ইউরোপ যাওয়ার জীবন-মরণ ‘গেম’—খেলোয়াড়ের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী থাকবেন না

বিশাল সমুদ্রের বুক চিরে এগোচ্ছে মানুষবোঝাই এক নৌকা। কোন দিকে যাচ্ছে, কেউ জানে না, পথ হারিয়েছে। কারও কিছু বলার বা করার এতটুকুও শক্তিও অবশ্য নেই। খাবার আর পানি ফুরিয়েছে পাঁচ-ছয় দিন আগেই। এদেরই মধ্যে হাজার হাজার মাইল দূরের বাড়ি ছেড়ে আসা ক্ষুধায়-পিপাসায় কাতর ২০ বছরের এক যুবক হয়তো বুঝে গেল, এই ‘গেম’ তার আর জেতা হলো না। তীব্র পিপাসায় গলায় সে ঢেলে দিল বিষাক্ত ডিজেল, ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। ‘গেম’ দিয়ে স্বপ্নের ইউরোপ যেতে চাওয়া আরও গোটা বিশেক মানুষেরও একই পরিণতি হলো। তাদের মৃতদেহগুলো ভাসিয়ে দেওয়া হলো ভূমধ্যসাগরের অতলান্ত স্রোতে।
নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস—কবিগুরুর এ লাইন হয়তো ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশী, সমুদ্রপথে ‘গেম’ দিয়ে জীবন হারাতে যাওয়া তরুণদের জন্য সবচেয়ে প্রযোজ্য। পরিবারের সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে বা সর্বস্ব জমা রেখে, ধার করে টাকা জোগাড় করে ইউরোপ যেতে চান তারা। জীবন হারানোর প্রবল ঝুঁকি রয়েছে, সেটি তাদের অজানা নয়। তারপরও দালালের কথায়, কিংবা ‘একবার ইতালি যেতে পারলেই হয়’—এমন তীব্র বাসনায় তারা ছুটে যান। তাদের অনেকেই সেখানে শেষটায় লক্ষ্যে যেতে পারেন না। নদী নয়, সমুদ্রের ওপারে সব সুখ খুঁজতে গিয়ে পরিণতি—সমুদ্রেই বিদায়।
স্বপ্নের ইউরোপে পাড়ি জমানোর আশায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা দালালদের সঙ্গে চুক্তিতে যায়, যাকে বলা হয়—বডি কন্ট্রাক্ট। এটা হলো অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশ হয়ে ইউরোপ পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি। সহজ করে বললে, দালাল শুধু ইউরোপ যেতে চাওয়া ব্যক্তির শরীর বা ‘বডি’ পার করে দেবে, আর কোনো ধরনের সহায়তা থাকবে না। এভাবে যেতে চাইলে অবৈধ বিভিন্ন পথ এবং পদ্ধতিই তো অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ইউরোপ পৌঁছে দেওয়ার জন্য দালালরা কিছু ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক জায়গা ভূমধ্যসাগর ও ‘গেমঘর’(দালালের বন্দিশালা)। পুরো যাত্রায় খাবারের অভাব, দালালের নির্যাতন, সাগরে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা অহরহই ঘটে।
সম্প্রতি এমন মৃত্যুর সংবাদ এসেছে ভূমধ্যসাগরের গ্রিস উপকূল থেকে। সেখানে একটি রাবারের নৌকায় অন্তত ২২ অভিবাসী মারা যান। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে গ্রিসের কোস্টগার্ড এক বিবৃতিতে জানায়, মৃতদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি। নৌকায় যাত্রাপথে তারা দিক হারিয়ে ফেলেছিলেন। ছয় দিন ধরে পানি ও খাবার ছাড়া সমুদ্রে ছিলেন। পরে দালাল ২২ জনের লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেয়।
বাংলাদেশি মৃতদের একজন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের যুবক ইজাজুল হক। তার বাবা সামছুল হক বলেন, দুলাল মিয়ার (দালাল) মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ৩ মাস আগে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সব টাকা পরিশোধ করা হলেও গ্রিসে পাঠাতে দেরি করতে থাকে দালাল। আমার ছেলে ঈদের আগে ভয়েস মেসেজে জানায়, ‘দালাল আমাদের খাওয়াদাওয়া দিচ্ছে না। বড় কষ্টে আছি। দোয়া করিও।’ এরপর আমার ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি।
একই ঘটনায় মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামের আরেক যুবক শায়েক আহমেদ। তার বাবা আখলুছ মিয়ার বরাতে জানা যায়, তার ছেলে দালাল আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে গ্রিসে যেতে চার মাস আগে বাড়ি ছাড়েন। প্রথমে দালালকে সাড়ে চার লাখ টাকা দেন তিনি। সৌদি আরব, কুয়েতসহ আরও কয়েক দেশ ঘুরে লিবিয়া পৌঁছেন শায়েক। পরে আরও সাড়ে ৭ লাখ টাকা দাবি করেন দালাল। গরু বিক্রি করে সেই টাকা দেন শায়েকের বাবা। গত শনিবার (২৯ মার্চ) গ্রিসে থাকা এলাকার আরেক তরুণ সোহেল আহমদ ফোন করে শায়েকের মৃত্যুর বিষয়টি জানান। (সূত্র: এশিয়া পোস্ট, ২৯ মার্চ, ২০২৬)
ভূমধ্যসাগরে রেকর্ড মৃত্যু
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী–চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৫৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ভূমধ্যসাগরে মারা গেছেন; যা গত বছর ছিল ২৮৭ জন। কিন্তু মৃতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি দাবি করেছে ইনফো মাইগ্রেন্টস।
অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা এ সংস্থা বলছে—ইতালি, তিউনিসিয়া এবং মাল্টা বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন রুটে উদ্ধার ও জাহাজডুবির তথ্য গোপন করেছে। তথ্য যাচাই করতে না পারায় এ ঘটনা নিয়ে কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেননি সাংবাদিকরা।
এ প্রসঙ্গে ইতালির আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের অভিবাসন ও তথ্যবিষয়ক গবেষক মাত্তেও ভিল্লা বলেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানুয়ারির শেষ থেকে সতর্কবার্তা দেয়–ঘূর্ণিঝড় হ্যারির পর এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করেনি কিংবা অস্বীকার বা সংশোধনও করেনি। এটা নীরবতার কৌশল।
তিউনিসিয়া ও লিবিয়ার সঙ্গে ইতালির চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে তারা ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রাখতে পারে। তবে তা দালাল চক্রকে শক্তিশালী করছে মনে করেন সমুদ্রপথে অভিবাসনবিষয়ক গবেষক আর্নো বানো। তিনি বলেন, চুক্তির ফলে দালালচক্র অভিবাসনের জন্য ব্যবহৃত শহর ও বন্দরগুলো থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের। ইউরোপে প্রবেশের স্থলপথ; যেমন বলকান রুট, প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ। তাই সমুদ্রপথই একমাত্র অবশিষ্ট রুট। এই ক্রসিংগুলো দীর্ঘ; যে কারণে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবল বাতাস ও স্রোতের মুখোমুখি হতে হয়। (সূত্র : ইনফো মাইগ্রেন্টস, ১৮ মার্চ, ২০২৬)
নরকের করিডোর লিবিয়া
এ তো গেল ভূমধ্যসাগরে মৃতদের নিয়ে আর্তনাদ, যাদের লাশ পরিবারের কাছে পৌঁছায় না; ভাসিয়ে দেওয়া হয় সাগরে। কারও কারও লাশ পরিবার পায়, খবরও জানতে পারে মারা যাওয়ার অনেক পরে। তাতে অবশ্য পরিবার ছাড়া আর কারও হয়তো বিশেষ ভাবনাচিন্তারও অবকাশ হয় না। অনেকটা যেন লিংকিন পার্কের গানের মতো – ‘হু কেয়ার্স ইফ ওয়ান মোর লাইট গোজ আউট?’ একে একে অনেক প্রাণই তো এভাবে নিভে যায়। এই ‘গেম’ এর মরণখেলায় সমুদ্র ছাড়াও আরও অনেক জায়গাতেই প্রাণ হারায় অনেকে। ‘লিবিয়া’ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম এক নাম।
বেশিদিন আগে নয়; মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। লিবিয়ায় গেমঘরে দালালের নির্যাতনে মারা যান বাংলাদেশি দুই যুবক। মৃত্যুর কয়েকদিন পর স্থানীয় দালাল পরিবারকে সে খবর দেয়। তাদের একজন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ জনারদন্দি এলাকার কালাম হাওলাদারের ছেলে ইলিয়াস হাওলাদার। গত বছরের আগস্টের শুরুতে কাতার থেকে দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় যান ইলিয়াস। সেখানে গেমঘরে ইলিয়াসকে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কয়েক দফায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় দালাল। গত ২৩ মার্চ নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান ইলিয়াস। মৃত্যুর চার দিন পর রাতে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ইলিয়াসের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বিনতিলুক এলাকার আরেক যুবক ফারুক হাওলাদার লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মারা গেছেন ১৮ মার্চ। পরিবার ফারুকের মৃত্যুর খবর পেয়েছে ২৫ মার্চ। তাকে গেমঘরে আটক রেখে তার পরিবারের কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তাকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে নেওয়ার কথা থাকলেও নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে। (সূত্র : এশিয়া পোস্ট, ২৯ মার্চ, ২০২৬)
