logo
Advertisement

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন/পাহাড় সমুদ্র আর অরণ্যের স্তব লিখে লিখে…

খান মুহাম্মদ রুমেল
খান মুহাম্মদ রুমেল
পাহাড় সমুদ্র আর অরণ্যের স্তব লিখে লিখে…
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ছবি : গণমাধ্যম থেকে

সেই সময়, প্রথম আলো আর পূর্ব-পশ্চিম ট্রিলজির যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিনে আমরা অভ্যস্ত, তার আসল পরিচয় কিন্তু তা নয়। তিনি সুখী হতে চেয়েছিলেন নীরাকে নিয়ে কবিতা লিখে। আমোদিত হতে চেয়েছিলেন বরুনার বুকের মাংসের গন্ধে। জীবনানন্দ ছিলেন তার পথের দিশারী। সুনীলের নিজের জীবন নিয়ে লেখা ‘অর্ধেক জীবন’ বইটিতে এমন আভাসই দিয়েছেন তিনি।

কবিতা ছিল তার নেশা। সে নেশা লেগে ছিল মনের প্রতিটি কোনায়। নইলে মাঝরাতে হঠাৎ হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে যাবে কেন কবিতার টানে? কবিতা ছিল তার আশ্রয়, পাঠক হিসেবে আমরা দেখি কবিতা হয়েছিলও তার আশ্রয়। বিদেশে গিয়ে ক্লান্তিকর, বিস্বাদ আর অর্থহীন দিনগুলো কেটে যেত কবিতায়। একদিন কষ্টগুলো কাগজে মেলে দিয়ে লিখে ফেললেন-

‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ পুরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা!’

বলছিলাম ‘অর্ধেক জীবন’র কথা। সমসাময়িক কবিরা বারবার ঘুরেফিরে এসেছেন বইটিতে। এসেছে কৃত্তিবাস, কবিতা সংঘ আর কফি হাউজের আড্ডা। বইটায় লেগে ছিল ছাপাখানার গন্ধ, বইয়ের দোকানের গন্ধ। বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়; কমলকুমার থেকে বিভূতি-মানিক; বনফুল থেকে সত্যজিৎ- কে নেই ‘অর্ধেক জীবন’ –এ!

আহা! কি দুর্দান্ত যৌবন কাটিয়েছেন কবিতার সাথে তিনি। উপন্যাস লিখতে ভয় পেতেন। ভাবতেন- আমি কি পারব? অর্থের জন্য তবুও লিখেছেন দেশ পত্রিকায় নীললোহিত ছদ্মনামে। অর্থাভাব থাকলেও সুনীল কাটিয়েছেন এক বোহেমিয়ান জীবন। সময় পেলেই চলে যেতেন এখানে সেখানে।

বইয়ের পাতায় পাতায় আমিও যেন ঘুরেছি তার সাথে। দেশভাগের ব্যাপারটা তার বইয়ে বইয়ে ফুটে উঠেছে রমণীর কাজল ধোয়া চোখের জলের মতো। এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের বাংলাদেশ। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আখ্যান, সমসাময়িক রাজনীতি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নকশালবাড়ি আন্দোলন, ভারতীয় সমাজ কিছুই বাদ যায়নি। তার লেখা বই যেন একেকটা প্যাকেজ, একের ভেতর সব। পড়ার সময় মোহাচ্ছন্ন করে রাখে মানুষকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা!

সুনীলের সময়ে প্রেম ছিল সেলুলয়েডের ফ্রেমের মধ্যে। সময়মতো টিকিট কেটে একটা দেখে ফেলো, এবার চিঠি টিঠি কিছু পাঠিয়ে দাও, ব্যাস হয়ে গেল।

আমরা সবাই কখনো কখনো আমাদের জীবনটা আয়নার সামনে এনে দাঁড় করাই। আয়নাজীবন আর বাস্তব জীবন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে সমান হলে আমরা ভাবি, চমৎকার! এবার এই জীবনটা বন্দি করে রাখা যাক সোনার খাঁচায়।

তবে সোনার খাঁচার একটা দোষ আছে। বন্দী দিনগুলো কীভাবে কীভাবে যেন খাঁচার ফাঁক গলে পালিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজেও দুঃখ করেছিলেন এ নিয়ে। উপায় বের হলো- বইয়ের পাতায় যদি তাকে আটকে রাখা যায়, তবে বেচারা অতীতকে আর হাওয়ায় পাখা মেলতে না দিয়েই সেটা জনে জনে পৌঁছে দেওয়া যায়।

সে আটকে থাকা অতীত ভরা বইকে হয়তো ট্রাকে-বাসে করে ছাড়তে হয় দেশ। সে অতীত ভরা বইয়ে হয়তো ধূলো জমে। কিংবা তার হয়তো ঠাণ্ডা লাগে বৃষ্টিতে ভিজে। বা সে অতীত ভরা বইয়ের আবরণটা কখনো কখনো ছিঁড়ে যায়। বইকে হয়তো কেউ হরণ করে নিয়ে যায় রূপকথার রাজপুত্তুরের মতো। বা বিক্রি করে দেয় চোরাকারবারির মতো। তবে সে থাকে অক্ষত, সব সময়েই। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখায় সুনীল তার যে জীবনকে কালি দিয়ে লেপ্টে দিয়েছেন, সে জীবন জীবনানন্দের মতো দোয়েলের বা শালিকের নয়। সে জীবন এক কিশোরের, এক তরুণের, এক ভবঘুরে কবির, এক ব্যর্থ প্রেমিকের, এক পিতৃহীন সন্তানের, এক স্বামীর, এক পিতার, এক কালজয়ী লেখকের, আর এক হতভাগ্য লোকের- যার শেষ আস্ফালন- এটা আমার দেশ নয়! এটা আমার দেশ নয়!

সুনীলের সাহিত্যে প্রকৃতি-চেতনা এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। তার প্রকৃতি-চেতনা জন্ম নিয়েছে আবেগ আর স্মৃতি থেকে। এই আবেগের শেকড় লুকিয়ে আছে তার নিজের জীবনে। জন্ম মাদারীপুরের আমগ্রামে, পদ্মার কাছাকাছি এক গ্রামে। কিন্তু মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে যান। বাকি জীবন কাটে সেই শহরেই। তাই গ্রাম আর নদীর সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘ সম্পর্কের নয়। এটা বরং একরকম ভুলে-যাওয়া, নস্টালজিক টান। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার চেয়ে হারানোর বোধ থেকেই এটা বেশি তৈরি হয়েছে। এই হারানোর বোধ তার কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। ‘মনে পড়ে যায়’ কবিতায় লেখার সারমর্ম বেশ চমকপ্রদ। এক সময়ের নদী শুকিয়ে গেছে, মরে গিয়ে ভূত হয়ে গেছে। আগাছাভরা মাঠও হারিয়ে গেছে জনারণ্যের ভিড়ে। এখানে প্রকৃতি শুধু প্রেমের রূপক নয়। এটা সরাসরি একটা শোক-চিত্র—শহর যেভাবে গ্রামকে গিলে খেয়েছে, তারই ছবি। এর উৎস তার নিজের ছেলেবেলার হারানো গ্রাম, পদ্মাপাড়ের স্মৃতি। নীরাবিষয়ক কবিতাগুলোতেও নদী, মেঘ, বৃষ্টি বারবার আসে। কিন্তু সেখানে প্রকৃতি মানুষের প্রেম আর বিষাদের ভাষা হয়ে ওঠে। প্রকৃতি সেখানে স্বতন্ত্র বিষয় নয়!

কবির গদ্যে পরিবেশ চেতনা আরো স্পষ্ট রূপ পায় অপূর্ব মহিমায়। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ উপন্যাসে চার শহুরে তরুণ জঙ্গলে যায়। এটা আসলে সভ্যতা আর প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড় করানো। বনের নির্জনতার সামনে শহরের কৃত্রিমতা আর ভণ্ডামি ফিকে হয়ে যায়। এখানেই তার প্রকৃতি-চেতনার আসল লক্ষ্য বোঝা যায়। প্রকৃতি এখানে মানুষকে নিজের সত্যের মুখোমুখি করার একটা আয়না। ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসেও বাংলার নদী, গ্রাম, ঋতু এসেছে। কিন্তু সেখানেও এগুলো পটভূমি, ইতিহাসকে জীবন্ত করার একটা উপায়। সব মিলিয়ে বলা যায়, সুনীলের প্রকৃতি-চেতনা ছিল নান্দনিক আর স্মৃতিতাড়িত। এটা মানুষকেন্দ্রিক এক চেতনা, সরাসরি পরিবেশ বাঁচানোর ডাক নয়! নিজের হারানো শেকড়রে বেদনা থেকে জন্ম নিয়ে এটা হয়ে উঠেছে নাগরিক জীবনের বিপরীতে দাঁড় করানো একটা আয়না।

‘ঘর’ কবিতায় প্রকৃতির সান্নিধ্যে সবসময় থাকতে চেয়েছেন সুনীল। স্বপ্ন দেখেছেন প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার। তার ভাষায়- ‘পাহাড় সমুদ্র আর অরণ্যের স্তব লিখে লিখে/ক্লান্ত এক কবি আজ ঘুমিয়েছে একলা ছোট ঘরে, …।’ বহু কবিতায় এসেছে নীরার কথা। নীরা, প্রকৃতি ও প্রেম যেন এক সূতোয় গেঁথেছেন। তার একটি বিখ্যাত কবিতা ‘গহন অরণ্যে’। এ কবিতায় কবি গহিন অরণ্যে একা যেতে চাননি। তার ভাষায়— ‘গহিন অরণ্যে আর বারবার একা যেতে সাধ হয় না-/ শুকনো পাতার ভাঙা নিঃশ্বাসের মতো শব্দ/তরুলতা, বাঁশের ছায়া, শালের বল্লরী।’ কবির সম্পাদনা করা- ‘মেঘ বৃষ্টি আলো’, ‘ময়ূর পাহাড়’, ‘প্রবাসী পাখি’, ‘সমুদ্রতীরে’, ‘জোছনাকুমারী’, ‘বসন্ত দিনের খেলা’, ‘দুই বসন্ত’, ‘সমুদ্রের সামনে’, ‘একটি মেয়ে অনেক পাখি’, ‘নদীর পাড়ে খেলা’, ‘বসন্ত দিনের ডাক’সহ বহু লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে প্রকৃতি ও প্রেমের প্রসঙ্গ। ২৩ অক্টোবর ২০১২ সালে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা লেখক অনন্ত অসীমে যাত্রা করেন।

আকাশের তারায় তারায় লুকিয়ে তিনি নিশ্চয় দেখছেন, অগুণতি মানুষ বলছে– শুভ জন্মদিন!


লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সাহিত্যিক