আমেরিকাকে আরও একবার পরাজিত করতে যাচ্ছেন ট্রাম্প

বিশ্বকে ক্রমাগত হুমকির মুখে ফেলে চলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে যে অবৈধ যুদ্ধ তিনি শুরু করেছেন এবং ধীরে ধীরে পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছেন, এখন সে যুদ্ধ থামানোরও উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরেক মিত্র বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলেছেন লেবাননে। আর সাধারণ মানুষ, যাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে, ট্রাম্পের বেপরোয়া সিদ্ধান্তের কারণে বড় মূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধনীতিকে যদি তার গণতন্ত্রের ওপর আঘাত, রাশিয়াকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসা, শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ, জলবায়ু সংকটকে অস্বীকার এবং আন্তর্জাতিক আইন অমান্যের সঙ্গে যোগ করা হয়, তাহলে স্পষ্ট হয়, হোয়াইট হাউসের এই বিপর্যয় অনেক দিন ধরেই চলছে। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উচিত নিজেদের ঘর গোছানো এবং তাদের বেপরোয়া প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণে আনা।
ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট যার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পর্যন্ত নেই। এমনকি ইরানে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়েও কোনো পরিষ্কার ধারণা তার নেই। যদিও তিনি নিজেকে এসব ঘটনার নিয়ন্ত্রক মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানসহ অন্যান্য শহরে হামলা যত জোরালো করছে, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা ততোই দৃঢ় হচ্ছে। মাঝখানে ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতির মুখে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি এবং তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা।
ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি সেখানে তারা মাইন পেতেছে বলেও গণমাধ্যমে খবর এসেছে। তবে ট্রাম্প তাদের আটকাতে স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছেন।
এদিকে এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে; পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে এবং খাদ্য ও ওষুধের সংকটও সৃষ্টি করছে।
স্বভাবতই এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, খুব কম দেশই এই যুদ্ধের কুপ্রভাব থেকে রেহাই পাবে।
এদিকে ট্রাম্প যখন দিশাহারা, তখন নেতানিয়াহুর কঠোর নীতিগুলো নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের লাগাতার বিমান হামলায় ইরানের বাড়িঘর, বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামো, ব্যাংক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মসজিদ লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এসব হামলা উল্টো ইরানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জাতীয়তাবাদী সমর্থন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
লেবাননেও একই চিত্র। দেশটিতে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, চলছে ধ্বংস ও দখল। এ সবকিছুই নাকি হিজবুল্লাহকে দমনের জন্য! তবে বাস্তবে এটি আরও ভয়াবহ; কেননা এটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অনিয়ন্ত্রিত হামলার সঙ্গে এর তুলনা করা যায়। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে নেতানিয়াহুর ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প, আর একই সঙ্গে উচ্ছেদ হচ্ছে একটি করে জলপাই বাগান, জনশূন্য হচ্ছে একটি করে গ্রাম।
গত সপ্তাহে বাজারে ধস নামায় এ যুদ্ধে ট্রাম্প আংশিকভাবে বিজয় ঘোষণা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এত বড় মিথ্যা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। অন্তত ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় জর্জ ডব্লিউ বুশ তার বিশ্বাসে (!) অটল ছিলেন। তিনি জানতেন, স্থল অভিযান ছাড়া ইরাকে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তবে ট্রাম্পের সে সাহসও নেই, ইরানে তিনি আকাশপথেই দ্রুত ও নির্ঝঞ্ঝাট বিজয় চান।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তা গড়াতে পারে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে। ইরানের সরকার লড়াই চালিয়ে যাবে। আর যুদ্ধ চলতে থাকলে কোনো গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনাও নেই। ইসরায়েল ইরান ও লেবাননকে গাজার মতো স্থায়ী বিমান হামলার অঞ্চল বানাতে চায়। আর ট্রাম্পের কারণে এসবের মাঝখানে আটকে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু এর পরিণতি ওয়াশিংটনের জন্যও ভালো হচ্ছে বলে মনে হয় না। অল্পদিনের মধ্যেই ট্রাম্প ও তার পেন্টাগনের মুখপাত্র পিট হেগসেথ দ্রুত ‘মিশন সম্পন্ন’ ঘোষণা করতে চাইবেন। কিন্তু তাদের সামনে অপেক্ষা করছে একটি অপমানজনক ব্যর্থতা। এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান ও জাতীয় আত্মসম্মানের জন্য আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের মতোই ‘পরাজয়’ বয়ে আনতে পারে।
যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় ইতোমধ্যে প্রতি সপ্তাহে ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রতিনিয়তই নিহত সেনাদের লাশও দেশে ফিরতে শুরু করেছে। ভোটাররা মূল্যস্ফীতি দেখে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধের স্থপতিকে সহজে ক্ষমা করবে বলে মনে হয় না। ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজ মেকিং আমেরিকা লুজ অ্যাগেইন’।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। দেশটির স্থাপনা একাধিকবার ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও ইরানের কাছে এখনও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন মজুত রয়েছে, পাশাপাশি আরও আছে গবেষণার তথ্য, যা বোমা মেরে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ট্রাম্প আলোচনার পথ বন্ধ না করলে হয়তো এই মজুত শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর বা কমিয়ে আনা যেত।
কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠী ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে মত দিচ্ছে। এতদিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির একটি ফতোয়ার কারণে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিন্তু তিনি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। যদি ইরান শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে তার দায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ওপরই বর্তাবে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি কিছুটা কমলেও তা যে পুরোপুরি শেষ হয়নি, তেহরানের হামলা দেখে তাই মনে হয়। এর সঙ্গে পেন্টাগনের ইরানকে ‘শেষ’ করে দেওয়ার দাবি খুব একটা খাপ খায় না।
এই যুদ্ধ নৈতিক ও আইনি দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ। ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শতাধিক স্কুলশিক্ষার্থী নিহত হওয়ার দায় এড়াতে ট্রাম্পের মিথ্যা প্রচেষ্টা নিন্দনীয়। ইচ্ছাকৃত হোক বা না হোক, এটি একটি যুদ্ধাপরাধ, যার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি করতে হবে।
এছাড়া ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এ যুদ্ধ শুরু করেছেন, জেনেভা কনভেনশন উপেক্ষা করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা কার্যত কোনো নিয়মের বাধ্যবাধকতাই মানছেন না।
ট্রাম্পের এই ‘ছোট অভিযান’ বড় ভূরাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে। ইরানের শাসনকাঠামো পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা থেকে সরে যাচ্ছে। অন্যদিকে যুদ্ধ শেষ ঘোষণা করা হলেও নেতানিয়াহু ইরান ও লেবাননে হামলা চালিয়ে যেতে চান।
ট্রাম্পের অহংকার ও কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব তার মিত্রদেরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে— যেমন ব্রিটেন। তিনি হরমুজ প্রণালি রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে এখন সেই একই মিত্রদের সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে বলছেন। অবশ্য এখন পর্যন্ত কেউ তাতে রাজি হয়নি। এদিকে ট্রাম্পের নীতিগত ভুল থেকে লাভের গুড় বাগিয়ে নিচ্ছে রাশিয়া ও চীন।
যদি পৃথিবীতে ন্যায়বিচার থাকে, তবে নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা শাস্তি পাবে। তবে এটুকুই যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতাদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ট্রাম্পকে ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য কংগ্রেসে অভিশংসন করা।
অনেকে বলতে পারেন, এগুলো কখনোই ঘটবে না। কিন্তু ঘটা উচিত, কারণ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতাদেরও সমান আইনের মানদণ্ডে বিচার হওয়া প্রয়োজন।
ট্রাম্প এখনই যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক। তার হাতে এখনও প্রায় তিন বছর সময় আছে। যদি তাকে এরকম বেপরোয়াভাবে চলতে দেওয়া হয়, তাহলে তিনি সামনে কী অনর্থ ঘটাতে পারেন?
লেখক: গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
দ্য গার্ডিয়ানের মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত।