ডেইলি স্টারের কলাম/দ্বিজাতিতত্ত্বের পতন ও নতুন জাতিসত্তার অভ্যুদয়

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যার মুখে শুধু যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা নয়। এই দিনটি উপমহাদেশে জাতিগঠনের মৌলিক ভিত্তিটাকেই আমূল বদলে দিয়েছিল।
ঔপনিবেশিক আমলে দক্ষিণ এশিয়ায় জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি ছিল ধর্ম। লালা লাজপত রায়, বিনায়ক দামোদর সাভারকর, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার ও মাধবরাও সদাশিবরাও গোলওয়ালকারসহ হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ধর্মভিত্তিক জাতিগঠনের পক্ষে প্রকাশ্যে মত দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার দেশভাগের চিন্তা করার অনেক আগেই লালা লাজপত রায় ধর্মের ভিত্তিতে অবিভক্ত পাঞ্জাবের সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।
অন্যদিকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন আধুনিক মানসিকতার মানুষ। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার রক্ষার লড়াই চালিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেই কঠিন পথ থেকে সরে আসেন। তিনি জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে ধর্মকে স্বীকার করে নেন। যদিও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি আবার এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের ডাক দিয়েছিলেন।
মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরু ছিলেন সমন্বিত জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা। তবে তাঁরাও কার্যত স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে ঔপনিবেশিক ভারতে জাতিপ্রশ্নের কেন্দ্রে ধর্মই প্রধান উপাদান ছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার এই ধারায় বড় পরিবর্তন আনে। এই লড়াই ভাষাকেই জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। তবে জাতীয় সংস্কৃতি নির্মাণে ধর্মের যে ভূমিকা ছিল, তা-ও এই আন্দোলন পুরোপুরি মুছে ফেলেনি।
মুসলিম বিশ্বের প্রেক্ষাপট ও ভাষার গুরুত্ব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক-উত্তর যুগে মুসলিম বিশ্বেও ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কামাল আতাতুর্ক অটোমান সাম্রাজ্য ও তার ঐতিহ্যকে বর্জন করেছিলেন। কারণ সেই প্রাচীন সাম্রাজ্যে বহু ভাষা ও নৃগোষ্ঠীর মানুষ একসঙ্গে বাস করত। এটি তাঁর ভাষাকেন্দ্রিক আধুনিক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মিলছিল না।
একইভাবে পারস্যের মানুষের মধ্যেও নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আবেগ কাজ করেছিল।
পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে জামাল আবদেল নাসের কিংবা বাথ পার্টির নেতৃত্বে যে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধে, তা-ও ধর্মের চেয়ে ভাষাকেই বড় পরিচয় হিসেবে তুলে ধরেছিল। আজ ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামের ভিত্তিও সেই অভিন্ন আরব পরিচয়। সেখানে মুসলিম ও খ্রিষ্টান—উভয় ফিলিস্তিনিই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন।
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার কথাই ধরা যাক। সেখানে মানুষ ইসলামি পরিচয় বজায় রেখেই তাদের প্রাক্-ইসলামি দ্বীপ-সংস্কৃতিকে লালন করে।
আজকের মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো ‘কুর্দি সমস্যা’। সেখানকার বড় বড় রাষ্ট্র আজও কুর্দিভাষীদের জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিতে নারাজ।
মুসলিম বিশ্বে আরবদের পরই বাঙালি হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। আর পুরো এশিয়ায় চীনা (হান) ও হিন্দি-উর্দুভাষীদের পরেই বাঙালির স্থান। তাই রাজনৈতিক আধুনিকতার লড়াইয়ে বাঙালি মূলত আধুনিক মুসলিম বিশ্বের এই মূল ধারাটিকেই বেছে নিয়েছিল।
‘দীর্ঘ ষাটের দশক’ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট
নাসেরের আরব জাতীয়তাবাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জোয়ার এসেছিল ‘দীর্ঘ ষাটের দশকে’ । ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্থার মারউইক এই প্রত্যয়টি সামনে আনেন। জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ বোঝাতে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
এই ধারণার মূল কথা হলো—ষাটের দশককে কেবল ১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। বরং ওই দশকের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকেই সময়টিকে দেখতে হবে।
পূর্ব পাকিস্তানে এই ‘দীর্ঘ ষাটের দশক’ শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে। এক নড়বড়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সেই নির্বাচন হয়েছিল।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের নেতারা প্রথমবারের মতো কিছুটা ক্ষমতার স্বাদ পান। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতায় এই সংক্ষিপ্ত অংশগ্রহণ দলের মধ্যেই বিভেদ তৈরি করে। বিরোধের মূল বিষয় ছিল স্নায়ুযুদ্ধে পাকিস্তানের অবস্থান।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রপন্থী সামরিক জোট ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ ও ‘সিয়াটো’তে (SEATO) যোগ দেয়। পাকিস্তানের উদীয়মান সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক শাসকশ্রেণির নিরাপত্তা ভাবনার কারণেই এই চুক্তিগুলো হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তকে সক্রিয় সমর্থন দেওয়ায় দলে বড় ধরনের ফাটল ধরে।
