নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম/যে লিঙ্গবৈষম্য নারীদের ঠেলে দিচ্ছে ফাঁসির মঞ্চে

২০০৪ সালের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় খুন হন রব অ্যান্ড্রু নামের এক ব্যক্তি। হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে তাঁর স্ত্রী ব্রেন্ডা অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে। মামলার শুনানির একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জুরিবোর্ডের সামনে এক জোড়া লাল অন্তর্বাস তুলে ধরেন। অন্তর্বাসটি ছিল ব্রেন্ডার।
মামলার তথ্যপ্রমাণের দিক থেকে এই অন্তর্বাসের কোনো প্রাসঙ্গিকতাই ছিল না। কিন্তু আদালতের ভেতরে এটি মারাত্মক এক অস্ত্র হয়ে ওঠে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে জুরিদের বোঝানো হলো—যে নারী এমন খোলামেলা পোশাক পরেন, তিনি বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতা মানেন না। আর যিনি দাম্পত্যের সীমারেখা ভাঙতে পারেন, তিনি যেকোনো অপরাধ করতে পারেন; এমনকি মানুষের প্রাণও নিতে পারেন।
বিচারকেরা ব্রেন্ডাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে বলেন, অন্তর্বাস প্রদর্শন বা প্রেমের সম্পর্কের ইতিহাস টেনে এনে বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘মৌলিকভাবেই অন্যায্য’ করে তোলা হয়েছে। আদালত মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্ন আদালতে পাঠান। কিন্তু গত মাসে সংশ্লিষ্ট আপিল আদালত বিষয়টি আমলে নিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের যুক্তি, এসব ব্যক্তিগত বিষয় রায়ে কোনো প্রভাব ফেলেনি।
ব্রেন্ডা অ্যান্ড্রু একা নন। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর মতো আরও বহু নারী মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এসব নারীর বিচারে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা নোংরা লিঙ্গবিদ্বেষী কৌশল খাটিয়েছেন। ব্রেন্ডার আইনজীবীরা এখন আবার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে নতুন করে সুষ্ঠু বিচারের সুযোগ মিলবে। একই সঙ্গে ফৌজদারি আদালতে নারীবিদ্বেষ ও লিঙ্গবৈষম্য নিষিদ্ধের একটি স্থায়ী নজির তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতগুলোতে বর্ণবাদের কারণে বিচার প্রভাবিত হওয়ার বহু নজির রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলেছেন, গায়ের রঙের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া হলে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। ২০১৭ সালেও আদালত এ ধরনের এক বর্ণবাদী রায় বাতিল করেন। অথচ আদালতে নারীদের ওপর যে অবিরত লিঙ্গবৈষম্য চলে, তা রোধে কোনো সুস্পষ্ট আইনি নজির এখনো তৈরি হয়নি।
ব্রেন্ডা অ্যান্ড্রুর মামলায় সরকারি আইনজীবীরা তাঁকে এক ‘ছলনাময়ী নারী’ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁরা দাবি করেন, পুরুষদের মোহগ্রস্ত করে নিয়ন্ত্রণ করাই এই নারীর কাজ। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আইনজীবীরা ব্রেন্ডার স্বল্পবসনা পোশাক, তাঁর অতীত শারীরিক সম্পর্ক এবং গাড়ির ভেতর সঙ্গমের মতো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সাক্ষীদের জেরা করতে থাকেন।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব মুখরোচক প্রসঙ্গের কোনো সম্পর্কই ছিল না। তবুও কেবল তাঁর চরিত্র হনন করার জন্য এসব কথা তোলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—যাতে জুরিবোর্ড তাঁর কোনো কথাই বিশ্বাস না করে। আর এভাবেই ব্রেন্ডাকে ফাঁসির মঞ্চে পাঠানো নিশ্চিত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় নারীবিদ্বেষ ও বর্ণবাদ গভীরভাবে শিকড় গেড়ে আছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মোট আসামির মাত্র ২ শতাংশ নারী হওয়ায় অপরাধবিজ্ঞানীদের গবেষণায় বিষয়টি দীর্ঘদিন আড়ালেই ছিল। সম্প্রতি ‘সেক্স অন ট্রায়াল’ নামের এক গবেষণায় নাতালি গ্রিনফিল্ড এবং স্যান্ড্রা ব্যাবকক ১৯৯০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৪৮ জন নারীর মামলার নথি বিশ্লেষণ করেছেন।
তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৮টি মামলার মধ্যে ৩৪টিতেই (৭১ শতাংশ) রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা নারীদের শরীর ও যৌনতাকেন্দ্রিক ভাষা ব্যবহার করে সাজা নিশ্চিত করেছেন। গবেষকেরা জানান, নারীর শরীর বা অন্তর্বাসের বর্ণনার সঙ্গে অপরাধের কোনো সম্পর্ক সরকারি আইনজীবীরা দেখাতে পারেননি। তবুও বিচারজুড়ে নারীর সাজপোশাক, স্তন, পরকীয়া সম্পর্ক, ব্যক্তিগত ভালো লাগা কিংবা তিনি ‘খারাপ মা’ কি না—তা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অ্যারিজোনায় স্বামীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওয়েন্ডি অ্যান্ড্রিয়ানোর কথাই ধরা যাক। স্বামীর সঙ্গে শারীরিক মিলনের সময় তিনি একধরনের লুব্রিকেন্ট (পিচ্ছিলকারক) ব্যবহার করতেন। বিচারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, প্রেমিকের সঙ্গেও কি তাঁর এই লুব্রিকেন্ট লাগত? এর পেছনে মূল ইঙ্গিত ছিল—এমন জিনিস ব্যবহার করাই তাঁর ‘স্ত্রী হিসেবে ব্যর্থতার’ প্রমাণ!
