আমরা কি সবাই খুনি?

একটি শিশু হাম বা ডেঙ্গুতে মারা গেল, মুক্তিপণের জন্য অপহৃত হয়ে প্রাণ হারাল, ব্যক্তিগত আক্রোশে কিংবা কিশোর গ্যাং বা সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হলো, অথবা ভেজাল খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানল। একজন তরুণ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন। একজন রোগী সময়মতো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলেন। একটি মেয়েকে পাশবিক নির্যাতনের হত্যা করা হলো কিংবা নির্যাতনের পর লোকলজ্জার ভয়ে সে আত্মহত্যা করল। একজন প্রবাসী প্রতারণার শিকার হয়ে বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারালেন। একজন ঋণের বোঝা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করলেন। আমরা শোক প্রকাশ করলাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানালাম, দায়ীদের শাস্তি দাবি করলাম। তারপর সব ভুলে গেলাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম পরবর্তী মৃত্যুর খবরের জন্য।
কিন্তু কখনো কি নিজেদের প্রশ্ন করেছি, এসব মৃত্যুর পেছনে আমাদের কারও অবহেলা, দায়িত্বহীনতা কিংবা নীরবতার ভূমিকা ছিল কি না? যে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল, তা ঠেকাতে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি কি?
একটি শিশুর কথা ভাবুন। জন্মের পর থেকে তার চরিত্র গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রভাবে। অথচ আমরা অনেকেই সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেয়ে ভালো ফল করানোর প্রতিযোগিতায় বেশি ব্যস্ত। সে কত নম্বর পেল, কোথায় ভর্তি হলো, ভবিষ্যতে কত আয় করবে, এসব নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ নেই। কিন্তু সে কতটা সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল হলো, অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখল কি না, তা নিয়ে কতটা ভাবি?
আমরা সন্তানকে সফল হতে শেখাই, কিন্তু সাফল্যের জন্য কোন পথ বেছে নিতে হবে, তা শেখাই কি? তাকে প্রতিযোগিতায় জিততে বলি, কিন্তু অন্যের অধিকার রক্ষা করতে শেখাই কি?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই প্রশ্ন। শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল এবং চাকরির উপযোগী দক্ষতা তৈরি করা, নাকি সৎ, বিবেকবান ও মানবিক মানুষ গড়ে তোলা? শিক্ষক যখন শিক্ষাদানের চেয়ে ব্যক্তিগত কোচিংয়ে বেশি মনোযোগী হন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন মূল্যবোধের চেয়ে ফলাফলকে বড় করে দেখে, তখন শিক্ষার একটি মৌলিক উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থেকে যায়।
শিশুরা আমাদের উপদেশের চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে। আমরা নিজেরা অনিয়ম করি, অন্যায় দেখেও চুপ থাকি, অথচ সন্তানকে সততা শেখাই। এই দ্বিচারিতা থেকে যে প্রজন্ম তৈরি হয়, তার দায় কি শুধু সেই প্রজন্মের?
আমাদের গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিও মানুষের চিন্তা ও আচরণ গঠনে ভূমিকা রাখে। জনপ্রিয়তার জন্য যখন অশালীনতা, অপমান, গুজব, প্রতারণা কিংবা দায়িত্বহীনতাকে বিনোদনের উপাদান করা হয়, তখন তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে ভাবতে হয়। আমরা কেমন মানুষকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরছি? সততা ও জনসেবার চেয়ে অর্থ, ক্ষমতা ও পেশিশক্তি যখন বেশি সম্মান পায়, তখন তরুণেরা কী শিখবে?
এবার বাজারের দিকে তাকাই। অধিক মুনাফার জন্য কেউ খাদ্যে ভেজাল দেন, কেউ ক্ষতিকর উপাদান মেশান, কেউ জেনেশুনে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করেন। তাদের কর্মকাণ্ডে মানুষ অসুস্থ হয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে, কখনো প্রাণও হারায়। এটি কি নিছক ব্যবসায়িক অনিয়ম? মানুষের জীবনকে মুনাফার চেয়ে কম মূল্য দেওয়ার পরিণতি কি হত্যার দায়ের প্রশ্ন তোলে না?
একইভাবে, প্রকৌশলী যদি নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারে সম্মতি দেন, চিকিৎসক যদি রোগীর স্বার্থের চেয়ে অনৈতিক আর্থিক লাভকে প্রাধান্য দেন, সরকারি কর্মকর্তা যদি জনসেবার বদলে ব্যক্তিগত সুবিধা খোঁজেন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যদি আইন রক্ষার পরিবর্তে আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। তাদের অবহেলা কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে মানুষের জীবন বিপন্ন করে।
অবশ্য প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য ব্যক্তিকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। জনবল, সরঞ্জাম, কর্মপরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত অসততা ও ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার পার্থক্য নির্ধারণের নামে কোনো পক্ষকেই জবাবদিহির বাইরে রাখা যায় না।
আমাদের সড়কে প্রতিদিন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, দুর্বল তদারকি ও আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা, এসবের কোনটি কতটা দায়ী, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে, ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু শুধু মশার কারণে ঘটে না; অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
কোনো শিশু ডেঙ্গুতে মারা গেলে আমরা শোক প্রকাশ করি। কিন্তু যে অব্যবস্থাপনা তার মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়েছে, তা দূর করতে কতটা উদ্যোগী হই? হাসপাতালের ভবন ও শয্যা বাড়লেই কি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হয়? প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষার ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতা না থাকলে সেই অবকাঠামোর মূল্য কতটুকু?
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া তরুণেরা প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হলে আমরা দালালদের দোষ দিই। কিন্তু নিরাপদ নিয়োগ, নির্ভরযোগ্য তথ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দায়িত্ব পালন করেছে, সেই প্রশ্নও তুলতে হবে। একইভাবে, মেধাবী মানুষ যখন যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পান না এবং সৎ মানুষের চেয়ে সুবিধাভোগীরা বেশি মূল্যায়িত হন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ।
এতগুলো প্রশ্নের পর রাষ্ট্রের দায় নিয়ে কথা বলা জরুরি। কারণ, আইন প্রয়োগ, জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায়বিচারের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে, অনিয়মের বিচার না হলে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতা আরও বিস্তারের সুযোগ পায়।
যে সময়ে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন, তাদের দায়ও সেই সময়ের ক্ষমতা ও দায়িত্বের আলোকে নির্ধারিত হওয়া উচিত। ক্ষমতা ভোগের অধিকার থাকলে ব্যর্থতার জবাবদিহিও থাকতে হবে। তবে রাষ্ট্রকে দায়ী করে নাগরিক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা পরিবারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আমাদের ব্যক্তিগত দায় মুছে দেয় না; আবার ব্যক্তির দায়ের কথা বলে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকেও আড়াল করা যায় না।
তাহলে কি আমরা সবাই খুনি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আইনগত দায় ও নৈতিক দায়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।
আইনগত দায় নির্ধারিত হয় আইন, প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। কোনো ব্যক্তির কাজ বা অবহেলার কারণে কারও মৃত্যু ঘটলেই তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যাকারী বলা যায় না। ঘটনার প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে তার দায় নির্ধারণ করতে হয়।
কিন্তু নৈতিক দায়ের পরিধি আরও বিস্তৃত। কোনো বাবা-মা সন্তানের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব অবহেলা করলে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্ব পালন না করলে, কোনো ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার জন্য মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেললে কিংবা কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম দেখেও নীরব থাকলে, এসব ক্ষেত্রে সব সময় আইনগত অপরাধ প্রমাণিত না-ও হতে পারে। কিন্তু তাদের আচরণ নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। একইভাবে, কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি ঠেকাতে ব্যর্থ হলে তার প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক দায়ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অবশ্য সবার দায় সমান নয়। কার কতটা ক্ষমতা ছিল, কী দায়িত্ব ছিল, কী করা সম্ভব ছিল এবং ক্ষতির সঙ্গে তার ভূমিকার সম্পর্ক কতটা প্রত্যক্ষ, এসব বিবেচনা করতে হবে। ভয়, অক্ষমতা, তথ্যের অভাব ও বাস্তব সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, আইনগতভাবে আমরা সবাই খুনি নই; কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, অন্যের ক্ষতি জেনেও তা উপেক্ষা করে কিংবা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে আমরা অনেকেই মানুষের দুর্ভোগ, এমনকি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর জন্য নৈতিকভাবে দায়ী। এই দায় নির্ধারণের উদ্দেশ্য সবাইকে অপরাধী আখ্যা দেওয়া নয়; বরং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা এবং ভবিষ্যতে ক্ষতি প্রতিরোধে উদ্যোগী করে তোলা।
আমাদের এখন প্রয়োজন অন্যকে দোষারোপের প্রতিযোগিতা নয়, আত্মজিজ্ঞাসা। পরিবারে সন্তানকে মূল্যবোধ শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। পেশাজীবীদের সততা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যবসায় মানুষের জীবনকে মুনাফার ওপরে স্থান দিতে হবে। আর রাষ্ট্রকে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অনিয়মের বিচার হবে এবং নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে।
আমরা প্রায়ই বলি, দেশটা ভালো হচ্ছে না। কিন্তু দেশ তো কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়। দেশ মানে আমি, আপনি, আমাদের পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। আমরা প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে দেশকে ভালো করার আশা করি কীভাবে?
একটি শিশুর মৃত্যু, একটি সড়ক দুর্ঘটনা, একজন রোগীর অবহেলাজনিত মৃত্যু কিংবা একজন প্রতারিত মানুষের আত্মহনন, প্রতিটি ঘটনা আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়: এই মৃত্যু কি ঠেকানো যেত? ঠেকানো সম্ভব হলে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছিলাম কি? কারণ, যে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব ছিল, সেই মৃত্যুর দায় থেকে আমরা কেউই শুধু চোখ বন্ধ করে মুক্তি পেতে পারি না।
লেখক পরিচিতি
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আহ্বায়ক, ওয়েলবিইং ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]