আলজাজিরার কলাম/বৈশ্বিক দক্ষিণের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ যেন বেজোস ও মাস্কের দখলে না যায়

সম্প্রতি আমাজন একটি ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৭ সালে তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় তাদের ‘লিও’ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু করবে। দেশটির সবচেয়ে বড় ফিক্সড ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘হেরোটেল’-এর মাধ্যমে এই সেবা দেওয়া হবে।
আফ্রিকায় এ ধরনের অংশীদারত্ব আমাজনের জন্য প্রথম। এই উদ্যোগের ফলে সাধারণ ফাইবার বা ফিক্সড ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের বাইরের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারবে।
৫৫০টির বেশি শহরে হেরোটেলের ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছে। ফলে আমাজন সহজেই প্রত্যন্ত কৃষি অঞ্চল এবং গ্রামীণ এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে। মূলত ভৌগোলিক দূরত্ব, বন্ধুর ভূপ্রকৃতি এবং কম জনসংখ্যার কারণে এসব এলাকায় প্রচলিত নেটওয়ার্ক স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ইতোমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকার বাজার বদলে দিতে শুরু করেছে। আমাজন ঠিক এমন সময়েই এই বাজারে প্রবেশ করছে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স পরিচালিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিংক’ এই খাতে বড় অবস্থান তৈরি করেছে। গত মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, স্টারলিংক প্রায় ৯ হাজার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ১৬৪টি দেশ ও বাজারে সেবা দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে তাদের গ্রাহক সংখ্যা এখন ১ কোটি ৩ লাখ। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত নিজেদের ব্যবসা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
স্যাটেলাইট সেবাগুলো ইন্টারনেট সেবার বাইরে থাকা এলাকাগুলোতে সংযোগ পৌঁছে দিতে পারে। তবে দরিদ্র পরিবারগুলো এই সেবার খরচ মেটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। তাছাড়া, সবার জন্য ইন্টারনেটের এই আশ্বাসের পেছনে একটি বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে। যেসব মানুষ এই সেবার মাধ্যমে অনলাইনে যুক্ত হচ্ছেন, তারা পুরোপুরি বিদেশি কর্পোরেশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। কারণ, এই কোম্পানিগুলোই ইন্টারনেট অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ বর্তমান যুগে মানুষের অর্থনীতি এবং জনজীবন অনেকটাই এই ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
ইন্টারনেটের সুবিধা মানুষের পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, ব্যাংকিং, যোগাযোগ, সরকারি সেবা প্রাপ্তি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। নেটওয়ার্কের মালিকেরাই ঠিক করেন তারা কোথায় সেবা দেবেন, গ্রাহক কত টাকা দেবে এবং কোন শর্তে এই সেবা দেওয়া হবে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের একটি ঘটনা এখানে স্মরণ করা যায়। সে সময় ব্রাজিল সরকার মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ ব্লক করার নির্দেশ দিয়েছিল। স্টারলিংক প্রথমে এই নির্দেশ অমান্য করে। তবে পরে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলে ব্রাজিলের নির্দেশ মেনে নেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ থাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে কোনো দেশের সরকারের ওপর কতটা প্রভাব খাটাতে পারে।
আমাজন ও স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা অবকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ২০২৫ সালে স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় নিরাপত্তা মহাকাশযান উৎক্ষেপণের চুক্তি পেয়েছে। ২০২৫ থেকে ২০২৯ অর্থবছরের মধ্যে ৫৯০ কোটি ডলার মূল্যের ২৮টি মিশনের কাজ সম্পন্ন করবে তারা।
অন্যদিকে, আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) মার্কিন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অত্যন্ত গোপনীয় ক্লাউড সেবা দিয়ে থাকে। তাই স্পষ্টতই, এই কোম্পানিগুলোর অবকাঠামো মার্কিন রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। দরিদ্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ যদি এদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা মার্কিন কৌশলগত প্রভাবকেই আরও বাড়িয়ে দেবে। এতে সেসব দেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন মার্কিন নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে যাবে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২২০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে রয়েছে। তাদের ৯৬ শতাংশই বাস করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। আফ্রিকার মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। গ্রামীণ এলাকায় এই হার নেমে আসে মাত্র ২১ শতাংশে। যেখানে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড রয়েছে, সেখানেও এর খরচ অনেক বেশি। একটি নিম্ন আয়ের দেশের মানুষের গড় মাসিক আয়ের চার ভাগের এক ভাগ চলে যায় ইন্টারনেট খরচ মেটাতে।
স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এমন সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যা ফাইবার বা মোবাইল অপারেটররা এড়িয়ে যায়। তবে শুধু স্যাটেলাইট দিয়ে ইন্টারনেট ডেটা, ডিভাইস এবং বিদ্যুতের চড়া দামের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। যেমন, নাইজেরিয়ায় স্টারলিংক তাদের আবাসিক ইন্টারনেট বিল প্রায় দ্বিগুণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকারি বাধার মুখে পরে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তারা বিল ৫০ শতাংশ বাড়ায়। ফলে তাদের মাসিক বিল ৩৮ হাজার নাইরা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ হাজার নাইরা (২৮ থেকে ৪২ ডলার)।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যখন এ ধরনের সেবার শর্ত বা দাম নির্ধারণ করে, তখন তারা মূলত কোনো জবাবদিহি ছাড়াই রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা করে। এই ধরনের বিদেশি অবকাঠামো ও জবাবদিহিহীন কর্তৃত্বের পেছনে আফ্রিকার একটি ঔপনিবেশিক ইতিহাস রয়েছে।
১৮৯০ থেকে ১৮৯৮ সালের কথা। বেলজিয়ামের একটি কোম্পানি তৎকালীন ‘কঙ্গো ফ্রি স্টেট’ থেকে ইউরোপে রাবার ও হাতির দাঁত পরিবহনের জন্য ‘মাতাদি-লিওপোল্ডভিল’ রেলপথ নির্মাণ করে। কঙ্গোর রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের আদেশে স্থানীয় মানুষদের জোরপূর্বক এই সম্পদগুলো সংগ্রহ করতে বাধ্য করা হতো। অন্যদিকে, ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠী সম্পূর্ণ পথটি নিয়ন্ত্রণ করত এবং সমস্ত লাভ নিজেরা লুটে নিত।
পরবর্তী সময়ে ফেসবুক ডিজিটাল মাধ্যমে একই ঔপনিবেশিক মানসিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক ও রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস যৌথভাবে ভারতের ছয়টি রাজ্যে ‘ইন্টারনেট ডট ওআরজি’ সেবা চালু করে। বছরের শেষ দিকে এই সেবার নাম বদলে রাখা হয় ‘ফ্রি বেসিকস’। এই সেবার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু খবর, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের ওয়েবসাইটে কোনো ডেটা চার্জ ছাড়াই ঢোকা যেত। তবে অন্য যে কোনো ইন্টারনেট সাইটে ঢুকতে টাকা লাগত। ফলে প্রথমবারের মতো অনলাইনে আসা লাখ লাখ দরিদ্র ভারতীয়ের কাছে ফেসবুকই হয়ে উঠেছিল মূল ইন্টারনেট। অন্যদিকে, এই পোর্টালের বাইরে থাকা স্থানীয় ব্যবসা ও গণমাধ্যমগুলো এই ফ্রি সেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিল না।
এই পরিস্থিতি ভারতের সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে। দেশজুড়ে ‘নেট নিউট্রালিটি’ বা ইন্টারনেট সমতার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা রিলায়েন্সকে ফ্রি বেসিকস সেবা বন্ধের নির্দেশ দেয়। এরপর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তথ্যের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ডেটার দাম নির্ধারণ করা নিষিদ্ধ করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে ফেসবুক ভারতীয়দের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাদের অনলাইন পছন্দের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারেনি।
ভারতের এই ঐতিহাসিক রায় অবশ্য বিশ্বের অন্যান্য দেশে ফ্রি বেসিকসের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। ২০১৯ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ঘানা, কেনিয়া ও নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকার ৩০টি দেশে এই সেবা চালু হয়। ঘানায় এই সেবার প্রায় ৭০ শতাংশ কনটেন্টই ছিল আফ্রিকার বাইরের। সেখানে স্থানীয় বড় বড় নিউজ সাইটগুলোর কোনো জায়গা ছিল না। কেনিয়ার ব্যবহারকারীরা তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন কিংবা ব্যবসায়িক লাইসেন্স পাওয়ার সরকারি পোর্টাল ‘ই-সিটিজেন’ বা ‘হুদুমা কেনিয়া’-তে প্রবেশ করতে পারতেন না। ফলে ফেসবুকের এই ফ্রি ইন্টারনেট পুরোপুরি বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও অসম্পূর্ণই রয়ে যায়।
