logo

জ্বালানি সংকট থেকে মুদ্রানীতি: যুদ্ধকালে বাংলাদেশের তিন বড় চ্যালেঞ্জ

জ্বালানি সংকট থেকে মুদ্রানীতি: যুদ্ধকালে বাংলাদেশের তিন বড় চ্যালেঞ্জ

যুদ্ধ চলছে সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে, পরীক্ষায় পড়েছে বাংলাদেশ। ইরানের আকাশে যে যুদ্ধবিমান উড়ছে, বিস্ফোরণের শব্দে যেভাবে কেঁপে উঠছে ইরান, তেল আবিব, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত, এ কম্পন শুধু তাদের মধ্যেই থেমে থাকবে না। যুদ্ধের এ কম্পনের ঢেউ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে অচিরেই এসে লাগবে ঢাকার বাজারে, চট্টগ্রামের বন্দরে, এমনকি গ্রামের বিদ্যুৎ সংযোগেও। প্রভাব পড়বে দেশের রিজার্ভের ওপর। জ্বালানি সংকট, ডলার সংকট থেকে মুদ্রানীতি প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ। 

যুদ্ধ মানে শুধু ভূ-রাজনীতি নয়। যুদ্ধ মানেই আরেক দফা তেলের দাম বাড়া, এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ডলারের ওপর চাপ, আর সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়া। যুদ্ধ যেখানেই লাগুক, মোটা দাগে এইসব বিষয়ের ওপর যুদ্ধের প্রভাব অল্পবিস্তর পড়বেই। কিন্তু যুদ্ধটা যদি হয় মধ্যপ্রাচ্যে, তখন এর প্রভাব হবে অত্যন্ত গভীর। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি। জ্বালানি সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত উৎপাদন, রপ্তানি, ডলার সঞ্চয়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের রেমিট্যান্সেরও অন্যতম প্রধান উৎস। সেখানে যুদ্ধ মানেই আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড়োসড়ো ধাক্কা।

আমাদের জ্বালানি আমদানিনির্ভর, রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, আর বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ ডলারনির্ভর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হলে এর প্রতিক্রিয়া আমাদের অর্থনীতিতে খুব দ্রুত অনুভূত হয়। এবারও তাই হবে বলে আশঙ্কা করা যায়।

বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ডলারের রিজার্ভ, এমনকি ব্যাংকের সুদের হারের ওপরও এর প্রভাব এসে পড়বে। আমাদের অর্থনীতি যেহেতু আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, সৌদি আরবসহ অঞ্চলের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার মতো ঘটনা সরাসরি আমাদের ঘরের ভেতরে এসে ঢুকে পড়বে।

এখন প্রশ্ন হলো দেশের অর্থনীতিতে এগিয়ে আসা অবশ্যম্ভাবী এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কী? শুরুতেই তিনটা অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদেরকে।

১) সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানির দাম কি বাড়ানো হবে, হলে কতটুকু পরিমাণ?
২) ডলারের রিজার্ভ কীভাবে বাঁচানো হবে?
৩) এমন অনিশ্চিত সময়ে সুদের হার কমানো কি ঠিক হবে, সুদের হার না কমিয়ে কী করবে সেন্ট্রাল ব্যাংক

প্রথমত, কথা বলা যাক জ্বালানির দাম নিয়ে। বাংলাদেশে তেল-গ্যাসের দাম পুরোপুরি বাজারনির্ভর নয়। এটা অর্থনীতির প্রেক্ষিত বিবেচনায় সরকার ঠিক করে। সংকট এলে সাধারণত দুইটা পথ খোলা থাকে সরকারের সামনে। এক. তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভর্তুকি বাড়ানো। দুই. বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তেলের দাম বাড়ানো।

কিন্তু এই দুইটা পথেই কিছু সমস্যা রয়েছে। যেমন—হঠাৎ বড় করে দাম বাড়ালে পরিস্থিতি ভালো না হয়ে উল্টো জটিল হতে পারে। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে, ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। বেড়ে যায় মুদ্রাস্ফীতি। এটাকে বলে কস্ট-পুশ মুদ্রাস্ফীতি বা ব্যয়বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি। আবার যদি জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়, সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারে আরও দাম বাড়তে পারে। এক্ষেত্রেও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ, দুই দিক থেকেই মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকিতে থাকে দেশ। 

তাই এক ঝটকায় বড় মূল্যবৃদ্ধি না করে ধীরে ধীরে, পরিকল্পিত সংস্কার দরকার। যেমন—যেসব খাত অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে বিদ্যুৎ, কৃষি ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, তাদের জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বেশি ব্যবহারকারী কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে ধাপে ধাপে বেশি ট্যারিফ আরোপ করা যেতে পারে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সীমিত হারে সমন্বয় করে অপচয় কমানোর চেষ্টা করা যায়। পিক আওয়ারে বেশি, অফ-পিকে কম দামের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই জ্বালানি অপচয় যেন না হয়, সেদিকে খুব সর্তক থাকতে হবে। অপচয় হলে প্রয়োজনে জরিমানা করতে হবে।

অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে দাম না বাড়িয়ে সরকার যদি ভর্তুকির পথে যায়, সেখানেও সংকট রয়েছে। বাড়তি ভর্তুকি চাপ ফেলবে ডলার রিজার্ভের ওপর। এতে রিজার্ভ কমে যাবে, ফলে কমে যাবে আমদানি সক্ষমতা। কিন্তু যুদ্ধের বাজারে টিকে থাকতে হলে কোনোভাবেই দুর্বল হলে চলবে না।

কাজেই জ্বালানি সংকট নিরসনে একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে ধাক্কা না দিয়ে জ্বালানি ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনা। হোক সেটা দাম বাড়ানো বা সামান্য ভর্তুকি। তবে মানুষের ওপর চাপ তৈরি না করে হালকাভাবে ধাপে ধাপে জ্বালানি মূল্যসমন্বয় করাটাই ভালো বলে মনে হয়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ১৩ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ বেড়ে ২৯ বিলিয়নে ওঠা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য। রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রচণ্ড ধাক্কা খাবে। দেশে রেমিট্যান্স আসা কমে যাবে, ফলে চাপ পড়বে রিজার্ভের ওপর। অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি বাড়লেও রিজার্ভ দ্রুত কমে যেতে পারে।

এ সময় রিজার্ভকে শুধু টাকার মান ধরে রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে সবচেয়ে বড় ভুল। রিজার্ভের মূল কাজ হলো বড় সংকটে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা। এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া যেতে পারে। 

এক. খাদ্য, কৃষি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি আমদানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। 
দুই. বিলাসী-অতিবিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় আমদানি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। 
তিন. অর্থ পাচার বন্ধ করতে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং কঠোরভাবে বন্ধ করা। 
চার. প্রয়োজনে টাকার মান ধীরে ধীরে সমন্বয় করা, যাতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কিছুটা উৎসাহ পায়। 
পাঁচ. স্পট মার্কেট থেকে নগদে বেশি দামে জ্বালানি কিনে রিজার্ভ দ্রুত শেষ না করে, দীর্ঘমেয়াদি পেমেন্ট সুবিধা খোঁজ করা।

প্রয়োজনবোধে স্পট মার্কেটের চেয়ে যদি একটু বেশি দামেও কিনতে হয়, সেটাও করা যেতে পারে। কারণ, এক্ষেত্রে ডলার পরিশোধে কিস্তি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। যা ডলারের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। এ কথা কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না যে, রিজার্ভের উদ্দেশ্য ডলার জমিয়ে রাখা নয়, বরং অর্থনীতির চাকা সচল রাখা। যুদ্ধকালীন সময়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে খুব মেপে মেপে পা ফেলতে হবে। তৃতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সুদের হার ঠিক রাখা।

নতুন সরকার যদি দ্রুত সুদের হার কমায়, তা ব্যবসায়ী মহলে জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অনিশ্চিত সময়ে বিনিয়োগ শুধু সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না। যুদ্ধ ও অস্থিরতার সময় ব্যবসায়ীরা সাধারণত অনিশ্চয়তার হাত থেকে রেহাই পেতে নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখে, নগদ অর্থ জমিয়ে রাখে এবং ঝুঁকি কমায়। এক্ষেত্রে সুদের হার কমানো হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে অর্থনীতিতে। 

কারণ, খুব কম সুদে সহজ ঋণ পেলে অসৎ গোষ্ঠী সুযোগ নিতে পারে, যা অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি করবে। এর ফলে বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পেতে পারে অর্থাৎ ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে। তারল্য বাড়লে বাড়তে পারে মুদ্রাস্ফীতি। একইসঙ্গে ভুয়া এলসি ও অর্থ পাচারের আশঙ্কাও বাড়তে পারে ব্যাপকভাবে। কাজেই এ সময় সুদের হার হঠাৎ কমানো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। 

যুদ্ধকালীন কঠিন এ সময়ে হঠাৎ সুদের হার না কমিয়ে আমাদের বরং সতর্ক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে এসএমই খাতে সহায়তা বাড়ানো, রপ্তানিতে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা প্রদান, প্রয়োজনীয় এলসি সহজ করা এবং অপ্রয়োজনীয় এলসি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজস্ব বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া, যদিও কাজটি সহজ নয়।

মোট কথা, চলমান যুদ্ধের ডামাডোলে যে পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ এসব সংকট আলাদা আলাদা কোনো বিষয় নয়। জ্বালানি, রিজার্ভ, সুদের হার সগুলোই একে অপরের সাথে জড়িত। এক জায়গায় ভুল করলে অন্য জায়গায় চাপ তৈরি হবে। এসব সংকট মোকাবিলায় আমাদের জন্য জরুরি হলো দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিগ্রহণ করা। বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচিগ্রহণ, লক্ষ্যভিত্তিক মূল্য সংস্কার পদক্ষেপ, কৌশলগত রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, সতর্ক মুদ্রানীতি গ্রহণ এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশে যুদ্ধ যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে যুদ্ধকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভুল নীতিগ্রহণ। জনতুষ্টি অর্জনের জন্য জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং টেকসই সিদ্ধান্ত এখন বেশি দরকার। কার্যকরভাবে জ্বালানি নীতি, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় করতে পারলে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও অর্থনীতি স্থির রাখা সম্ভব। তবে কাজটি সহজ নয় মোটেও। একক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের পক্ষেও প্রায় অসম্ভব। জাতীয় এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা দল গঠন। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সকলের সম্মিলিত যৌক্তিক পরামর্শ এবং সেই আলোকে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণই কেবল মোকাবিলা করতে পারে অর্থনীতির আসন্ন চ্যালেঞ্জ। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ 

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]