logo
Advertisement

উচ্চশিক্ষার বিস্তার, নাকি বেকার তৈরির কারখানা

প্রফেসর ড. মো. আবদুল জলিল
প্রফেসর ড. মো. আবদুল জলিল
উচ্চশিক্ষার বিস্তার, নাকি বেকার তৈরির কারখানা
উচ্চশিক্ষা। ছবি: গণমাধ্যম থেকে নেওয়া

উচ্চশিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু সেই উচ্চশিক্ষা যদি জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তে কেবল একটি সার্টিফিকেট অর্জনের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, তাহলে তা জাতির সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে সেই আশঙ্কাই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ শতাংশ কর্মক্ষম বয়সের জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) মতে, বাংলাদেশের প্রথম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ২০২০-এর দশকের শুরুতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এই সুযোগ ধীরে ধীরে সংকুচিত হবে। অর্থাৎ আমাদের সামনে সময় সীমিত। এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। আর তা না হলে এই জনসংখ্যাই ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সেই সুযোগটি সঠিকভাবে কাজে লাগাচ্ছি?

উচ্চশিক্ষার বিস্তার কতটা যুক্তিসংগত

গত দুই দশকে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু মেডিকেল শিক্ষার ক্ষেত্রেই বর্তমানে ১১০টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী MBBS ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল, যেখানে সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন ছিল মাত্র ৫,৩৮০টি।

বিশ্ববিদ্যালয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে খারাপ কিছু নয়। বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে আমরা কি পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, গবেষণা তহবিল, শিল্প-সংযোগ এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বিবেচনা করছি?

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি ভবন, কয়েকটি বিভাগ এবং একটি সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণ এবং নতুন জ্ঞান প্রয়োগের কেন্দ্র। অথচ অনেক ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখছি, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়: সুযোগ যেমন বিশাল, চ্যালেঞ্জও তেমন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় অংশীদার। এর অধিভুক্ত কলেজ ও প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ২, ২৫৭টি এবং শিক্ষার্থী প্রায় ৩৪ লাখ ২৫ হাজার ৮৩২ জন। এটি বাংলাদেশের জন্য একদিকে বিশাল সুযোগ, অন্যদিকে বিশাল চ্যালেঞ্জ।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। এই সুযোগকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে আমরা কী ধরনের শিক্ষা দিচ্ছি? ক্লাসে না এসে শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে একটি ডিগ্রি অর্জন করাই যদি শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই ডিগ্রি শ্রমবাজারে কতটা মূল্য সৃষ্টি করছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই স্বীকার করছে যে ২, ২৫৭টি অধিভুক্ত কলেজ ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো থেকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। তাই এখানে প্রশ্নটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?

আমরা কি সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে চাই

একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে: প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে কি অনার্স-মাস্টার্স করতেই হবে? একজন তরুণ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ে দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, মেশিন অপারেটর, CNC technician, industrial electrician, refrigeration technician, garment technologist, laboratory technician, medical technologist, computer hardware specialist, automobile technician কিংবা অন্য কোনো দক্ষ পেশাজীবী হন, তাহলে তার মর্যাদা কম কোথায়? দুঃখজনকভাবে আমাদের সামাজিক মানসিকতা এখনও অনেক ক্ষেত্রে এমন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি মানেই সাফল্য, আর কারিগরি দক্ষতা মানেই দ্বিতীয় সারির পেশা। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি।

জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ বহু দেশ তাদের শিল্পায়নের পথে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একটি দেশের অর্থনীতি শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক বা প্রশাসক দিয়ে চলে না। অর্থনীতি সচল রাখে বিপুলসংখ্যক দক্ষ technician, operator, supervisor, craftsman এবং skilled worker।

আমাদের সমস্যাটি হলো, আমরা সবাইকে "সাহেব" বানাতে চাই, কিন্তু দেশের শিল্প-অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী তৈরি করতে চাই না।

ডিগ্রি বাড়ছে, দক্ষতা কী বাড়ছে?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে দক্ষতা অর্জনকে আমরা এক করে ফেলেছি। কিন্তু একটি সার্টিফিকেট কোনো ব্যক্তিকে দক্ষ করে না। দক্ষতা তৈরি হয় জ্ঞান, অনুশীলন, গবেষণা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

বর্তমান শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, শুধু সাধারণ একাডেমিক ডিগ্রি থাকলেই চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না। সাম্প্রতিক UNFPA তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে tertiary-educated জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ২৭.৮ শতাংশ এবং ১৫-২৯ বছর বয়সিদের NEET হার ২২ শতাংশ। এই তথ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে শিক্ষার পরিমাণ বাড়লেই কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সংযোগ থাকতে হয়।

গবেষণা কোথায়

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি মৌলিক দায়িত্ব হলো গবেষণা। একটি প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা হবে কেন? শুধু সেখানে অনার্স ও মাস্টার্স পড়ানো হয় বলে? না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান পরিচয় হলো সেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা এখনও মূল শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে আসতে পারেনি। কোথাও গবেষণা হয়, কিন্তু তা অনেক সময় ব্যক্তি উদ্যোগনির্ভর; কোথাও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি নেই, কোথাও গবেষণা তহবিল সীমিত, কোথাও প্রয়োজনীয় গবেষক নেই, আবার কোথাও গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সংযোগ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যদি শিল্পের সমস্যার সমাধান না করে, কৃষির উৎপাদনশীলতা না বাড়ায়, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি না ঘটায়, পরিবেশের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা না রাখে কিংবা নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য তৈরি না করে, তাহলে সেই গবেষণার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে তাই একটি প্রশ্ন করা উচিত: এই বিশ্ববিদ্যালয় আগামী ২০ বছরে কী জ্ঞান সৃষ্টি করবে?

শিক্ষক সংকটও একটি বড় প্রশ্ন

উচ্চশিক্ষার মানের সঙ্গে যোগ্য শিক্ষকের সম্পর্ক সরাসরি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু সেখানে দীর্ঘমেয়াদে যোগ্য শিক্ষক তৈরি করা, ধরে রাখা এবং গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করা অনেক কঠিন। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণাগার, গবেষণা নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু পদ সৃষ্টি করে শিক্ষক নিয়োগ করলেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয় না।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি তার ভবনের উচ্চতায় নয়, তার শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, গবেষণা এবং জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতায়।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড: সুযোগ নাকি বিপদ

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগগুলোর একটি হলো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। কিন্তু ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কোনো স্বয়ংক্রিয় অর্থনৈতিক সুবিধা নয়। UNFPA স্পষ্টভাবে বলছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি হলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পাওয়া যায় না। তাদের স্বাস্থ্যবান, শিক্ষিত, দক্ষ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগপ্রাপ্ত হতে হবে।

অর্থাৎ আমাদের হাতে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা তাদের কী বানাব। আমরা কি তাদের এমন একটি ডিগ্রি দেব, যার সঙ্গে শ্রমবাজারের কোনো বাস্তব সংযোগ নেই? নাকি তাদের এমন দক্ষতা দেব, যা বাংলাদেশ ও বিশ্বের শ্রমবাজারে আগামী কয়েক দশক চাহিদা তৈরি করবে? দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে কার্যকর বিকল্প খুব কম।

চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায়

চীনের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় চীনের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত নির্বাচিত ছিল। ১৯৯৩-৯৪ সালে সাধারণ উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের হার ছিল খুবই কম। একই সঙ্গে দেশটি মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন পথ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক পর্যালোচনাতেও চীনের সেই selective higher education এবং vocational education-এর কাঠামোর উল্লেখ পাওয়া যায়।

অবশ্যই চীনের মডেল সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যাবে না। দুই দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক কাঠামো ভিন্ন। কিন্তু একটি শিক্ষা নেওয়া যায়: সব তরুণকে একই শিক্ষাপথে না পাঠিয়ে তাদের সক্ষমতা, আগ্রহ এবং অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষাপথ তৈরি করা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় হবে এক পথ। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা হবে আরেক পথ। পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ হবে আরেক পথ। কর্মমুখী short course এবং apprenticeship থাকবে আরও একটি পথ। সব পথের মর্যাদা সমান হতে হবে।

কওমি মাদরাসা শিক্ষাও আলোচনার বাইরে থাকতে পারে না

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা। এখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এই শিক্ষাব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করা কোনো সমাধান নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, উদ্যোক্তা শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার সুযোগ তৈরি করা যায়।

একজন শিক্ষার্থী যে শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই আসুক না কেন, তার জন্য শ্রমবাজারে প্রবেশের একটি বাস্তব পথ থাকা উচিত। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া নয়, বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত পথ তৈরি করা।

উচ্চশিক্ষার ভুল পরিকল্পনা সামাজিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে

দীর্ঘদিন বেকার থাকা একজন তরুণের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করে না। এর সঙ্গে হতাশা, আত্মমর্যাদার সংকট, পারিবারিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা যুক্ত হতে পারে।

বিশেষ করে যখন একজন তরুণ ১৬-১৮ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, চার-পাঁচ বছর পর একটি ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে এসে দেখে তার সামনে কোনো সুস্পষ্ট কর্মপথ নেই, তখন তার মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তবে বেকারত্ব সরাসরি সন্ত্রাস, মাদক বা অপরাধ সৃষ্টি করে এমন সরল সম্পর্ক স্থাপন করাও ঠিক হবে না। এসব সমস্যার পেছনে বহু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণ কাজ করে। তবু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই: বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত কিন্তু কর্মহীন তরুণ কোনো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় সামাজিক ঝুঁকি।

তাহলে করণীয় কী

প্রথমত, আর কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন, সেই প্রশ্নের আগে প্রশ্ন করতে হবে কতগুলো মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে শুধু জমি, ভবন ও প্রশাসনিক কাঠামো নয়, শিক্ষক, গবেষণা, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, অর্থায়ন, শিক্ষার্থীসংখ্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়ত, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মান নিশ্চিত করতে শক্তিশালী accreditation ও quality assurance ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ভালো কলেজকে ভালো করতে হবে, দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করতে হবে এবং দীর্ঘদিন ন্যূনতম মান পূরণ করতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে পুনর্গঠন করতে হবে অথবা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। চতুর্থত, অনার্স-মাস্টার্সের সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে কর্মমুখী শিক্ষা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক technical institute, polytechnic, vocational centre এবং industry-linked training centre গড়ে তোলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে মানহীন কলেজগুলোকে ধাপে ধাপে টেকনিক্যাল কলেজে পরিণত করা যেতে পারে। এতে অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে কোনো অর্থ বাহির করতে হবে না। এটা করতে পারলে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। ষষ্ঠত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক internship, apprenticeship, industry project এবং practical training-এর সুযোগ বাড়াতে হবে। সপ্তমত, গবেষণাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কার্যক্রমে নিয়ে আসতে হবে। গবেষণার অর্থ শুধু publication নয়। গবেষণার ফল শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও জননীতিতে ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। অষ্টমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী curriculum তৈরি করতে হবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার অংশীদার করতে হবে। নবমত, career guidance মাধ্যমিক স্তর থেকেই শুরু করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থীকে ১৮ বছর বয়সে এসে প্রথমবার জানতে দেওয়া উচিত নয় যে তার কী ধরনের ক্যারিয়ার হতে পারে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি মানসিকতায়

সবশেষে আমাদের সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের সন্তান ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সরকারি কর্মকর্তা হলেই শুধু সফল হবে, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

একজন দক্ষ electrician, machinist, welder, textile technician, laboratory technician, software technician, automobile specialist কিংবা skilled construction worker দেশের অর্থনীতিতে যে অবদান রাখেন, তা কোনোভাবেই কম নয়। বরং আধুনিক অর্থনীতিতে দক্ষ কারিগরি কর্মীর মূল্য অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ডিগ্রিধারীর চেয়েও বেশি হতে পারে। আমাদের সন্তানকে শুধু "চাকরি খোঁজার যোগ্য" নয়, "কাজ করার যোগ্য" করে তুলতে হবে।

এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে আছে অব্যাহতভাবে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো, অনার্স-মাস্টার্সের সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক সার্টিফিকেটধারী তরুণ শ্রমবাজারে পাঠানো। অন্যদিকে আছে একটি নতুন শিক্ষা দর্শন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি থাকবে শক্তিশালী কারিগরি শিক্ষা, vocational education, apprenticeship, industry-based training, research এবং entrepreneurship।

প্রথম পথ আমাদের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়াতে পারে। দ্বিতীয় পথ আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড চিরস্থায়ী নয়। UNFPA-এর তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই সুবিধাজনক কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সুযোগটি কাজে লাগাতে হলে এখনই দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত না, দেশে আর কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় করা যায়?"

প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের আগামী প্রজন্মকে কীভাবে এমন মানুষ হিসেবে তৈরি করব, যারা নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে, অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জন্য মূল্য তৈরি করতে পারবে?

কারণ একটি সার্টিফিকেট একটি কাগজ মাত্র। কিন্তু একটি দক্ষ মানুষ একটি সম্পদ। বাংলাদেশের এখন আর সার্টিফিকেট নয়, আরও দক্ষ মানুষ প্রয়োজন।


লেখক: প্রফেসর ড. মো. আবদুল জলিল; ডিন, বিজ্ঞান ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি), ঢাকা।