logo
Advertisement

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ‘রিকভারি ওয়ার রুম’: আর্থিক পুনরুদ্ধার ও গ্রাহকআস্থা ফেরানোর নতুন দিগন্ত

মোঃ খায়রুল হাসান
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ‘রিকভারি ওয়ার রুম’: আর্থিক পুনরুদ্ধার ও গ্রাহকআস্থা ফেরানোর নতুন দিগন্ত
খাইরুল হাসান।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠন ও সংস্কারের মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, অপরিকল্পিত বিনিয়োগ, বিপুল খেলাপি বিনিয়োগ এবং তারল্যসংকটের কারণে দেশের অনেকগুলো ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে শুরু হয়েছে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ এর আওতায় পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন।

Advertisement

এই একীভূতকরণ কেবল পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখো আমানতকারীর অর্থ ও আস্থা, হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ এবং দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। তাই নতুন ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ও অনাদায়ী বিনিয়োগ দ্রুত, কার্যকর ও টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি বিনিয়োগ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৭ শতাংশ। ব্যাংকভিত্তিক খেলাপি বিনিয়োগের চিত্রও অত্যন্ত উদ্বেগজনক—ইউনিয়ন ব্যাংকে প্রায় ৯৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকে ৪৮ শতাংশ।

এ ধরনের বিশাল অঙ্কের অর্থ যখন দীর্ঘদিন অর্থনীতির মূল স্রোতের বাইরে আটকে থাকে, তখন তার প্রভাব শুধু ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে ব্যাংকের তারল্য কমে, নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়, ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ সংকুচিত হয়ে যায় এবং আমানতকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য নিছক একটি হিসাবরক্ষণ বা আদায় কার্যক্রম নয়; এটি ব্যাংকের পুনর্জাগরণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদারের নেতৃত্বে বিনিয়োগ আদায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ গঠন করা হয়েছে বিশেষ ‘কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি ওয়ার রুম’। ‘ওয়ার রুম’ শব্দটি কোনো গ্রাহকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বোঝায় না; বরং এটি দীর্ঘদিনের অনাদায়ী বিনিয়োগ, তথ্যের বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল আদায় সংস্কৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধীরগতির বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।

ওয়ার রুম হবে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড ও সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম। এখানে বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ খেলাপি হিসাবসমূহ চিহ্নিত করে প্রতিটির জন্য পৃথক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শাখা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আদায় কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা হবে। দ্রুত আদায়যোগ্য হিসাবগুলোকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করে ‘কুইক রিকভারি পোর্টফোলিও’ তৈরি করার পাশাপাশি সম্ভাবনাময় ব্যবসা ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও শরিয়াহসম্মত পুনর্গঠন বা বাস্তবসম্মত সমাধানের সুযোগও বিবেচনা করা হবে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় তথ্য-নির্ভর পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাপনা’ বিশেষ গুরুত্ব পাবে। প্রতিটি বৃহৎ খেলাপি হিসাবের জামানতের মান, আইনি অবস্থান, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং বাস্তব পরিশোধ সামর্থ্য বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হলে সীমিত সম্পদ ও জনবলকে সর্বোচ্চ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ও নিয়মিত রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে আদায়ের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আসবে এবং কর্মকর্তা পর্যায়ে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে।

তবে খেলাপি বিনিয়োগ আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোরতা ও মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ইচ্ছাকৃত খেলাপি বা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক বাস্তবতার কারণে সাময়িকভাবে সমস্যাগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় বিনিয়োগগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে আইন ও শরিয়াহর সীমার মধ্যে পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল বা অন্যান্য কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। কারণ টেকসই পুনরুদ্ধার মানে শুধু অর্থ ফেরত পাওয়া নয়; যেখানে সম্ভব, কার্যকর ব্যবসাকে পুনরুজ্জীবিত করাও এর অংশ।

প্রতিটি উদ্ধার হওয়া টাকা ব্যাংকের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। পুনরুদ্ধারকৃত অর্থ ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি, নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি করতে পারে। সেই অর্থ নতুন উদ্যোক্তার ব্যবসা, শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই ওয়ার রুমের মূল দর্শন—“প্রতিটি আদায় গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিটি টাকা মূল্যবান।”

তবে আর্থিক পুনরুদ্ধার কেবল একটি বিভাগ বা নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার দায়িত্ব নয়। পাঁচটি ব্যাংক থেকে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব জ্ঞানকে একটি অভিন্ন লক্ষ্য ও সংস্কৃতির অধীনে কাজে লাগাতে হবে। “ওয়ান-টিম, ওয়ান ফিউচার” দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যেক কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সঙ্গে নিজের সাফল্যকে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি এবং সুস্পষ্ট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

আর্থিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও শরিয়াহ পরিপালনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আজকের খেলাপি বিনিয়োগ আদায় করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের ঝুঁকি পুনরায় তৈরি না হয়, সে জন্য বিনিয়োগ অনুমোদন, বিনিয়োগ পরিবীক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

একটি ব্যাংকের মূল শক্তি শুধু মূলধন, প্রযুক্তি বা শাখা নেটওয়ার্ক নয়—এর চেয়েও বড় শক্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। একজন মানুষ যখন ব্যাংকে তার সঞ্চয় জমা রাখেন, তখন তিনি শুধু অর্থ নয়, নিজের ভবিষ্যৎ ও বিশ্বাসও সেখানে অর্পণ করেন। তাই আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষা এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

‘কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি ওয়ার রুম’ সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; বরং একটি নতুন কর্মসংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতার প্রতীক। রাষ্ট্রীয় সমর্থন, শক্তিশালী মূলধন কাঠামো, দক্ষ নেতৃত্ব, অভিজ্ঞ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং এবং সুশাসনের সমন্বয় ঘটাতে পারলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একটি সফল পুনর্গঠনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসতে সময় লাগে। কিন্তু সঠিক নেতৃত্ব, কঠোর জবাবদিহিতা, পেশাদারিত্ব এবং দৃশ্যমান ফলাফল সেই আস্থাকে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রায় প্রতিটি আদায় একটি অর্জন, প্রতিটি উদ্ধার হওয়া টাকা একটি সম্ভাবনা এবং প্রতিটি সুশাসনভিত্তিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের শক্ত ভিত।

প্রতিটি টাকা উদ্ধার মানে শুধু একটি হিসাবের উন্নতি নয়—এটি একটি ব্যাংকের তারল্য শক্তিশালী করা, একটি আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা, একটি উদ্যোক্তার সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়া এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পর্যায়ক্রমে সে পথেই এগিয়ে যাবে—এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।