logo

জেরুজালেমের ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসরায়েল

জেরুজালেমের ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসরায়েল

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ধর্মীয় স্থানগুলোতে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের যাতায়াত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধা দিচ্ছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী। এর মাধ্যমে বহু ধর্মের তীর্থস্থান খ্যাত জেরুজালেমের ধর্মীয় পরিচয় মুছে দিয়ে একে ইহুদিবাদী শহর বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় আচারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহরটির দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক স্থিতিশীল পরিস্থিতি বা ‘স্ট্যাটাস কু’ না মানার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। গত কয়েক সপ্তাহে পবিত্র আল আকসা মসজিদ ও চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকারে ঘটে যাওয়া বেশকিছু ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও ঘনীভূত করেছে।

ঐতিহাসিক ‘স্ট্যাটাস কু’ হলো ১৬০০ শতাব্দী থেকে চলে আসা একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থা, যা অটোমান আমল থেকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট হয়ে আজ পর্যন্ত পবিত্র স্থানগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রেণ করে আসছে। এই নিয়ম অনুযায়ী আল আকসা প্রাঙ্গণ পরিচালনা করার কথা ইসলামিক ওয়াকফের।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল এখন এই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজস্ব আইন চাপিয়ে দিচ্ছে। ইসরায়েলি নীতি অনুযায়ী সেখানে ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে কেবল ‘বাসিন্দা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেখানকার আদি আদিবাসী হিসেবে নয়। এর লক্ষ্য, জেরুজালেমকে একটি একচেটিয়া ইহুদি শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

গত ৫ এপ্রিল পবিত্র ইস্টার উৎসবের আগে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানরা জেরুজালেমের চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকারে প্রবেশের চেষ্টা করলে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালায় এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। এর ঠিক পরদিন অর্থোডক্স ইস্টারের সময় ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির তার সমর্থকদের নিয়ে আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। মসজিদটিতে অমুসলিমদের প্রার্থনা নিষিদ্ধ থাকলেও তিনি প্রকাশ্যে সেখানে প্রার্থনা সম্পন্ন করেন।

নিরাপত্তার অজুহাতে নজিরবিহীন অবরোধ
সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে টানা ৪০ দিন আল আকসা মসজিদ ও চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকার বন্ধ করে দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ঈদুল ফিতর এবং পাম সান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে নামাজ আদায় বা প্রার্থনা করতে পারেনি ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিস্টানরা। এমনকি জেরুজালেমের ল্যাটিন প্যাট্রিয়ার্ক কার্ডিনাল পিয়েরবাতিস্তা পিজাবাল্লাকেও গির্জায় যেতে বাধা দেওয়া হয়।

বর্ণবাদ ও বৈষম্যের অভিযোগ
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল জেরুজালেমকে দখলকৃত পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। পশ্চিম তীর বা গাজার বাসিন্দা ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের অনুমতি ছাড়া শহরে প্রবেশ করতে পারে না। এমনকি ধর্মীয় নেতাদেরও রেসিডেন্সি পারমিট বাতিল করে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইসরায়েলি দখলদারত্ব অবৈধ হলেও পশ্চিমা বিশ্বের নীরবতা এবং আমেরিকার সমর্থনের সুযোগ নিয়ে তারা এই ধর্মীয় আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে করা বিভিন্ন চুক্তি ইসরায়েলের এই সম্প্রসারণবাদী নীতি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সম্প্রতি ল্যাটিন প্যাট্রিয়ার্ককে বাধা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল যেভাবে পিছু হটেছিল, তা প্রমাণ করে যে শক্ত আন্তর্জাতিক চাপই পারে জেরুজালেমের এই প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা করতে।

লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক