ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে এখনই দাঁড়ানো দরকার

বোরো ধান কাটার মৌসুম এখন প্রায় শেষের পথে। তবে বিভিন্ন জনপদে দৃশ্যপট ভিন্ন। নড়াইল, চলন বিল, বরেন্দ্র ও রংপুরের কাউনিয়া এলাকায় ধান কাটায় কৃষকের অনাবিল আনন্দ। কৃষকের মুখে যেন বেহেশতি হাসি। দৈনিক পত্রিকাগুলোর পাতায় পাতায় এসবের ছবি। অন্যদিকে এপ্রিলের শেষদিকে বাংলাদেশের উত্তর পূর্বের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। একইসঙ্গে যেন তলিয়ে গেল হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। হাওরে এখন কৃষকের বোবাকান্না, কৃষকের হাহাকার। বছরের একমাত্র আয়ের উৎস মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তাও চাপে পড়তে পারে।
এই দুর্যোগে হাওরের কৃষকদের পাশে সরকার ও সমাজকে থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বলেছেন যে, আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে হাওরের কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে। সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি অবহেলিত হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
চলন বিলে গানে গানে ধান কাটার উৎসব
এবার ভালো ফসলের আশা করেছিলেন কৃষকরা। এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কয়েকটি পত্রিকায় চলতি রবি মৌসুমে বোরো ধানের ব্যাপক ফলনের সম্ভাবনা উঠে এসেছিল। নড়াইল জেলার বিভিন্ন এলাকার ফসলের মাঠে সোনালি ধানের সমারোহ। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে মাঠে দোল দিচ্ছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন ধানের শিষ।
নাটোরের চলন বিলে চলছিল গানে গানে ধান কাটা উৎসব। একটি জাতীয় দৈনিকে এমনটা পড়লাম। ২৫ এপ্রিলের ঘটনা। ‘চলন বিলের দিগন্তজুড়ে চলছে ধান টাকার উৎসব। ভোরে ধানক্ষেতে হাজির কৃষক। দলবেঁধে গানের তালে তালে চলছে ধান কাটা।’
রংপুরের কাউনিয়া অঞ্চলে ছিলো বোরো ধান কাটার আনন্দ। প্রকৃতিতে যত দূর চোখ যায় শুরু বোরো ধানের মম গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।
হাওরে কৃষকের হাহাকার
এদিকে, ধান কাটার এ মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চলে একেবারেই বিপরীত দৃশ্য। এখানে কৃষকের কণ্ঠে কোনো গান নেই। যদিও হাসন রাজা, রাধারমন দত্ত, উকিল মুন্সি, শাহ আব্দুল করিমের মতো গায়ক ও কবি সবাই এই ভাটি অঞ্চলের। এখানে চলছে কৃষকের বোবা কান্না। ২৭ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ জমির আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে।
হাওরেও এবার বোরো ধানের ভালো ফলনের আসায় ছিলেন কৃষকেরা। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছিল। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সেই আশা ভেসে গেছে।
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম আঘাতে বিপর্যস্ত। যে সময়টা বোরো ধানের মৌসুম, কৃষকের ঘরে স্বস্তি ও প্রাচুর্যের বার্তা নিয়ে আসার কথা, ঠিক সে সময়েই অকাল বৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় মাঠ ভরা সোনালি ধান আজ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
হাওরাঞ্চলে এবারের ক্ষয়ক্ষতি
১৫ মে পর্যন্ত ৭টি হাওর জেলায় প্রায় এক হাজার ১১০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় আড়াই লক্ষ কৃষক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। যা হাওরের মোট জমির প্রায় ১১ শতাংশ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, এবার ক্ষতির পরিমাণ চালের হিসাবে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার টন। এবার সবচেয়ে বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়েছে নেত্রকোনায়। মোট চাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশের বেশি আসে এই এক মৌসুম থেকেই। এরমধ্যে ৭টি জেলার হাওরে উৎপাদন করা হয় প্রায় ২০ শতাংশ। উৎপাদনের এই ঘনত্বের কারণে হাওরাঞ্চলে সাধারণ ক্ষতি হলেও জাতীয় সরবরাহে বড়ো প্রভাব ফেলে।
হাওরাঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে শেষভাগে অতিবৃষ্টি, শিলা বৃষ্টি, ঝড়, সেচ সংকট, ডিজেলের ঘাটতি এবং রোগ-পোকার আক্রমণে ধান উৎপাদনে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও সতর্কবার্তা।
হাওরাঞ্চলে কৃষকের নানাবিধ সমস্যা
হাওরের বন্যা, আগাম বন্যা, কিংবা আগাম ও অতিবৃষ্টি এখন আর প্রাকৃতিক নয়, নিয়মিতভাবেই সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে যে আগাম বন্যা হয়েছিল, তাতে হাওরের প্রায় এক- তৃতীয়াংশ প্লাবিত হয়েছিল, তখন ৮০ শতাংশ বোরো ধান নষ্ট হয়। আবার ২০২২ সালে দুই দফা আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হাওরবাসীদের জীবন দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু বৃষ্টি নয়। হাওরের কৃষকরা আরও যেসব সমস্যার সম্মুখীন তার মধ্যে রয়েছে- শ্রমিক না পাওয়া, বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যেতে না পারা, জলাবদ্ধতা, বাঁধ অকার্যকর হাওয়া, ধানের বীজ ঠিকমতো না পাওয়া ইত্যাদি। হারভেস্টারের সংখ্যা সীমিত। শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না বলে কৃষক মাঠে গিয়ে ধান কেটে উঠতে পারছেন না। আগে অন্য জেলা থেকে কৃষিশ্রমিক এসে ধান বোনা ও কাটার কাজ করে দিতেন, যা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কারণে চাহিদা কমে গেছে। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে দেখা দিয়েছে শ্রমিক সংকট। দুই মন ধানের দাম দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাচ্ছে না কৃষক। অন্যদিকে, ধানের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত কৃষক। আসছে মহাজনদের ঋণ পরিশোধের চাপ।
হাওর অঞ্চল-উত্তর পূর্বাঞ্চলের স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও জল বৈচিত্রময় যে এলাকা
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে হাওর অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। হাওর কেবল প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এলাকা নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণী সম্পদ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ‘হাওর’ বলতে প্রাকৃতিক নিচু নিম্নভূমিকে বোঝায়, যা বর্ষা মৌসুমে সাত-আট মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে এবং শুকনো মৌসুমে (চার-পাঁচ মাস) অধিকাংশ এলাকায় ফসলি জমিতে পরিণত হয়।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশজুড়ে বিস্তৃত নিম্নভূমিতে অবস্থিত হাওরগুলো বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির ও নদীর পানি ধারণ করে বিশাল একক জলাশয়ে পরিণত হয়, যা দেশের সর্ববৃহৎ জলজ বাস্তুতন্ত্র। ২১ সীমান্তবর্তী নদী হাওরের পানিপ্রবাহে অবদান রাখে।
হাওর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মিঠাপানির জলাভূমি। এই হাওর অঞ্চল ৩৭৩টি ছোট-বড় হাওর নিয়ে গঠিত, যা মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রায় ২.৬৩ লাখ হেক্টর আয়তনজুড়ে আছে। এই অঞ্চলে প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস।
হাওরাঞ্চল একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও জল বৈচিত্রময় এলাকা। এই হাওরাঞ্চলে দেশের মোট বোরো ধানের উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ, মাছ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ এবং গবাদি পশুর প্রায় ২২ শতাংশ উৎপাদিত হয়। বর্তমানে হাওরে পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। হাওর একটি বিশেষ ইকোসিস্টেম। হাওরের প্রধান ফসল দুটি মাছ আর ধান। প্রকৃতি এরমধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া, নদী ভরাট হয়ে যাওয়া, হাওরের তলদেশ অনেক জায়গায় উঁচু হয়ে যাওয়া এবং যত্রতত্র অপরিকল্পিত স্থাপনা তৈরির ফলে এই ইকোসিস্টেম অনেকটাই বিপর্যস্ত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উজানের ঢল, অকালবৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এতটাই তীব্র হয়েছে যে, কৃষক আর আগের মতো নিশ্চিন্তে ফসল তুলতে পারছেন না। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই বিপর্যয় শুধু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ফল নয়। এতে আমাদেরও পরিকল্পনার ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ
গত ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে জানান, হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী ৩ মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। কৃষকেরা এখনো কোনো সহায়তা পাননি। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরে আড়াইশ কৃষককে প্রাথমিক সহায়তা হিসেবে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সরকার তিন মাস মেয়াদি মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জনপ্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
গত ৫ মে, দুর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
হাওরাঞ্চলে এখনই যা করা প্রয়োজন
