logo
Advertisement

শিক্ষকের পরিচয় ও আত্মমূল্যায়ণ

ড. মোঃ সাখাওয়াত হোসেন
ড. মোঃ সাখাওয়াত হোসেন
শিক্ষকের পরিচয় ও আত্মমূল্যায়ণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

শিক্ষকরা জাতির বিবেক, মানুষ গড়ার কারিগর। কোন কিছু গড়তে হলে, সৃষ্টি করতে হলে প্রয়োজন দক্ষ ও বিবেকবান কারিগরের। এঁদেরই অবদানে বিদ্যমান পৃথিবীর সকল অমর সৃষ্টি। পার্সিডেল রেন বলেন ‘ শিক্ষক শুধু খবরের উৎস বা ভান্ডার নন, কিংবা প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার তথ্যসংগ্রহকারী নন; শিক্ষক শিশুর বন্ধু, পরিচালক ও যোগ্য উপদেষ্টা; একজন সুদক্ষ শরীর গঠনকারী, শিশু মনের বিকাশ সাধনের সহায়ক তথা তাদের চরিত্র গঠনের নিয়ামক” ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন “ একজন আদর্শ শিক্ষককে হতে হবে দীক্ষায় ও দর্শনে,কথায় ও কর্মে এক। বচনে ও আচরণে যে এক নয় সে শিক্ষক হবার যোগ্য নয়।”

শিক্ষার উপর নির্ভর করে গড়ে উঠে জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি। জাতির এ ভবিষ্যৎ ভিত্তি গঠনে আদর্শ শিক্ষকের বিকল্প নেই। দক্ষ জাতি গঠনে আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার মূখ্য ভূমিকা পালন করে শিক্ষকগণ। প্রফেসর আব্দুল মমিন চৌধুরী “শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষাঙ্গন’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, আর শিক্ষার মেরুদন্ডও শিক্ষক। মেরুদন্ড যদি সবল না হয়, তাহলে শিক্ষাদান প্রক্রিয়া দুর্বল হতে বাধ্য।”

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ পেশায় যাঁরা নিয়োজিত আছেন তাঁরাই হলেন শিক্ষক। বোর্ড -বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন স্তরে (প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক হিসেবে চাকুরীতে নিয়োজিত থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করে, সমাজ তাঁকে শিক্ষক বলে। শিক্ষক হচ্ছেন সুন্দর মন ও সুন্দর জীবন সৃষ্টির সুনিপূণ কারিগর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘গায়ের জোরে আর যা হওয়া যায় বটে; কিন্তÍু গুরু হওয়া যায় না।” ভাষাবিজ্ঞানী ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন “তুমি শিক্ষক হতে চাও ভাল কথা; মনে রেখো, তুমি সারা জীবনের জন্য ছাত্র হলে।” অর্থাৎ শিক্ষকতার পেশায় নিজেকে জড়িত করতে গেলেই সারাজীবনের জন্য ছাত্রত্ব বা অধ্যয়নকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে নিতে হবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীর কাছে সর্বদা আচার ব্যবহার, ব্যক্তিত্ব এবং আদর্শ রুচিবোধের সূচক হিসেবে অবস্থান করে তাদের জীবনকে সুন্দরভাবে উজ্জীবিত করার সামগ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। দাম্ভিকতাপূর্ণ তর্জন গর্জন কিংবা রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে কলুষিত ব্যক্তির এ মহান পেশায় দায়িত্ব গ্রহণ সাজে না।

শিক্ষক এর সংজ্ঞা প্রদান করতে গেলে ‘শিক্ষক’ বাংলা শব্দটির সাথে ইংরেজি প্রতিশব্দ ( TEACHER ) এর বিশ্লেষণ করলে শিক্ষক এর পরিচয় পাওয়া যাবে। নিম্নে শিক্ষক শব্দটির বাংলা ও ইংরেজি শব্দের আক্ষরিক বিশ্লেষণ দেয়া হলো। শিক্ষক নামের বাংলা আক্ষরিক বিশ্লেষণ যেমন- ‘শিক্ষক’ শব্দটি শি-ক্ষ-ক বর্ণ নিয়ে গঠিত, যার অর্থ -

