, তা স্পষ্ট নয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, গণহত্যার অপরাধ প্রমাণ করতে হলে রাষ্ট্রপক্ষকে দেখাতে হবে যে আসামিরা হেফাজত কর্মীদের ‘মুসলমান’ হওয়ার কারণেই হত্যা করেছিল। কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের সামনে নেই।
এই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সনদের ‘এলিমেন্টস অব ক্রাইমস’ নীতিমালার কথা বলা যায়। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীন বিচারকদের এই নীতিমালা অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা বলতে হলে তা একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান অপরাধমূলক আচরণের অংশ হতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেবল ‘মুসলমান’ হওয়ার কারণে মানুষকে হত্যার কোনো ‘দৃশ্যমান ধারাবাহিকতা’ ছিল কি না, তার কোনো প্রমাণ কি আছে?
চার্জশিটে গণহত্যার অভিযোগ যোগ করার আগে প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক আইন বা ‘এলিমেন্টস অব ক্রাইমস’ নীতিমালা বিবেচনা করেছিল কি না, তা পরিষ্কার নয়। অভিযোগ আমলে নেওয়ার শুনানিতেও এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক
৪১ জন আসামির মধ্যে দুই জন অ্যাক্টিভিস্ট ডা. ইমরান এইচ সরকার ও শাহরিয়ার কবির এবং দুই জন সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবু রয়েছেন। আদালত তাদের বিরুদ্ধে শুধু গণহত্যা নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও আমলে নিয়েছেন।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সঙ্গে ইমরান ও শাহরিয়ার কবিরের ভূমিকা জড়িয়ে এই অভিযোগ আনা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাকে ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর ওই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ইমরান এইচ সরকার তখন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ছিলেন।
চার্জশিটে অভিযোগ করা হয়েছে, এই দুজন বিভিন্ন সময়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং উসকানি দিতে নানা বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের এই উসকানির ফলেই নাকি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
তবে তাদের বক্তব্যগুলোতে যদি সরাসরি হেফাজত কর্মীদের হত্যার উসকানি না থেকে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক আইনে কেবল রাজনৈতিক সমালোচনার জন্য ‘উসকানি’র মামলা দেওয়ার কোনো নজির নেই।
উসকানি বা প্ররোচনা প্রমাণের একটি নির্দিষ্ট ও কঠিন মানদণ্ড রয়েছে। এর জন্য এমন কোনো বক্তব্য থাকতে হবে যা অপরাধীকে সরাসরি অপরাধ করতে প্ররোচিত করে। বিচারকদের উচিত ছিল অভিযোগ আমলে নেওয়ার আগে তাদের দেওয়া বক্তব্যগুলো খতিয়ে দেখা। সেই বক্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিভাষায় উসকানির মধ্যে পড়ে কি না, তা যাচাই করা দরকার ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে, তেমনটি করা হয়নি।
একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং প্রতিবেদক ফারজানা রূপার বিষয়টি একটু ভিন্ন। তদন্তের শুরুতে প্রধান কৌঁসুলি সংবাদ সম্মেলনে যে অভিযোগ করেছিলেন, চার্জশিটে তার পরিধি অনেকটাই সংকুচিত করা হয়েছে। এখন কেবল ঘটনার ছয় মাস পর প্রচারিত ‘সমীকরণ’ নামের একটি তথ্যচিত্রের ওপরই পুরো অভিযোগটি দাঁড়িয়ে আছে।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, ওই তথ্যচিত্রে হেফাজতের সমাবেশকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং হেফাজত কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার সরকারি চেষ্টাকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, তথ্যচিত্রটি প্রচারের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এক সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল বাবু দাবি করেছিলেন যে ৫ মে কোনো হেফাজত কর্মী মারা যাননি। চার্জশিটের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা সরকারকে হেফাজতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে এবং কঠোর ব্যবস্থা নিতে উসকানি দিয়েছিলেন।
তবে এই দাবিগুলো সত্য ধরে নিলেও প্রশ্ন থাকে। ছয় মাস আগের একটি ঘটনার জন্য কীভাবে ছয় মাস পরে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র উসকানি দিতে পারে? ট্রাইব্যুনাল কীভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা খুঁজে পেল, তা বোঝা সত্যিই কঠিন।
অভিযোগ গঠন
অবশ্য ট্রাইব্যুনালের সামনে এই ভুল সংশোধনের আরেকটি সুযোগ আসবে। আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে যখন তারা অভিযোগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন বিষয়টি আবার খতিয়ে দেখার সুযোগ থাকবে। অভিযোগ গঠনের জন্য বিচারকদের নিশ্চিত হতে হবে যে আসামিদের অপরাধের পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।
এই পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালকে আবার তথ্যপ্রমাণগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে এবার বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিগুলোও আমলে নিতে হবে। ট্রাইব্যুনাল এখন পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
[লেখাটি ডেইলি ওয়াদা থেকে অনূদিত।]
লেখক পরিচিতি: ডেভিড বার্গম্যান একজন প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আইন, বিচার ব্যবস্থা ও রাজনীতি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বর্তমানে লন্ডন ও ঢাকায় বসবাস করেন।
.png)