এই দুই যুবকের মতো দালালের নির্যাতনে মৃত্যুর খবর নতুন নয়। গত কয়েক বছরে অনেক যুবক লিবিয়ায় দালালের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; যা বহুবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মানিকদী পূর্বকান্দা গ্রামের দিপু মিয়ার ঘটনা।
৯ লাখ টাকায় ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দিপুকে লিবিয়া পাঠান স্থানীয় এক দালাল। সেখানে দালালের বন্দিশালায় তাকে আটকে রাখা হয় ১ বছর ১০ মাস। কয়েক দিন পরপর মুখে কাপড় বেঁধে দিপুর ওপর চালানো হতো নির্যাতন। ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো হতো পরিবারকে। পরিবার থেকে টাকা দিলে থামত নির্যাতন। এভাবে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়৷ (সূত্র: প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট ২০২৫)
‘লিবিয়ার ফাঁদে’ কেন বাংলাদেশিরা– এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর জানার জন্য দেখা যেতে পারে বাংলাদেশিদের নিয়ে মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার প্রকাশিত চলতি বছরের ৫ মার্চের প্রতিবেদটি। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২০ সাল থেকে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে আসা শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে আছে বাংলাদেশিরা। ২০২২ সাল থেকে ইতালিতে প্রতি বছর ১২ থেকে ১৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অবৈধভাবে প্রবেশ করেন। ২০২৫ সালে ইতালিতে আসা অবৈধ অভিবাসীদের ৩১ শতাংশ বাংলাদেশি।
এ বিষয়ে মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার পরিচালক ব্রাম ফ্রাউস বলেন, অনেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। যাত্রাপথে বা গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তারা জানতে পারেন–তাদের যে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অস্তিত্ব নেই। তখন দালালরা লিবিয়া বা লিবিয়া হয়ে ইতালিতে গিয়ে কাজের পরামর্শ দেয়। এ জন্য পারমিট বা ভিসা করে দেওয়ার অজুহাতে অনেকের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। এরপর চুক্তির চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে দালালরা।
ফ্রাউস বলেন, একজন ব্যক্তি হয়তো কাজের জন্য পরিকল্পনা করে অভিবাসন শুরু করেন। কিন্তু যাত্রাপথে কোনো একসময় পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। তখন তাদেরকে আসলে ইউরোপের দিকে যাত্রা করতে বাধ্য করা হয়।
কী বলছে আইওএম
চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি আইওএমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৬৬৭ অভিবাসনপ্রত্যাশী যাত্রাপথে মারা গেছেন।
অভিবাসীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা দালালচক্র ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এমন মৃত্যুর কারণ বৈশ্বিক ব্যর্থতা। এই মৃত্যুগুলো অনিবার্য নয়।
নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন যাত্রা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অনিশ্চয়তায় পড়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা দালালচক্রের কাছে বাধ্য হচ্ছেন। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবাইকে পদক্ষেপ নিতে হবে।