শি = শিক্ষণ বা শেখা বা প্রশিক্ষণ বা শাসক।

ক্ষ = ক্ষমতাধর বা ক্ষমাশীল বা ক্ষমা।

ক = কর্মঠ বা কৌশলী বা কৌতুূহলী।

সুতরাং শিক্ষক হতে গেলেই ব্যক্তির মাঝে প্রথমে বিষয়গত জ্ঞানে (শিক্ষণীয় বিষয়) অগাধ ক্ষমতাধর হতে হবে এবং তার পাশাপাশি কৌতুহলী বা কৌশলী হতে হবে। শিক্ষার্থীদের শাসন করার মতো সুন্দর প্রশিক্ষণ সহ ক্ষমাশীল সুন্দর মহানুভবতাও থাকতে হবে।

অন্যদিকে ‘শিক্ষক’ বাংলা শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ( TEACHER ) এর বিশ্লেষণ করলে শিক্ষক এর পরিচয় পাওয়া যাবে এ ভাবে যেমন- ( TEACHER )

T = Talented (প্রতিভাধর)

Tacful (কৌশলী)

Trained (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত)

Truthful (সত্যবাদী)

E = Expert (দক্ষ)

Earnest (আন্তরিক)

Energetic (উদ্যমশীল)

A = Aesthetic (রুচিশীল)

Active (কর্মঠ)

Artist (শিল্প)

Adminstrator (প্রশাসক)

C = Careful (যত্নশীল)

Competent (যোগ্য)

Creative (সৃজনশীল)

Chaste (চরিত্রবান)

H = Honest (সৎ)

Humorist (রসিক)

Helper (সাহায্যকারী)

Healthy (স্বাস্থবান)

E = Emotional (আবেগদীপ্ত)

Eloquent (বাকপটু)

Editor (সম্পাদক)

Evaluator (মূল্যায়ক)

R = Reader (পাঠক)

Reliable (নির্ভরযোগ্য)

Responsible (দায়িত্বশীল)

Researcher (গবেষক)

সুতরাং উপরে উল্লেখিত গুণাবলী যার মধ্যে বর্তমান থাকবে তিনি অবশ্যই সমাজের মধ্যে একজন সফল শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন, যার ফলে আমাদের দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্যের অবসান ঘটবে এবং জীবনে আসবে স্বস্তি ও সম্মান।

আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যিনি শিক্ষা দান করেন তিনিই হলেন শিক্ষক । অর্থাৎ যে ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নিকট নিজের সঞ্চিত জ্ঞানভান্ডার উপস্থাপন করে থাকেন তিনিই সমাজে শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃত। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ পেশায় যাঁরা নিয়োজিত আছেন তাঁরাই হলেন শিক্ষক। শিক্ষক সমাজের একজন আদর্শ প্রতিনিধি। তাঁর উপর সমাজ বিনির্মাণের দায়িত্ব অর্পিত হয়। শিক্ষকের শিক্ষাদান ব্যবস্থায় অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে অগণিত শিক্ষার্থী পুরাতন সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে ঢেলে সাজিয়ে নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তন করে থাকে। কাজেই শিক্ষক হলেন নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তনের রূপকার এবং প্রধান প্রকৌশলী। তাঁকে বাদ দিয়ে সমাজ বা জাতীয় উন্নয়ন চিন্তা কারা সম্ভব নয়, যার উপর ভিত্তি করে সমাজের শিক্ষার মান উন্নত হয়।

শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম উপাদান হচ্ছে শিক্ষক। শিক্ষা পরিকল্পনাকে সার্থক রূপায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা বিশেষ গুরত্বপূর্ণ। যিনি শিক্ষাদান করেন বা নিজেকে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত রাখেন তিনি হলেন শিক্ষক। আর শিক্ষকতা হলো মহান সামাজিক পেশা। শিক্ষাকতার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করার জন্য তাঁকে বহু গুণে গুণান্বিত হতে হবে, যে গুণের সমষ্টি ধারণকারী ব্যক্তিকে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে অভিহিত করতে পারি। এ আদর্শ শিক্ষকই দেশ ও জাতির উন্নয়নে সমাজের বলিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। ইংরেজিতে একটি কথা আছে “A good teacher is he, who teaches better the learners and has a good character.” অর্থাৎ “একজন ভাল শিক্ষক হলেন তিনি, যিনি শিক্ষার্থীদের ভাল শিক্ষাদান করেন এবং যার মধ্যে উত্তম চরিত্র বর্তমান রয়েছে।” সুতরাং আদর্শ শিক্ষকগণের পরিচয় হলো-

