ঝড়ের গতিতে স্বৈরাচারী প্রবণতার দিকে এগোচ্ছেন ট্রাম্প

সুইডেনের ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (ভি-ডেম) ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আর উদার গণতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ নেই। এমনকি ইউরোপেও ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্র বিস্তৃত হচ্ছে।
গোথেনবার্গ ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে, এমনকি হাঙ্গেরি ও তুরস্কের চেয়েও দ্রুতগতিতে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা স্ট্যাফান লিন্ডবার্গ বলেন, ‘আমাদের কাছে ১৭৮৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য আছে। এখন আমরা যে ডেমোক্রেটিক ব্যাকস্লাইডিং দেখছি, তা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর।’
২০১২ সাল থেকে লিন্ডবার্গ ও তার গবেষক দল বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের লিবারেল ডেমোক্রেসি পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে। দেশটি এখন দ্রুতগতিতে স্বৈরতান্ত্রিকীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
লিন্ডবার্গ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে স্বৈরতন্ত্রে রূপ দিতে হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের সময় লেগেছিল বছর চারেক, সার্বিয়ার অ্যালেক্সান্দার ভুসিকের ক্ষেত্রে লেগেছে আট বছর এবং তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ও ভারতের নরেন্দ্র মোদির এক্ষেত্রে সময় লেগেছে প্রায় দশ বছর। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই পরিস্থিতিতে যেতে সময় নিয়েছেন মাত্র এক বছর।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অবস্থা এখন ১৯৬৫ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দেশটিতে সিভিল রাইটস ল’ কার্যকর এবং সর্বজনীন ভোটাধিকার চালুর পর গণতন্ত্রের যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন প্রায় পুরোপুরি থেমে গেছে।
বিশ্বব্যাপীও গণতন্ত্র এখন ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। লিন্ডবার্গ বলেন, ‘বিশ্ব আগে কখনো একসঙ্গে এত বেশি দেশকে অটোক্রাটাইজেশনের মধ্যে যেতে দেখেনি।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৪১ শতাংশ (প্রায় ৩৪০ কোটি) মানুষ এমন দেশে বসবাস করছে, যেখানে গণতন্ত্রের অবনতি হচ্ছে। আর গণতন্ত্র থেকে সরে যাওয়ার এই বৈশ্বিক প্রবণতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
গবেষকরা ৪৮টি সূচকের ভিত্তিতে গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নির্বাচনের মান ও আইনের শাসন। এসব সূচকের ভিত্তিতে লিবারেল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রে যে গতিতে গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করা হচ্ছে, আধুনিক ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। এর প্রধান কারণ হিসেবে প্রেসিডেন্টের হাতে দ্রুত ও আক্রমণাত্মকভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়াকেই দায়ী করছেন লিন্ডবার্গ।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলার ঘটনায় দণ্ডিত দেড় হাজার মানুষকে ‘ক্ষমা’ করে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, যা আদালতের বৈধতা ক্ষুণ্ন করেছে বলেও মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে।
লিন্ডবার্গ বলেন, ‘আমরা নির্বাহী শাখায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে দেখেছি। আইনসভা কার্যত তাদের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। এটি আর নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ হিসেবে কাজ করছে না।’
ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২২৫টি নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যেখানে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস পাস করে মাত্র ৪৯টি নতুন আইন। লিন্ডবার্গ বলেন, ‘ট্রাম্পের অধিকাংশ নির্বাহী আদেশ ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি একেকটি সরকারি বিভাগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন এবং লক্ষাধিক কর্মীকে বরখাস্ত করেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস যে আইনগুলো পাস করেছে, সেগুলো ছিল মূলত বিদ্যমান আইনের সামান্য পরিবর্তন। ফলে লেজিসলেটিভ ও এক্সিকিউটিভ শাখার মধ্যে আর বিভাজন থাকল না।’
এদিকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে সরে গেছে। এমনকি আদালত যখন ট্রাম্পের কোনো নির্বাহী আদেশ বাতিল করেছে, তখনও তিনি তা পাশ কাটানোর পথ খুঁজেছেন। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ৬০০টির বেশি বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের দ্রুত অবনতির আরেকটি কারণ হলো, ফেডারেল সরকারের ভেতরের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলা, যা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
লিন্ডবার্গ বলেন, ‘ট্রাম্প বিভিন্ন দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেল এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছেন এবং তাদের জায়গায় অনুগত ব্যক্তিদের বসিয়েছেন। এটি ঠিক ভিক্টর অরবান ও এরদোগানেরই পুনরাবৃত্তি। তারাও ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছিলেন। ফলে এখন পরিষ্কার যে, ট্রাম্প ডিক্টেটরশিপের দিকে এগোচ্ছেন।’
গোথেনবার্গের একটি ছোট গবেষণা প্রতিষ্ঠান কীভাবে ওয়াশিংটনে গণতন্ত্রের অবনতির বিষয়ে এত বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের উৎসে পরিণত হলো? এমন কৌতূহলের জবাবে লিন্ডবার্গ জানান, ২০১২ সালে যখন তিনি এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন, তখন বিশ্বে গণতন্ত্র প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। তিনি বলেন, ‘তখন আমরা গণতন্ত্রায়ণের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছিলাম। কিন্তু আমরা দেখলাম বিদ্যমান সূচকগুলো যথেষ্ট নয়। তাই আমরা কিছু নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক সূচক প্রণয়ন করতে চেয়েছিলাম।’
পাঁচ বছর পর প্রথম বৈশ্বিক ডেটাসেট প্রকাশের পর গবেষকরা বুঝতে পারেন পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। লিন্ডসবার্গ জানান, এ পরিস্থিতিতে এখন তারা ‘অটোক্রাটাইজেশন’ নিয়ে গবেষণা করছেন।
শুরুর দিকে তাদের প্রতিবেদনকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তবে এখন বুঝতে পারছি, আমাদের সতর্কবার্তাই ঠিক ছিল।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ১৮০টি দেশের চার হাজার ২০০ গবেষকের সঙ্গে কাজ করছে। ১৭৮৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ২০২টি দেশ ও অঞ্চলের ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি ডেটা পয়েন্ট ব্যবহার করে তারা বিশ্লেষণ তৈরি করেছে। তাদের দাবি, এই গবেষণা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, পক্ষপাতহীন এবং নিরপেক্ষ।
‘আনর্যাভেলিং দ্য ডেমোক্রেটিক এরা’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি ইউরোপের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। এতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাতটি দেশ—হাঙ্গেরি, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, স্লোভাকিয়া, ইতালি ও রোমানিয়া স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া নজরদারি তালিকায় রাখা হয়েছে পর্তুগাল ও বুলগেরিয়াকে।
প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্যকে একটি নতুন স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। লিন্ডবার্গ বলেন, ‘কিয়ের স্টার্মার আসার আগেই যুক্তরাজ্যে এটি শুরু হয়। দেশটিতে ইলেকশনস অ্যাক্ট ২০২২, পুলিশিং অ্যাক্ট ২০২২, অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট ২০২৩ এবং হায়ার এডুকেশন (ফ্রিডম অব স্পিচ) অ্যাক্ট ২০২৩ প্রণয়নের পরই মূলত এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এসব আইনের ফলে নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কমেছে। ভয়ের কথা হলো, একবার যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে পশ্চাৎপসারণ ঘটতে শুরু করে, তখন সেটি থামানো খুবই কঠিন হয়ে যায়।
২০২৫ সালের সূচকে ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও আয়ারল্যান্ড গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। পোল্যান্ডসহ কিছু দেশ স্বৈরতন্ত্র থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ১৮টি দেশে গণতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়া চলছে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন।
প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে এখনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং নির্বাচনব্যবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। তবে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশগুলো এই ব্যবস্থার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। লিন্ডবার্গের মতে, ‘নির্বাচন পরিচালনায় যুক্ত কর্মীদের হুমকি দেয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। ২০২০ সালের পর প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী পদত্যাগ করেছেন। ট্রাম্প তখন পরাজয় মেনে নেননি, এখন নেবেন কেন? ২০২৬ সালে যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকার করা হয়, তাহলে সেটি হবে পুরোপুরি ডেমোক্রেটিক ব্রেকডাউন।’
তবে কিছু ইতিবাচক বিষয়ও রয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ইরান যুদ্ধ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে অনেক সমর্থকই ট্রাম্পের ওপর হতাশ। মিনেসোটা ও ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোও নাগরিক অধিকার রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। লিন্ডবার্গ বলেন, ‘এমনকি মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন—আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্য থেকেও সমালোচনা শুরু হয়েছে।’
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপ এই প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকবে, এমন ধারণা বোকামির নামান্তর। এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখায়, কট্টর ডানপন্থিরা ক্ষমতায় এলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
ইউরোপের অনেক দেশে এখন ভোটাররা ট্রাম্পের মতো নেতাদের নির্বাচিত করার জন্য সংগঠিত হচ্ছেন, যদিও এই প্রশাসনের হুমকি এবং চরমপন্থি দলগুলোর প্রতি সমর্থন ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করছে। প্রচলিত রক্ষণশীল শক্তিগুলোও তাদের অনুসরণ করছে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক
গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ‘ট্রাম্প ইজ এইমিং ফর ডিক্টেটরশিপ—দ্যাটস দ্য ভার্ডিক্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ক্রেডিবল ডেমোক্রেসি ওয়াচডগ’ শীর্ষক মতামত কলাম অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।