Advertisement

আলজাজিরার মতামত/সেউতা ট্র্যাজেডি ও ইসরায়েল-ইউরোপের কট্টর ডানপন্থিদের স্বার্থের মেলবন্ধন

আহমেদ নাজার
সেউতা ট্র্যাজেডি ও ইসরায়েল-ইউরোপের কট্টর ডানপন্থিদের স্বার্থের মেলবন্ধন
সেউতা থেকে মরক্কো ফিরে যাচ্ছেন অভিবাসীরা। ছবি: সংগৃহীত

মরক্কো থেকে স্পেনের ছিটমহল সেউতায় প্রবেশের চেষ্টার সময় কয়েক হাজার মরিয়া মানুষের ওপর যে ট্র্যাজেডি নেমে এসেছে, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এই দুর্ঘটনায় ডজনখানেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ইউরোপের সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটিকে এটি আবারও উসকে দিয়েছে।

তবে এই মানবিক সংকটের ক্ষত শুকানোর আগে একে ভিন্ন রূপ দেওয়া শুরু হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র ডানপন্থিদের নেটওয়ার্কগুলো এটিকে একটি ‘ইসলামি আগ্রাসন’ বলে প্রচার করতে শুরু করে।

মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ‘#স্টপইসলাম’ হ্যাশট্যাগ। কট্টর অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকেরা এই ঘটনাকে কেবল সীমান্ত সংকট নয়, বরং ইউরোপের সভ্যতার সংকট হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পান। এর জেরে ইতালি দ্রুতই স্পেনের সঙ্গে সীমান্ত পরীক্ষা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়।

দ্রুত প্রচারণার পরিবর্তনটি এই সংকটের সবচেয়ে বড় দিক। কারণ, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বা নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই উগ্র ডানপন্থি ও অনলাইন প্রচারকেরা সেউতার ঘটনা নিয়ে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেলেন।

একজন অভিবাসী স্প্যানিশ পুলিশ থেকে দৌড়ে পালাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত
একজন অভিবাসী স্প্যানিশ পুলিশ থেকে দৌড়ে পালাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন হলো, এই দ্রুত প্রচারণার মাধ্যমে আসলে কারা লাভবান হলো? এখানে মূলত লাভ হয়েছে দুটি পক্ষের। প্রথমত, ইউরোপের জাতীয়তাবাদী ডানপন্থিরা অভিবাসন ও ইসলামভীতি ছড়ানোর নতুন উপাদান পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এটি ইসরায়েল সরকার এবং ইউরোপে তাদের রাজনৈতিক বন্ধুদের প্রচারিত একটি বড় এজেন্ডাকে সহায়তা করেছে। সেই এজেন্ডাটি হলো—ইউরোপে মুসলিম অভিবাসন বৃদ্ধি, ইসরায়েলের নীতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম) বৃদ্ধি—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে জড়িত।

গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর থেকে ইউরোপে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখন দাবি করছেন, গাজার ধ্বংসযজ্ঞের কারণে নয়, বরং ইউরোপের জনমিতির পরিবর্তন এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কথা বলছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার প্রচার করেছেন যে, উগ্র ইসলাম ও গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল এবং ইউরোপ একই সমান্তরালে লড়াই করছে। তার এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো—বিশ্বের মনোযোগ গাজার আসল পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে ইউরোপের জনমিতির ও মুসলিমদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।

অথচ বাস্তবতা হলো, ইউরোপের অনেক দেশে যেখানে মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম, সেখানেও প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব পোষণ করে। তবুও হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, নেদারল্যান্ডসের গিয়ার্ট ওয়াইল্ডার্স, ফ্রান্সের মেরিন লে পেন এবং যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থি ব্যক্তিত্ব টমি রবিনসনের মতো নেতারা এই বয়ান আঁকড়ে ধরে আছেন।

তারা একাধারে ইসরায়েলের কড়া সমর্থন করছেন এবং অন্যদিকে কট্টর অভিবাসনবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছেন। এই মেলবন্ধনটি অত্যন্ত স্পষ্ট।

ইউরোপের উগ্র ডানপন্থিদের কাছে ইসরায়েলকে সমর্থন করা মানে নিজেদের ইহুদিদের রক্ষাকর্তা হিসেবে জাহির করা, যার আড়ালে তারা মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে পারে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল সরকারের জন্য এই ডানপন্থি দলগুলো নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক শক্তির উৎস। এরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনাকে অভিবাসন ও নিরাপত্তার সংকটের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। এই দুই পক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থ ভিন্ন হলেও তারা একে অপরকে সাহায্য করছে।

এর ফলে ইউরোপজুড়ে ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে এখন মানবিক বা রাজনৈতিক প্রতিবাদের চেয়ে ‘নিরাপত্তা সংকট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশগুলোকে জননিরাপত্তার হুমকি এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের দাবিকে ‘আমদানিকৃত ইহুদিবিদ্বেষ’ বলে চালানো হচ্ছে।

অবশ্য ইহুদিবিদ্বেষ একটি বাস্তব ও মারাত্মক বর্ণবাদী সমস্যা, যা সবভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। কিন্তু বৈধ উপায়ে ইসরায়েল সরকারের বর্বর নীতির সমালোচনা করা আর ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানো—এক বিষয় নয়।

এই দুটির পার্থক্য যখন মুছে ফেলা হয়, তখন মুক্ত আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলার লড়াইও দুর্বল হয়ে পড়ে।

মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী ক্লান্ত অবস্থান। ছবি: সংগৃহীত
মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী ক্লান্ত অবস্থান। ছবি: সংগৃহীত

সেউতার ঘটনাটি কেবল অভিবাসনের গল্প নয়। যেভাবে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে রাজনীতিক, ভাষ্যকার এবং কর্মীরা একই সুর মেলালেন, তা প্রমাণ করে যে এই ঘটনাটি ব্যাখ্যা করার মতো একটি পূর্বপ্রস্তুত রাজনৈতিক অবকাঠামো তাদের কাছে আগে থেকে ছিল।

সমন্বিতভাবে হোক বা স্বাধীনভাবে হোক, এর রাজনৈতিক প্রভাব কিন্তু একই। একটি বয়ান অন্য বয়ানকে সাহায্য করছে। অভিবাসনের ভয় মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছে।

আর সেই মুসলিমবিদ্বেষকে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানুষের সহমর্মিতাকে সন্দেহজনক করে তোলা হচ্ছে। যখন ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোকে মানবিক বিষয়ের বদলে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন গাজায় ইসরায়েলের নির্মমতাকে আড়াল করা সহজ হয়ে যায়।

এই বিতর্ক এখন আর কেবল সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বৈধতার প্রশ্ন। কার কথা বিশ্বাসযোগ্য, কার দুঃখ-বেদনা স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য এবং কোন রাজনৈতিক কারণটি বৈধ—সেটিই আসল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মিতাকে নৈতিক সাড়া না দেখিয়ে কেবল জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখানো যায়, তবে মনোযোগ গাজার ধ্বংসযজ্ঞ থেকে সরে বিক্ষোভকারীদের পরিচয়ের ওপর এসে পড়বে।

সেউতার ঘটনাটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে স্মরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এটি ইউরোপের সংস্কৃতি যুদ্ধের আরেকটি অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যখন কোনো মানবিক বিপর্যয়কে মানুষের জীবনের চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তখন সত্য গৌণ হয়ে যায় এবং ভয়ই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আদর্শ। আর ভয় যখন আদর্শে রূপ নেয়, তখন অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।


লেখক: আহমেদ নাজার একাধারে একজন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নাট্যকার।