০১) একজন আদর্শ শিক্ষকের আধুনিক শিক্ষার তত্ত্ব ও পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে (Good at explaining thing) এবং বিষয়ের পাঠদানের পূর্বে এর সাথে সম্পর্কিত অন্য কিছু উদাহরণ হিসাবে পেশ করেন।

০২) শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক উপযুক্ত শিক্ষাগত ও বিষয় পাঠদানের যোগ্যতা থাকতে হবে এবং যে বিষয়ে পড়ানো হয় সেই বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের বই এর কথা v Reference হিসাবে উল্লেখ করতে হবে (Have Command on Teaching Subject)

০৩) শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের সময় শিক্ষকের সকলের প্রতি লক্ষ্য রাখা। (Keep their cool.) এজন্য শিক্ষক সকলের প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং বিভিন্নজনকে প্রশ্ন করা।

০৪) ছাত্র ছাত্রীদের আস্থায় রেখে শাসনে ভারসাম্য থাকা এবং সকল ছাত্র ছাত্রীকে শিক্ষক সমান দৃষ্টিতে দেখবে। যেমন শাসন করার ক্ষেত্রে, উত্তর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে।

০৫) আদর্শ শিক্ষক তিনি শিক্ষার্থীদের কর্মতৎপরতায় সকলের প্রতি মানবিকতা দেখাবেন। মানবিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা এবং সুবিধা অসুবিধা গুলো বিবেচনা করা।

০৬) সামাজিক পরিবর্তনশীলতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ভারসাম্যপূর্ণ জ্ঞান থাকা। ছাত্র ছাত্রীদেরকে কিভাবে কতটুকু কত সময় ধরে পড়াতে হবে এটা তাৎক্ষনিকভাবে বুঝতে পারা।

০৭) একজন আদর্শ শিক্ষকের সুন্দর উচ্চারণ উন্নত বাচনভঙ্গি, সুস্পষ্ট কণ্ঠস্বর থাকতে হবে।

০৮) শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের পছন্দের প্রতি গুরুত্ব দিবেন । শিক্ষার্থীরা সহজেই শিক্ষকের নিকট আসতে পারে এবং তাদের কথা বলার সুযোগ থাকে।

০৯) শিক্ষার উপকরণের প্রকারভেদ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারবিধি আয়ত্তে থাকতে হবে।

১০) একজন আদর্শ শিক্ষকের স্মৃতিশক্তির প্রখরতা থাকা চাই। ছত্র-ছাত্রীদের চেহারা ও নাম চিনতে পারা এবং প্রয়োজনে নাম ধরে ডাকতে পারা।

১১) আদর্শ শিক্ষকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শারীরিক, মানসিক সুস্থ থাকা।

১২) আদর্শ শিক্ষক সকল পর্যায়ে সময়ের সঠিক ব্যবহার, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সর্বাধিক কার্য সঠিকভাবে সম্পাদন করবে।

১৩) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পরিবেশ থেকে নানা ধরনের আচার, আচরণ ও অভ্যাস নিয়ে আসে। অনেকে খুব মেধাবী কেউ কম মেধাবী, কেউ হয়ত বাবার অতি আদরের সন্তান, কেউ একটুু অভিমানী, কেউ বা জটিল। শিক্ষার্থী যে পরিবেশ বা অবস্থা থেকে আসুক না কেন সেগুলো শিক্ষক অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে, সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে, বন্ধুর মত আচরণ করে সুকৌশলে শিক্ষা দেবেন।

শিক্ষাবিদ গিলবার্ট হেইট এর মতে একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি যথা-

০১) শিক্ষার্থী প্রীতি ঃ শিক্ষার্থীর প্রতি তার স্নেহ, মমতা, দরদ ও ভালবাসা থাকতে হবে। ফলে শিক্ষার্থী শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে সক্ষম হবে।