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো হাওরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাময়িক সহযোগিতা প্রদান। সাময়িক সহযোগিতার মধ্যে করণীয় হলো- ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা, কৃষি ঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল এবং আবার চাষাবাদের জন্য উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ করা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নগদ সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা অন্তত ন্যূনতম জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারেন এবং আরও ঋণের ফাঁদে গভীরভাবে বিপর্যস্ত না হয়ে পড়েন।
আমার দীর্ঘ সামরিক জীবনে, বিভিন্ন সময়ে ও পরিবেশে হাওরাঞ্চলে যাওয়া হয়েছে। হাওরাঞ্চলের মানুষের সুখ দুঃখ কিছুটা দেখেছি কাছ থেকে। কখনো বন্যা, কখনো নির্বাচন দায়িত্ব, অথবা ইন এইড অফ সিভিল পাওয়ারের অন্য কোনো দায়িত্বে। কখনো ভ্রমণে। কোনো এক সময় আকাশ থেকে দেখা।
হাওর উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সময়ের দাবি
হাওরাঞ্চলে এই ক্ষতি পূরণে সাময়িক সহায়তা যেমন প্রয়োজন তেমনি দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। বিগত দিনে বিভিন্ন সরকারের সময় হাওর উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এতে হাওরবাসীদের জীবনমানের তেমন উন্নতি হয়নি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। হাওরের দুর্যোগ শুধু অকাল বৃষ্টির কারণে নয়, অপরিকল্পিত ও উন্নয়নের ভ্রান্ত ধারণা-এ দুর্যোগ কঠিন হয়ে উঠেছে। সেজন্য এসব উন্নয়নের একটি আত্ম-সমীক্ষা প্রয়োজন।
লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ লিখেছেন, ‘হাওরে জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণ মূলত নদী, বিল ও জলা ভূমি ভরাট। হাওরের কান্দা থেকে ধাপে ধাপে বিল পর্যাপ্ত ভূমির যে শ্রেণি, তা উন্নয়নের নামে পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতা কাঠামো ও হাওর বিমুখ প্রকৌশলীরা হাওরের জলপ্রণালি ও বাস্তুতন্ত্রকে ভেঙে চুরমার করে অপরিকল্পিত রাস্তা, অবকাঠামো আর বাঁধ নির্মাণ করেছেন।’ (তলিয়ে যাওয়া হাওরকে বুঝতে হবে হাওরবাসীর আয়নায়, প্রথম আলো, ৪ মে, ২০২৬)।
হাওরাঞ্চল একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও জলবৈচিত্রময় একটি অঞ্চল। কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম লিখেছেন, ‘হাওর অঞ্চলের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও প্রেক্ষিতভিত্তিক কৃষিনীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এই অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা বিবেচনায় এমন ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করতে হবে, যা স্বল্প সময়ে ফলন দেওয়া এবং বন্যার আগেই ঘরে তোলা সম্ভব হয়।’ (আমার দেশ, ৬ মে ২০২৬)।
পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা এবং একটি কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তারা সম্ভাব্য দুর্যোগ সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন। একটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওর বাসির পাশে দাঁড়ানো দরকার।
গত ৯ মে, সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, হাওরের সংকট মোকাবেলায় ৫ বছর মেয়াদি সমন্বিত কর্মসূচি হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা আনতে হবে। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর জ্বলে উঠুক নতুন কর্মতৎপরতায়।
হাওরের দুর্যোগ: চাষাভুষার সন্তান, একটি বই ও হাওরকেন্দ্রিক কিছু আলোচনা
সম্প্রতি সাংবাদিক মুহাম্মদ মোফাজ্জলের ‘হাওরের দুর্যোগ ও চাষাভুষার সন্তান’ নামের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। গত ১৭ মে, রাজধানীর সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘হাওরের দুর্যোগ : চাষাভুষার সন্তান’ গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা ও করণীয় নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। নেত্রকোনা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকার উদ্যোগে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। এনিয়ে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, হাওরের মানুষ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও যুগের পর যুগ অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাস্তুবমূখী উদ্যোগ।
সেমিনারে অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, ভুল কৃষিনীতি, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নির্বিচার উন্নয়নের ফলে এই সংকটগুলো তৈরি হয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওরের নদী খনন করা, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, স্থানীয় কৃষকদের যুক্ত করে বাঁধ নির্মাণ-সংস্কার, তদারকি করা ও হাওরের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
