logo

হরমুজ প্রণালি সংকট: একক নির্ভরতা কাটিয়ে যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ভারত

হরমুজ প্রণালি সংকট: একক নির্ভরতা কাটিয়ে যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ভারত

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানচিত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কৌশলগত জলপথ হলো হরমুজ প্রণালি। মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রস্থের সংকীর্ণ এই সমুদ্রপথটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। চলতি বছর পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা এই প্রণালিকে সাধারণ একটি বাণিজ্যপথ থেকে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার ও শক্তির ভারসাম্যের এক জটিল কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বিশ্বের অনেক দেশের কাছে হরমুজ এখন কেবলই একটি ‘ঝুঁকি’, কিন্তু ভারতের জন্য এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌশলগত সক্ষমতার বিশাল এক পরীক্ষা।

প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়, যা সমুদ্রপথে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের প্রায় এক চতুর্থাংশ। যদিও এই পথের বিকল্প কিছু পাইপলাইন রয়েছে, তবে সেগুলোর কোনোটিই হরমুজের বিশাল প্রবাহের সমকক্ষ হতে পারে না। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি যেহেতু ‘জাস্ট ইন টাইম’ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তাই হরমুজে সামান্য অস্থিরতাও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে—তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়, জাহাজ পরিবহন ও বীমা ব্যয় বাড়ে এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা। ফলে হরমুজ এখন আর শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং এক ভয়াবহ বৈশ্বিক ঝুঁকির উৎসে পরিণত হয়েছে।

এক সময় উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির ওপর ভারতের নির্ভরতা ছিল প্রশ্নাতীত। তবে গত এক দশকে নয়াদিল্লির বাণিজ্য কৌশল আমূল বদলেছে। ভারত এখন বাণিজ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় বহুমুখী নীতি গ্রহণ করেছে।

এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হলো পূর্বপ্রস্তুতি। ভারত তার কৌশলগত তেল মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, সংকটের সময়ও দেশটি দুই মাসের বেশি সময় অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এটি আকস্মিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার অর্থনৈতিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, ভারত তার আমদানির উৎসও বৈচিত্র্যময় করেছে। বর্তমানে ভারত শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকে নয়, বরং রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করছে। এর ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংকট ভারতকে আগের মতো প্রভাবিত করতে পারছে না।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতের ব্যালেন্সিং কূটনীতি। বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে ‘মাল্টি অ্যালাইনমেন্ট’ নীতির মাধ্যমে ভারত চরম উত্তেজনার মধ্যেও তার জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে।

একই সঙ্গে ভারতের নৌ সক্ষমতাও বড় ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি ‘অপারেশন সংকল্প’ এর আওতায় ভারতীয় নৌবাহিনী এখন ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সরাসরি নিরাপত্তা দিচ্ছে। অত্যাধুনিক নজরদারি বিমান, হেলিকপ্টার ও রিয়েল টাইম তথ্য ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এই উদ্যোগের একটি মানবিক দিকও রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত প্রায় ২০ হাজার ভারতীয় নাবিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন দেশটির অগ্রাধিকার।

তবে এত প্রস্তুতির পরও ভারত পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি সংকট চললে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের মূল্যস্ফীতি ও আমদানি ব্যয়ের ওপর, যা পুরো অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করবে। এছাড়া যুদ্ধের আবহে জাহাজের বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়াও একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

এই বাস্তবতায় ভারত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজছে। ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ (আইএমইসি) প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রপথের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে একটি বিকল্প স্থল ও সমুদ্র সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি এখন কেবল ভূগোলের অংশ নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির এক শক্তিশালী প্রতীক। এটি যেমন ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি সুযোগও সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যারা কূটনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতার সঠিক সমন্বয় করতে জানে তাদের জন্য। ভারতের বর্তমান কৌশল সক্রিয় নৌ উপস্থিতি, কূটনৈতিক ভারসাম্য ও জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ—একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে দেশটির উত্থানকে ত্বরান্বিত করছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন সরবরাহ ব্যবস্থাকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন সামুদ্রিক নেতৃত্ব আর ঐচ্ছিক বিষয় নেই, বরং অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি হয়তো আজও অপরিহার্য, কিন্তু ভারতের বর্তমান অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে, যেখানে একক কোনো সমুদ্রপথ আর কোনো দেশের ভাগ্য নির্ধারণের একক চাবিকাঠি থাকবে না।

লেখক: ভারতের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক নীতি বিশ্লেষক