০২) বিষয় প্রীতি ঃ শিক্ষক যে বিষয় পড়ান সে বিষয়ের জ্ঞান অর্জনে তাঁর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ফলে শিক্ষার্থী অতি সহজে বিষয়টির প্রতি আকৃষ্ট হবে।

০৩) পেশা প্রীতি ঃ একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন তাঁর পেশার শ্রদ্ধাশীল। যে শিক্ষক পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে ব্যর্থ হবেন সে কখনও শিক্ষক হতে পারবেনা। কাজেই শিক্ষক পেশাকে মানে প্রাণে ভালবাসতে হবে।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড আর শিক্ষক হলেন শিক্ষার মেরুদন্ড, জাতির দিকনির্দেশক। সামাজিকভাবে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ড হাতে নিয়েছে, যা সামাজিক পেশা হিসেবে পরিচিত। আর শিক্ষাকতা হলো একটি মহান সামাজিক পেশা । এ পেশার সফলতা ও সার্থকতা নির্ভর করে শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা, যোগ্যতা, ব্যক্তিগত গুনাবলী, বুদ্ধি, বিচার কৌশল এবং ব্যক্তিত্বের প্রসারতার উপর। শিক্ষক হলেন শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্র বিন্দু। তাঁকে কেন্দ্র করেই শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর অর্পিত হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান কৌতুহল তাঁকে কেন্দ্র করেই প্রসারিত হয়। সুতরাং তাকে বাদ দিয়ে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপূর্ণতা আসতে পারে না। কাজেই শিক্ষক যদি তাঁর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারেন তবে শিক্ষকতার পেশার সুনাম কখনও অম্লান রাখা সম্ভব নয়। শিক্ষক সমাজেরই অংশ বা প্রতিনিধি। সমাজ উন্নয়নে সমাজের বলিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষক মূখ্য দায়িত্ব পালন করে থাকেন। একজন আদর্শ শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীদের সর্বতোমুখী বিকাশ সাধনের সহায়ক হতে পারেন, তেমনি একজন অযোগ্য শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাময় প্রতিভার অকাল মৃত্যু ঘটিয়ে তার ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে পারেন। নিম্নে আদর্শ শিক্ষকের গুণাবলী উপস্থাপন করা হলো-

০১) বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ জ্ঞানের নতুনত্ব, জ্ঞানের দিগন্তে শিক্ষার্থীদের মাঝে উন্মোচন করা শিক্ষকের একটি বিশেষ দায়িত্ব। সমাজ ও জীবনের পরস্পর পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আদর্শ শিক্ষককে সব সময় বিষয়ভিত্তিক গবেষণামূলক জ্ঞান ও উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। শিক্ষক যদি প্রাচীনপন্থী এবং রক্ষণশীল মনোভাবের অধিকারী হন, তাহলে আধুনিক পদ্ধতি ও ভাবধারা অনুযায়ী শিক্ষাদান কার্য পরিচালনা তাঁর দ্বারা সম্ভব নয়। কারণ গবেষণা মূলক জ্ঞান দ্বারা নতুনকে বরণ করে নিয়ে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চালার জন্য গবেষণামূলক জ্ঞান অর্জনে বেশী লেখকের বিভিন্ন রকমের বই পড়তে হবে। অন্যান্য অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। সেমিনার প্রশিক্ষনে অংশ গ্রহন করতে হবে। ফলে আদর্শ শিক্ষক জ্ঞানের নতুনত্ব অর্জন করে শিক্ষর্থীদের অজানা বিষয় তাদের সামনে তুলে ধরতে পারবে।