মাওলানা ভাসানীর মতো প্রগতিশীল নেতারা এবং কমিউনিস্টরা এই সামরিক জোটের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের মতে, এই সিদ্ধান্ত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে গেছে।
তাঁরা মনে করতেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষ যখন সাম্রাজ্যবাদী সামরিক ব্লকের বিরুদ্ধে লড়ছে, তখন পাকিস্তানেরও উচিত এসব জোট থেকে দূরে থাকা।
শেষ পর্যন্ত এই বামপন্থীরা দল থেকে বেরিয়ে এসে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতির ভিত্তিতে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) গঠন করেন। একদিকে স্নায়ুযুদ্ধের সামরিক জোট, অন্যদিকে পাকিস্তানে পশ্চিমাপন্থী সামরিক জান্তার উত্থান—এই দুই মিলে ষাটের দশকের রাজনীতির মূল গতিপথ ঠিক করে দেয়।
গণআন্দোলন ও ১৯৬৮-৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান
সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক সরকার জোর করে এক কৃত্রিম ‘জাতীয় সংহতি’র সংস্কৃতি চাপাতে চেয়েছিল। সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজ সেই নীতির বিরুদ্ধেই তীব্র প্রশ্ন তোলে।
একই সময়ে পাকিস্তানে কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক বিক্ষোভ ও ছাত্র অসন্তোষ মাথাচাড়া দেয়। পুঁজিপতিদের তথাকথিত উন্নয়ন সমাজে শ্রেণিগত, আঞ্চলিক ও জাতিগত বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই সব আন্দোলন এক মোহনায় এসে মেলে।
এই বিক্ষোভের পেছনে সমাজের অভ্যন্তরীণ ভাঙনও কাজ করছিল। পূর্ব বাংলা থেকে পুঁজি পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হচ্ছিল। গ্রামীণ কৃষকেরা দিনে দিনে নিঃস্ব হচ্ছিলেন। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সমঝোতার দরজাও শাসকগোষ্ঠী একের পর এক বন্ধ করে দিচ্ছিল।
এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকেরা রাজপথে নেমে সামরিক জান্তার ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ১৮৪৮ সালের বিপ্লব গোটা ইউরোপের জন্য যা ছিল, বিংশ শতাব্দীতে ১৯৬৮-৬৯ সালের গণআন্দোলনও বৈক্স্বিক প্রেক্ষাপটে ঠিক একই রূপ নিয়েছিল।
অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ ও জাতীয় মুক্তির স্বপ্ন
পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে দুটি চিন্তা তখন প্রধান হয়ে ওঠে—একটি ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ’, অন্যটি ‘জাতীয় মুক্তি’। এই দুটি প্রত্যয় শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্যে অসামান্য রাজনৈতিক শক্তি এনে দেয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিণত হয় এক প্রবল মুক্তিকামী শক্তিতে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ কেবল স্থানীয় গণ্ডির ভেতর আটকে ছিল না। তৃতীয় বিশ্বের মুক্তিসংগ্রাম, সাহিত্য ও রাজনীতির নানা ধারা থেকেও এই আন্দোলন প্রেরণা নিয়েছিল।
১৯৬৮-৬৯ সালে সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরেফদের নেতৃত্বে বামঘেঁষা বাঙালি জাতীয়তাবাদী তরুণদের দল ‘নিউক্লিয়াস’ গড়ে ওঠে। এই সংগঠনের তরুণদের জন্য চে গুয়েভারা, রেজিস দেব্রে, জেনারেল গিয়াপ ও মাও সে তুংয়ের রচনা পাঠ করা বাধ্যতামূলক ছিল।
এই জাতীয়তাবাদী ছাত্র-বিপ্লবীরা একটি শোষণমুক্ত স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্রের রোমাঞ্চকর স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন।
অন্যদিকে বামপন্থীদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তাঁদের মতে, ‘জাতীয় মুক্তি’ অর্জন করতে হলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার যে অশুভ আঁতাত, তা ভাঙতেই হবে। পাকিস্তানের জাতীয় সম্পদের ওপর সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা ধনিক শ্রেণির যে একচেটিয়া দখল ছিল, বামপন্থীরা তাকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন।
ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ‘জাতীয় মুক্তি’র ডাক এক বৈপ্লবিক চেহারা নেয়। এই আন্দোলনের স্পষ্ট লক্ষ্য দাঁড়ায়—লুণ্ঠিত জাতীয় সম্পদ জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনা, ধনিক শ্রেণির দৌরাত্ম্য খতম করা, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা এবং বলিষ্ঠ ‘জাতীয় চেতনা’ গড়ে তোলা।
মুক্তিসংগ্রাম ও একটি নতুন দেশের জন্ম
ষাটের দশকের বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত বাঙালিকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত মোহনায় পৌঁছে দিয়েছিল। বাকিটুকু ইতিহাসের অংশ।
পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে সামরিক জান্তা ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। এর জবাবে বাঙালি শুরু করে নজিরবিহীন অহিংস অসহযোগ আন্দোলন।
এরপর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে নৃশংস গণহত্যা। যার অবধারিত পরিণতি হিসেবে গর্জে ওঠে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
এই মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় নতুন বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ ভেঙে চুরমার করে দেয় ঔপনিবেশিক আমলের সেই সংকীর্ণ সমীকরণ—যেখানে ‘ধর্ম’কেই জাতির একমাত্র মাপকাঠি ভাবা হতো।
বাঙালির এই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বহু স্বপ্ন হয়তো পরবর্তী সময়ে পূর্ণতা পায়নি। তবে সেই অপ্রাপ্তি যেন কোনোভাবেই আমাদের গৌরবময় মুক্তিসংগ্রাম ও জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে আড়াল করতে না পারে।
লেখক পরিচিতি
শুভ বসু: ইতিহাসবিদ ও গবেষক। তিনি কানাডার মন্ট্রিলস্থ ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিক্ষা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক জাতিগঠন প্রক্রিয়া।