আবার টেক্সাসে দুই সন্তান হত্যার দায়ে দণ্ডিত ডার্লি রাউটিয়ার স্তনে অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। এরপর কয়েকবার তিনি ব্রা না পরেই বাড়ির বাইরে যান। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে অন্তত দুজন সাক্ষীকে এই বিষয়ে জেরা করেন। পিচ্ছিলকারক বা স্তন অস্ত্রোপচারের সঙ্গে এই অপরাধগুলোর কোনো সম্পর্ক ছিল না। নারীকে অপমানিত করা এবং আদালতকে প্রভাবিত করতেই এই হীন কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই নারীদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময়ে নিজের জীবনে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু আদালতে তাঁদের সেই ভোগান্তির কথা পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়।
যৌনকর্মী ব্রিটনি হলবার্গকে যখন এক খদ্দের আটকে রেখে অত্যাচার করছিল, তখন আত্মরক্ষার্থে তিনি তাঁকে হত্যা করেন। কিন্তু সরকারি কৌঁসুলিরা আত্মরক্ষার এই যুক্তি মানতে চাননি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, যে নারী জীবিকার জন্য শারীরিক সম্পর্কের অভিনয় করতে পারেন, তিনি জন্মগতভাবেই মিথ্যাবাদী। গবেষক স্যান্ড্রা ব্যাবকক বলেন, ‘ভুক্তভোগী নারীকে সহানুভূতি দেওয়ার বদলে আদালত তাঁকেই এক ছলনাময়ী অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করেছেন।’ এভাবে বিচারকদের মন বিষিয়ে দিয়ে ন্যায়বিচারকে হত্যা করা হয়েছে।
গবেষক নাতালি গ্রিনফিল্ডের মতে, আদালত যখন কোনো নারীকে নিয়ে এমন নৈতিক ও গতানুগতিক ছাঁচে বাঁধা রায় দেয়, তখন নিরপেক্ষ বিচার বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই ৪৮টি মামলার ৮৮ শতাংশের বিচারকই ছিলেন পুরুষ। আর ৯৬ শতাংশ মামলায় কৌঁসুলি ছিলেন নির্বাচিত পুরুষ আইনজীবীরা।
পুরুষ আসামিদের সঙ্গেও আদালত এমন আচরণ করেন কি না, তা দেখতে গিয়ে গবেষকেরা ভিন্ন চিত্র পেয়েছেন। পুরুষদের ৫২টি মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, একজন পুরুষের ক্ষেত্রেও তাঁর চেহারা বা অন্তর্বাস নিয়ে আদালতে কথা ওঠেনি। কয়জন নারীর সঙ্গে তিনি শারীরিক সম্পর্ক করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়নি।
পরিষ্কারভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় দুটি বিপরীত নিয়ম চলছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রমাণ দেখা হলেও, নারীদের বেলায় ব্যক্তিগত জীবন ও শরীর দিয়ে অপরাধ মাপা হচ্ছে। স্যান্ড্রা ব্যাবকক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই নারীরা শুধু অপরাধের জন্য শাস্তি পাচ্ছেন না; তাঁরা শাস্তি পাচ্ছেন তাঁদের যৌনজীবনের জন্য, তাঁদের শারীরিক অবয়বের জন্য কিংবা বাইরে যাওয়ার সময় অন্তর্বাস না পরার কারণে।’
সুপ্রিম কোর্ট যদি ব্রেন্ডা অ্যান্ড্রুর আবেদন গ্রহণ করে শুনানির সুযোগ দেন, তবে তা বিচার বিভাগের এই মারাত্মক অন্ধত্ব দূর করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হবে। এটি কেবল ব্রেন্ডার মুক্তি নয়, সমগ্র বিচারব্যবস্থায় নারীদের সুরক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
লেখক পরিচিতি: র্যাচেল লুইস স্নাইডার লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক। বর্তমানে তিনি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর নিয়মিত মতামত লেখক।