নেত্রকোনা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি রফিক মুহাম্মদের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন ডা. মো. আনোয়ারুল হক (এমপি), গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী, সাংবাদিক ফারুক আহমেদ তালুকদার, মাসুদ করিম, মুহাম্মদ মোফাজ্জল, রাজন ভট্টাচার্য ও বাহরাম খান প্রমুখ।
খাদ্য নিরাপত্তার সতর্কবার্তা
২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ বাংলাদেশকে নিয়ে একটি অস্বস্তিকর বার্তা দিয়েছে। ২০২৫ সালে উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের সর্বোচ্চ সময় বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ সংকট পর্যায় বা তার চেয়েও বেশি মাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে ছিল।
খাদ্য নিরাপত্তার এই সতর্ক বার্তা উপেক্ষা করা উচিত না। বাংলাদেশ কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করলে ও জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। জিআরএফসি-২০২৬ প্রতিবেদনকে সতর্কতা হিসেবে পড়া উচিত।
হাওরের কৃষকরা কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়; তারা আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। তাই হাওরবাসীর দুর্দশা উপেক্ষা করা যাবে না। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে সার সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সেটিও আমাদের খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
মেহনতি কৃষকদের অভিবাদন
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে মূলত তিনটি খাত। কৃষি, গার্মেন্টস শিল্প ও বিদেশি রেমিট্যান্স। অর্থাৎ অর্থনীতিতে কৃষক, শ্রমিক (গার্মেন্টস শ্রমিক- অধিকাংশই নারী) ও প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তার ধারাবাহিক অগ্রগতি টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছে। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমই এর মূল চালিকাশক্তি।
দূভার্গ্য হলো, অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা এই তিনটি গোষ্ঠীই হলো রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সবচেয়ে অবহেলার শিকার। রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের মূল্যায়ন করে না। সম্মানও দেখায় না। দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশে-বিদেশে এই তিন হতভাগ্য গোষ্ঠীর সুখ দুঃখগুলো খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত হলো কৃষকগণ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের কৃষকরা শস্য উৎপাদন করছেন। আমাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। হাওরের কৃষকদের সংগ্রাম না দেখলে তা কল্পনা করা যায় না। বাংলাদেশের মেহনতি কৃষকদের অভিবাদন।
ধান ও খাদ্য উৎপাদনে কৃষি বিজ্ঞানীদের অসাধারণ অবদান রয়েছে। নিবেদিত প্রাণ কৃষি বিজ্ঞানীদেরও এ দেশে মূল্যায়ন হয়নি। কৃষি বিজ্ঞানীদের অনেকেই পেশা কিংবা দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন।
লেখক ও সংগঠক নাহিদ হোসেন লিখেন, জাতীয় সংসদে এমপিরা নিজেদের জন্য অফিস ও গাড়ির আবদার করেন। কিন্তু তাদের বক্তৃতায় কৃষক থাকে না। তাদের মন হাওর আর ব্রহ্মপুত্র এর চরের জন্য কতটা কাঁদে। (কৃষকের জন্য আপনাদের মন কাঁদে না, প্রথম আলো, ৩ মে ২০২৬)।
কৃষকের পাশে থাকতে হবে
স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি সার্বিক বিচারে কৃষিখাতকে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সময়। এখন আমাদের ‘স্মার্ট কৃষি’ নিয়েও কাজ করতে হবে। এই কৃষকের পাশে সরকার ও সমাজকে দাঁড়াতে হবে। বিশেষত, এই দুর্যোগকালে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের পাশে দ্রুত জরুরি সহায়তা নিয়ে আসতে হবে। সরকারের প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দ্রুত দৃশ্যমান হোক লক্ষ হাওরবাসীর হাতে। হাসি ফুটুক কৃষকের মুখে। ভাটি অঞ্চলের কৃষক আবার গেয়ে উঠুক আব্দুল করিমের গান। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওরবাসীর জীবন উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু হয় নতুন আলোয়।
কবি নির্মলেন্দু গুণের কৃষক-বন্দনা মনে পড়লো।
স্বাস্থ্যহীন, স্বপ্নহীন, বিদ্যাহীন ঘরে
যাদের আমরা রেখেছিলাম অপাঙন্তেয় করে,
তাদের তরে আকাশ ভরে জ্বালতে হবে আলো
ঢালতে হবে জীবন সুধা বাসতে হবে ভালো।
(ক্ষেত মজুরের কাব্য)
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক
.png)