০২) ব্যক্তিত্বঃ শিক্ষককে সুসমন্বিত মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। তাঁর আচরণে এবং চিন্তাভাবনায় একটা সুসংহত রূপ থাকবে। খামখেয়ালী ভাব বা অস্থিরচিত্ততা শিক্ষকের শিক্ষাদানকে পদে পদে ব্যর্থতায় ভরে তোলে। শিক্ষকের ব্যক্তিত্বের প্রভাব শিক্ষার্থীর মনে যুগপৎ প্রীতি ও শ্রদ্ধার ভাব জাগায়। শিক্ষার্থীরা সচেতন বা অবচেতনে সর্বদাই শিক্ষকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। আর এ প্রভাব এত গভীর হয় যে, আজীবন তা সুস্পষ্টরূপে অনুভূত ও পরিলক্ষিত হয়। তখন একজন ভাল শিক্ষক সহজেই শিক্ষার্থীকে জ্ঞান দান করতে পারেন। ব্যক্তিত্বহীন শিক্ষক সবার নিকট হেয় প্রতিপন্ন হন। তাই আদর্শ শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব হবে প্রীতিময়, সৌহার্দ্যভিত্তিক ও আকর্ষণীয়।

০৩) প্রফুল্লতা ও হাসিমুখিঃ আদর্শ শিক্ষকের অন্যতম গুণ হল প্রফুল্লতা ও হাসিমুখি ভাব। প্রতিকূল পরিবেশে অবদমিত না হয়ে পরিবেশকে আয়ত্ব করা, মনে সাহস ও আশা রাখা এবং যে কোন পরিস্থিতিতে হাসিখুশিভাব বজায় রাখা।

০৪) দায়িত্বশীলঃ শিক্ষাদানে আদর্শ শিক্ষক হবেন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। শিক্ষক যদি দায়িত্বশীল না হন বা দায়িত্ব পরিহার করে চলার মনোভাব পোষণ করেন, তবে সেই শিক্ষক দ্বারা কখনও শিক্ষাদান কার্য চলতে পারে না। এবং শিক্ষার্থীরা কোনরূপ উপকৃত হবে না। সেজন্য আদর্শ শিক্ষকের আচরণ, মন্তব্য, চিন্তাধারা, মনোভাব প্রভৃতি যথেষ্ট সংযত এবং সুনিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় শিক্ষার্থীর বিকাশোন্মুখ ব্যক্তিসত্ত্বা ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে।

০৫) সুস্বাস্থ্যঃ সুস্বাস্থ্য হচ্ছে আদর্শ শিক্ষকের আকর্ষণীয় গুণ। স্বাস্থ্যহীন বা সদা-অসুস্থ শিক্ষক কখনও সন্তোষজনকভাবে শিক্ষা দিতে ও শিক্ষার্থীদের সুবিচার করতে পারেন না। সুতরাং দৈহিক এবং প্রাণশক্তিসম্পন্ন শিক্ষকের কাজের মধ্যে আশাবাদ, উৎসাহ উদ্দীপনা প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।

০৬) সহজ, সরল অমায়িকঃ শিক্ষক হবেন সব সময় সহজ, সরল অমায়িক। তাহলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সাথে মিশতে পারবে। শিক্ষক যদি গুরুগম্ভীর এবং কঠোর মনোভাপন্ন হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষকের সঙ্গে কখনও মিলতে পারবেনা। এবং তাকে সব সময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে। নিজেদের অসুবিধা বা সমস্যা কখনও তারা সেই শিক্ষকের নিকট প্রকাশ করবে না। উপরন্তু উক্ত শিক্ষকের প্রতি একটা বিরূপ এবং অনীহাভাব শিক্ষার্থীরা সব সময় পোষণ করবে যা শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে।

০৭) কণ্ঠস্বরঃ শিক্ষাদানে কণ্ঠস্বর একটি মুল্যবান উপাদান। সুমধুর এবং সুন্দরভাবে উঠানামা করতে পারে এমন স্বরই শিক্ষাদনের জন্য উৎকৃষ্ট। শক্তিসম্পন্ন কর্কশ স্বর বা গ্রামসম্পন্ন স্বর সর্বদা পরিহার করা উচিত। আবার ক্ষীণ ও নি¤œস্বরর কাম্য নয়। কারণ এরূপ স্বরের মধ্যে কোন প্রকার দৈহিক শক্তি, বেগ বা দৃঢ়তা প্রকাশ পায় না। নীরস বা কাঠখোট্রা স্বর খ্বু তাড়াতাড়ি ছাত্রদের ক্লান্ত করে তোলে এবং এর মধ্যে ছাত্ররা কোন প্রকার আর্কষণ অনুভব করে না। অপর পক্ষে সুন্দর কণ্ঠস্বর একজন শিক্ষকের কৃতকর্মে সফলকাম হতে সাহায্য করে।

০৮) বাচনভঙ্গি ও কথায় আঞ্চলিকতা না থাকাঃ শিক্ষকের বাচনভঙ্গি সুন্দর, স্পষ্ট এবং আকর্ষণীয় হওয়া আদর্শ শিক্ষকের অন্যতম গুণ। অনেক কিছু জানা সত্বেও বাচনভঙ্গির অভাবে কথায় আঞ্চলিকতা থাকায় নিজের মনোভাব ছাত্রদের নিকট উপস্থাপিত করতে পারেন না। বাচনভঙ্গি সুন্দর এবং স্পষ্ট না হলে ছাত্ররা শিক্ষকের বক্তব্য বুঝতে পারে না। ফলে শিক্ষকের প্রতি তাদের কোন আকর্ষণ থাকে না।, পাঠে মন বসে না এবং ক্লাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টায় রত থাকে। সুতরাং কথার মধ্যে আঞ্চলিকতা পরিহার করে স্পষ্টভাবে কথা বলতে হবে।

০৯) উন্নত চরিত্রঃ শিক্ষককে উন্নত সৎচরিত্রের অধিকারী হতে হবে। সরল, সৎ, অকপটচিত্ত, ন্যায়পরায়ণ, কর্তব্যপরায়ণ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী না হলে শিক্ষক শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হবেন না। শিক্ষক যে উপদেশ দেন তা যদি তিনি বাস্তবে অনুসরণ না করেন, তবে ছাত্রদের নিকট তাঁর উপদেশের কোন মূল্য থাকবে না। শিক্ষকের নিকট সুবিচার পাবে বলে যদি ছাত্রদের বিশ্বাস না থাকে, তবে তারা কখনও উক্ত শিক্ষকের নেতৃত্ব মেনে নেবে না।

১০) প্রগতিশীলতাঃ সমাজ ও জীবনের পরস্পর পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আদর্শ শিক্ষককে সব সময় প্রগতিশীল মনোভাবের অধিকারী হতে হবে। শিক্ষক যদি প্রাচীনপন্থী এবং রক্ষণশীল মনোভাবের অধিকারী হন, তাহলে আধুনিক পদ্ধতি ও ভাবধারা অনুযায়ী শিক্ষাদান কার্য পরিচালনা তাঁর দ্বারা সম্ভব নয়। কারণ নতুনকে বরণ করে নিয়ে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলাই প্রগতি।

১২) পরীক্ষা সম্পর্কে জ্ঞানঃ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের কাজের ধারা পরীক্ষা বা মূল্যায়ণের পদ্ধতির আনেক পরিবর্তন হয়েছে। পাঠের বিষয়বস্তুর শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পরিমাপের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা ও মূল্যায়ণের ধারা পদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে অবহিত হতে হবে।

১৩) শিক্ষামূলক উপকরণ ব্যবহারঃ আধুনিক শিখন পদ্ধতিতে শিক্ষককে শিক্ষার বিভিন্ন ধরণের উপকরণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারবিধি জানা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে শিক্ষক ফলপ্রসূ পাঠদানে ব্যর্থ হবেন।

১৪) সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলী পরিচালনাঃ শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্য সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীর গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন ধরণের সহপাঠ্যক্রমিক কাজ কিভাবে পরিচালনা করতে হয় এবং কিভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে ওগুলোকে ব্যবহার করা যায়, সে সম্পর্কেও একজন আদর্শ শিক্ষকের ধারণা থাকা প্রয়োজন।

১৫) রুচিসম্মত পোশাক পরিচ্ছদঃ রুচিসম্মত পোষাক পরিচ্ছদ এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা সহজেই ছাত্রদের মনকে আকৃষ্ট করে, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। আর এগুলোর প্রভাব শিক্ষার্থীর মনের উপর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

১৬) সমালোচনামূলক বা ছিদ্রান্বেষী মনোভাব পরিহারঃ শিক্ষককে সব সময় ছিদ্রান্বেষী মনোভাব পরিহার করতে হবে। কারণ শিক্ষক যদি ছাত্রদের ভুলত্রুটিগুলো নিয়ে সব সময় সমালোচনায় তৎপর থাকেন বা ছাত্রদের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করার কাজে তৎপর থাকেন তবে ছাত্ররা সেই শিক্ষকের পাঠে কখনও মনোযোগ দিবেনা, বরং তারা উক্ত শিক্ষকের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করবে।

১৭) মানবিক গুণাবলীঃ একজন সৎ মানুষের যে সমস্ত মানবিক গুণ থাকা প্রয়োজন মানুষ হিসেবে আদর্শ শিক্ষকের সেই সমস্ত গুণাবলী থাকা প্রয়োজন। যেমন সুবিবেচনা, উদারতা, প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার, কোমলতা, সহানুভূতিশীলতা ইত্যাদি গুণ শিক্ষার্থীদের উপর গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

১৯) পদ্ধতিগত ভাবে ধারাবাহিকতা অবলম্বন করাঃ পাঠদানে শিক্ষক তাঁর দৈনিক কাজের একটি চমৎকার যোগসূত্র ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলতে পারে। এক্ষেত্রে সময় সাশ্রয় ও সদ্ব্যবহার হয়, শ্রমের লাঘব হয়, শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণে আকৃষ্ট ও মনোযোগী হয়। সুতরাং ধারাবাহিকভাবে সকল অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন একত্রিত করতে হবে এবং পড়াতে হবে।

২০) আত্মবিশ্বাসঃ আদর্শ শিক্ষকের অন্যতম প্রধান গুণ হল অত্মবিশ্বাস। শিক্ষকের মধ্যে সব সময় একটি গভীর আতœবিশ্বাস থাকা প্রয়োজন। শিক্ষক আত্মবিশ্বাস নিয়ে শিক্ষাদানে ব্রতী হবেন। যদি কোন অসুবিধা, সমস্যা বা ছাত্রদের ভুলত্রুটি দেখে তিনি হতাশ ও নিরাশ হন এবং সাফল্য অর্জনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা না করেন, তবে তিনি শিক্ষাদানে সাফল্য অর্জন করতে পারবেন না। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা যদি শিক্ষকের ব্যক্তিত্বে বিশ্বাসী না হয়, তবে তারা তাঁকে যথাযথভাবে অনুসরণ করবে না এবং এক্ষেত্রে শিক্ষাদান ব্যর্থ হতে বাধ্য।

শিক্ষকতা একটি মহান গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এ পেশায় পদার্পণ করার আগে আনেক কিছু ভেবে অতি সন্তর্পণে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ এ মহান পেশায় নেমে নিজের ত্রুটি বিচ্যূতির জন্য একে কলুষিত করে পুরো শিক্ষক সমাজের সম্মান নষ্ট করার অধিকার ব্যক্তি শিক্ষকের নেই। এখানে ব্যক্তি শিক্ষকের একক ভূমিকার মাধ্যমে পুরো শিক্ষক সমাজের সুনাম বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং শিক্ষার সঠিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষার প্রতি স্তরে উপরে উল্লেখিত গুণ বৈশিষ্ট্য, দায়িত্ব কর্তব্যপরায়ণ দক্ষ-অভিজ্ঞ ও আদর্শ শিক্ষককে দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যদি উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ও দায়িত্ববান ব্যক্তিদের শিক্ষক পদে অধিষ্ঠিত করা যায় , তবে তাঁদের কর্মতৎপরতায় এ দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে অতি দ্রুত বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং সকলের প্রত্যাশা পূরণ করে শিক্ষার উন্নয়ন ঘটবে।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে- ““N0 system of education is better than its teachers”” অর্থাৎ কোন শিক্ষাদান পদ্ধতিই স্বয়ং শিক্ষক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। কাজেই সঠিক পদ্ধতির অনুসরণ করে সঠিকভাবে বিষয়বস্তুর শিক্ষাদান করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাই হবে প্রধান। কারণ তাঁকে কেন্দ্র করেই যাবতীয় শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর শিক্ষার্থীদের মাঝে পরিবেশিত হয়ে থাকে। একজন শিক্ষক তার মানদন্ড নিজেকেই মূল্যায়ণ করতে হবে। শিক্ষককে নিজ পেশায় সফলতা অর্জনের জন্য আত্মমূল্যায়ণ করা জরুরী। নিজের ত্রুটিগুলো চিহিত করার জন্য নিজেকেই নিজের কাজের সমালোচনা করতে হবে। শিক্ষকতা পেশাকে ভালবাসতে হবে। আর শিক্ষকতা পেশায় শিক্ষকের আত্মবিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের এ আত্মবিশ্লেষণ মানদন্ডে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করতে পারেন তা নিম্নরূপ-

০১) আমি কি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি?

