শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভাপতি পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল: শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের প্রথম পেরেক

একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা, আর সেই মেরুদণ্ড গঠনের কারিগর হলেন শিক্ষক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার সেই কারিগরদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর দায়িত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে এমন এক শ্রেণির হাতে, যাদের অনেকেরই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি পদে শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত শিথিলের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা কেবল হতাশাজনকই নয় বরং আত্মঘাতী।
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, সভাপতি হতে হলে কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে, তখন সাধারণ মানুষের মনে একটি আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয় সেই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিতদের জন্য পুনরায় এই গুরুত্বপূর্ণ পদের দুয়ার খুলে দিল। প্রশ্ন জাগে, যে দেশে এখন উচ্চশিক্ষিত মানুষের অভাব নেই, সেখানে কেন এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত?
অযোগ্যতার বৃত্তে বন্দি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকতা ও হাজারো স্কুল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, গ্রামীণ রাজনীতিতে যুক্ত প্রভাবশালীরাই মূলত এসব কমিটির দখল নেয়। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্কুল কমিটির সভাপতিও বদলে যায়। এই শ্রেণির ব্যক্তিদের মূল লক্ষ্য থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়, বরং ভবন নির্মাণের বাজেট থেকে কমিশন ভোগ এবং আয়া, নৈশপ্রহরী বা দপ্তরি নিয়োগে লাখ লাখ টাকার নিয়োগবাণিজ্য।
এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার আগে এই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত সভাপতিরাই অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতেন। ফলে ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীটি যখন অর্থের অভাবে শিক্ষক হতে পারেনি, তখন অমেধাবী বিত্তবানের সন্তান ঠিকই এই মহান পেশা বাগিয়ে নিয়েছে। আমাদের শিক্ষার মান আজও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারার অন্যতম কারণ এটি।
একাডেমিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়
একজন মাস্টার্স পাস করা অভিজ্ঞ শিক্ষককে যখন একজন অশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে জবাবদিহি করতে হয়, তখন তার পেশাদারিত্ব এবং আত্মসম্মানে চরম আঘাত লাগে। আধুনিক কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম সম্পর্কে যার প্রাথমিক ধারণাটুকু নেই, তিনি কীভাবে একজন শিক্ষককে পরামর্শ দেবেন? এটি অনেকটা একজন অদক্ষ ব্যক্তিকে দিয়ে বিশেষজ্ঞ সার্জনকে গাইড করার মতো হাস্যকর ও বিপজ্জনক।
শিক্ষার্থীদের মনেও এর একটি দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একজন শিক্ষার্থী যাকে আদর্শ মেনে বড় হচ্ছে, সেই শিক্ষককে যখন সে দেখবে এলাকার অশিক্ষিত প্রভাবশালীর সামনে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন শিক্ষার প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে যায়। কিশোর মনেই তার এই ধারণা জন্মায়, যোগ্যতার চেয়ে ক্ষমতা বা অর্থই গুরুত্বপূর্ণ, যা ভবিষ্যৎ জাতিগঠনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বৈশ্বিক উদাহরণ
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে এমন ব্যক্তিদের তারা রাখে, যারা শিক্ষানুরাগী এবং বিশেষজ্ঞ।
আধুনিক বিশ্বের সেরা শিক্ষাব্যবস্থার মডেল হিসেবে পরিচিত ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে স্কুল ম্যানেজমেন্টে কোনো অপেশাদার বা অশিক্ষিত ব্যক্তির স্থান নেই। সেখানে স্থানীয় কমিটির কাজ কেবল লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া, কিন্তু একাডেমিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কেবল উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের। সিঙ্গাপুরে স্কুল বোর্ড মেম্বার হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পেশাদার ট্র্যাক রেকর্ড এবং সামাজিক অবদান পর্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বিশ্বজুড়ে শিক্ষার মান যাচাইয়ের সবচেয়ে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পিসা (PISA) র্যাঙ্কিংয়ে দেখা গেছে, সেই দেশগুলোই শীর্ষে অবস্থান করছে, যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। ভিয়েতনাম এই র্যাঙ্কিংয়ে গত এক দশকে অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর প্রধান কারণ ছিল স্কুল গভর্নিং বডিতে স্থানীয় শিক্ষিত কমিউনিটি লিডার এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ। তারা মনে করে, একজন অশিক্ষিত ব্যক্তি কখনো আধুনিক কারিকুলামের শিখন পদ্ধতি বুঝতে সক্ষম নন।
জাপানে ‘স্কুল কাউন্সিল’ প্রথা আরও শক্তিশালী। সেখানে অভিভাবকদের মধ্য থেকে যারা উচ্চশিক্ষিত এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ, তাদেরই কেবল প্যানেলে রাখা হয়। কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা পেশীশক্তি সেখানে অচল। প্রতিবেশী দেশ ভারতের কেরালা রাজ্যে শিক্ষার হার পুরো ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর অন্যতম কারণ হল তাদের স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রাধান্য।
অন্যদিকে, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য ব্যক্তিদের কমিটিতে রাখা হয়েছে, সেখানেই শিক্ষার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং নেপাল আমাদের সামনে জলন্ত উদাহরণ, যা আমাদের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
একটি কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব
শিক্ষামন্ত্রী নিজে একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ এবং সম্প্রতি তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শিক্ষার গুরুত্ব ও মান তিনি নিশ্চয়ই বোঝেন। কিন্তু তার মন্ত্রণালয় থেকে আসা এমন আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত কীভাবে এলো, তা আমার পক্ষে বলা খুবই মুশকিল। তবে এই সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি দুর্বল করে দেবে, এটা বোঝার জন্য ভূগোল পড়ার দরকার নেই।
শিক্ষামন্ত্রী সত্যিই যদি শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে চান, তাহলে সভাপতি পদে স্নাতক ডিগ্রির শর্ত বহাল রাখুন। আরও ভালো হয় যদি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিজ নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি করার নিয়ম চালু করা যায়। এতে দুটি সুফল পাওয়া যাবে- ১. তিনি একজন প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে আধুনিক কারিকুলাম বুঝবেন। ২. তিনি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও সাবেক শিক্ষক হওয়ায় বর্তমান শিক্ষকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করবেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদটি কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার বা ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ হওয়া উচিত নয়। এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব। এ গুরুত্বপূর্ণ পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের অর্থ হল আমরা সচেতনভাবেই একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অশিক্ষিত ব্যক্তিদের হাতে দিয়ে দিচ্ছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করে, তবে ইতিহাসে এটি শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের ‘প্রথম পেরেক’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ, গণমাধ্যমকর্মী।
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]