০২) পাঠদানের পূর্বে আমি কি বিষয়বস্তুর ওপর যথাযথ প্রস্তÍতি গ্রহণ করছি?

০৩) আমি কি শিক্ষার্থীর চাহিদাগুলো সম্পর্কে সচেতন ?

০৪) আমি কি শ্রেণিতে সব শিক্ষার্থীর প্রতি সমান আচরণ করি ?

০৫) পাঠদানকালে আমি কি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের ভাল কাজের জন্য প্রসংশা করি ?

০৬) আমি কি পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতন ?

০৭) পেশাগত উন্নয়নের জন্য আমি কি নিজ থেকে যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছি ?

০৮) গত সপ্তাহে আমি আমার পেশা সংক্রান্ত কয়টি পুস্তক বা লেখা পাঠ করেছি।

০৯) আমি কি আমার বিষয় অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সাথে কোন যোগাযোগ করেছি ?

১০) আমি নিজ থেকে সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছি ?

পরিশেষে বলা যায় একজন আদর্শ শিক্ষকের সার্থক শিক্ষা দানের মূল কথা হচ্ছে সদা জাগ্রত,প্রাণোচ্ছল হৃদয়, মুক্ত মন, চিন্তা ও বুদ্ধির যথার্থতা প্রয়োগ এবং অভিব্যক্তির প্রকাশ। এভাবেই শ্রেনিকক্ষে সুন্দর সঙ্গতি বিধানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানে তথা সমাজে একজন শিক্ষকের জীবনের সফলতা আসবে। আর সে সফলতার প্রতিফলন ঘটবে পরবর্তী প্রজন্মের উপর এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকগণ পাবে সুন্দর শিক্ষা ধারা। এরই পাশাপাশি একজন আদর্শ শিক্ষক গভীর মানবিক অনুভূতির আলোকে নিজেকে চিনতে পারবেন এবং বুঝতে পারবেন তার নৈতিক দায়িত্বানুভূতি। একই সঙ্গে তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাঝে তাঁর নিজ আসন প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবেন। খুঁজে পাবেন সমস্ত জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে ‘আদর্শ শিক্ষক ’ হওয়ার সার্থকতা। এটাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। অতএব একজন আদর্শ শিক্ষকের ভিতরে এ অনুভূতি আবেগ বোধটুকু থাকা দরকার যে আমি আমার দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি। যে শিক্ষক নিজেকে ফাঁকি দেয় না সে তাঁর শিক্ষার্থীর মাঝে ফাঁকি দেয়ার মনোভাব গড়ে উঠে না। সুতরাং যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ফাঁকি দেবেন মূলত তিনি তাঁর সন্তানকে ফাঁকি দিলেন।

অতএব, যদি একজন আদর্শ শিক্ষক যথাযথভাবে আত্মমূল্যায়ণ বিশ্লেষণ করেন তাহলে নিজেই নিজের সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে পৌছতে পারবেন। আর এগুলো উপযুক্তরূপে বিশ্লেষণ করার মধ্য দিয়ে নিজেই নিজের উন্নয়ন করতে পারবেন। শিক্ষককে নিজ পেশাগত কাজে সফলতা অর্জনের জন্য আত্মমূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরী। আর এ আত্মমূল্যায়ণ করতে পারলেই এমন শিক্ষকই তো হতে পারেন আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর।

সুতরাং All of you are good teacher – I am confident.


লেখক পরিচিতি: ড. মোঃ সাখাওয়াত হোসেন

অধ্যক্ষ, আই. ই. এস. স্কুল এন্ড কলেজ, উত্তরা, ঢাকা