ফ্রি বেসিকসের মাধ্যমে ফেসবুক ইন্টারনেটের একটিমাত্র প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছিল। কিন্তু কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর এই প্রভাব এখন কেবল সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে মূল ইন্টারনেট অবকাঠামো বা আন্ডারসি কেবলেও। মেটার নেতৃত্বে ‘টু-আফ্রিকা’ নামক সাবমেরিন কেবল তৈরি হয়েছে। এর মূল লাইনটি আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার ৩৩টি দেশকে যুক্ত করেছে। এই কেবলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ হাজার কিলোমিটার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে, গুগলের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি ‘ইকুয়ানো’ কেবল ইউরোপের সঙ্গে টোগো, নাইজেরিয়া, নামিবিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে যুক্ত করেছে।
আমাজন তাদের লিও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ককে সরাসরি আমাজন ওয়েব সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের সরকার এবং বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই তাদের তথ্য আমাজনের ক্লাউড স্টোরেজ, ডাটা অ্যানালিটিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবায় পাঠাতে পারবে। আমাজন গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট যোগাযোগ সংস্থা ‘গ্লোবালস্টার’কে কিনে নেওয়ার চুক্তি করে। এই চুক্তির ফলে আমাজন নিজস্ব স্যাটেলাইট, স্পেকট্রাম অধিকার এবং সরাসরি ডিভাইসে সংযোগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পেয়ে যাবে।
ঝুঁকিটা কেবল আমাজনের স্যাটেলাইট মালিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল বিপদ ঘটে তখন, যখন একটিমাত্র বিদেশি প্রতিষ্ঠান কোনো দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর সব কটি স্তর নিয়ন্ত্রণ করে। এই স্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ, ক্লাউড স্টোরেজ, ডাটা অ্যানালিটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফলে কোনো দেশের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশে চলে যায়। সেখানে সেই তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। পরে তা আবার চড়া মূল্যে ওই দেশের কাছেই বিক্রি করা হয়। বৈশ্বিক দক্ষিণ কেবল ব্যবহারকারী ও বাজার তৈরি করে দেয়। কিন্তু এর মালিকানা, লভ্যাংশ ও নিয়ন্ত্রণ চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। একেই মূলত ‘ডিজিটাল উপনিবেশবাদ’ বলা যায়।
স্টারলিংক খুব দ্রুত এ ধরনের একচেটিয়া ক্ষমতা তৈরি করতে পারে। তার একটি বড় প্রমাণ ব্রাজিল। দেশটিতে কার্যক্রম শুরু করার মাত্র তিন বছরের মাথায়, অর্থাৎ ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে স্টারলিংক সেখানকার আবাসিক স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে নেয়। সে সময় দেশটিতে তাদের গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬২ হাজারেরও বেশি।
তবে ব্রাজিল সরকার কিন্তু তাদের স্যাটেলাইট অবকাঠামোর ওপর কিছুটা হলেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। দেশটির নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘এসজিডিসি’ প্রায় ১২ হাজার সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৯ হাজার ৩৮০টি গ্রামীণ স্কুল ও ৩৫৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, বিদেশি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অবকাঠামোর পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু কখনোই তার বিকল্প হতে পারে না।
দক্ষিণ আফ্রিকায় নামিবিয়া কিন্তু স্টারলিংক-কে অপরিহার্য হয়ে ওঠার আগেই সতর্ক ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশের আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি ইন্টারনেট কোম্পানির অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা স্থানীয় নাগরিকদের হাতে থাকতে হবে। স্টারলিংক এই শর্ত পূরণ করতে না পারায় গত মার্চে নামিবিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের লাইসেন্স ও স্পেকট্রামের আবেদন খারিজ করে দেয়। পরবর্তীতে জুন মাসে স্টারলিংক পুনরায় আবেদনের পুনর্বিবেচনা চাইলে তাও প্রত্যাখ্যান করা হয়।
পাশের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণটি আরও চমৎকার। এটি স্থানীয় অংশীদারত্বের সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা দুটিই তুলে ধরে। দেশটিতে স্টারলিংক এখনো লাইসেন্স পায়নি। তবে আমাজন তাদের স্থানীয় অংশীদার ‘হেরোটেল’-এর মাধ্যমে সেখানে ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, আমাজন কেবল স্যাটেলাইট সংযোগ দেবে। আর গ্রাহক সেবা, যন্ত্রাংশ স্থাপন ও মাঠপর্যায়ের সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে দক্ষিণ আফ্রিকান কোম্পানি হেরোটেল।
দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ইলেকট্রনিক কমিউনিকেশনস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, যে কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ লাইসেন্সধারীর অন্তত ৩০ শতাংশ মালিকানা ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর হাতে থাকতে হবে। গত ডিসেম্বরে দেশটির সরকার ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিউনিকেশনস অথরিটি অব সাউথ আফ্রিকা’কে নির্দেশ দেয় যাতে তারা সরাসরি মালিকানার বিকল্প হিসেবে সমতাভিত্তিক বিনিয়োগ কর্মসূচিকে স্বীকৃতি দেয়। তবে গত মে মাসে সংস্থাটি জানায়, এই বিকল্প কর্মসূচিকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে আগে মূল আইনে সংশোধন আনতে হবে।
হেরোটেল হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকায় ইন্টারনেট সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের সেবা দেবে। কিন্তু লিও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সফটওয়্যার, মূল প্রযুক্তি ও করপোরেট কৌশলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমাজনের হাতেই। ফলে এই স্থানীয় অংশীদারত্ব দক্ষিণ আফ্রিকানদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করলেও মূল নেটওয়ার্কের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
অবকাঠামোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সেখানে গণতান্ত্রিক সুরক্ষাও থাকতে হবে। ২০২৫ সালে বিশ্বের ৫২টি দেশে অন্তত ৩১৩ বার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আফ্রিকার ১৫টি দেশে ঘটেছে ৩০টি ঘটনা। মূলত নির্বাচন, গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ তদারকি এবং কার্যকর প্রতিকার ছাড়া কোনো কর্পোরেশন বা সরকারই আইনি উপায়ে ইন্টারনেট বন্ধ করতে পারে না। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব বা অধিকার আসলে জনগণের হওয়া উচিত, কোনো শাসক দলের নয়।
স্যাটেলাইট লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রাখা জরুরি। যেমন সামাজিক শুল্ক বা কম খরচে ইন্টারনেট সুবিধা, নেট নিউট্রালিটি বা ইন্টারনেটের সমতা, স্থানীয়দের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তঃসীমান্ত ডাটা স্থানান্তরের সুস্পষ্ট নিয়ম। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে এমন কোনো চুক্তি নিষিদ্ধ করতে হবে, যা স্থানীয় অপারেটরদের বিদেশি নেটওয়ার্কের ফাঁদে ফেলে দেয়। এছাড়া মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যেন স্থানীয় অংশীদারত্বের সুফল সাধারণ মানুষ পায়, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পকেটে না যায়।
লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে হয়তো কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর লাগাম টেনে ধরা যায়। কিন্তু এর মাধ্যমে দেশের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সীমানা ছাড়িয়ে কাজ করে। তাই কেবল জাতীয় বা একক দেশের নিয়মনীতি দিয়ে এদের নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। আফ্রিকান ইউনিয়নকে তাদের ‘আফ্রিকান ডিজিটাল কমপ্যাক্ট’ এবং ‘ডাটা পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক’ ব্যবহার করতে হবে। এর মাধ্যমে আফ্রিকান টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের সঙ্গে সমন্বয় করে স্পেকট্রাম এবং ব্যবসার প্রতিযোগিতা নিয়ে অভিন্ন স্যাটেলাইট লাইসেন্সিং নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
লাতিন আমেরিকার ‘ই-এলএসি ২০২৬’ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ানের ‘ডিজিটাল মাস্টারপ্ল্যান ২০৩০’ এ ধরনের অভিন্ন মানদণ্ড তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। সরকারগুলোকে সম্মিলিতভাবে ইন্টারনেটের চাহিদা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা ফাইবার, ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ, ডাটা সেন্টার এবং যৌথ স্যাটেলাইট সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে অর্থায়নের নির্দেশ দিতে হবে।
আমাজন লিও বা স্টারলিংক হয়তো এমন সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে পারে, যেখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে ইন্টারনেটের এই সংযোগ যেন মানুষের স্বাধীনতাকে প্রসারিত করে, কোনো বিদেশি কর্পোরেশনের হাতে ক্ষমতা তুলে না দেয়।
বৈশ্বিক দক্ষিণের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ কখনোই জেফ বেজোস ও এলন মাস্কের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
লেখক পরিচিতি
তাফি ম্যাহাকা দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সামাজিক চিন্তাবিদ ও কলাম লেখক। তিনি মূলত জিম্বাবুয়ের নাগরিক, তবে বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে বসবাস করছেন। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। আফ্রিকার রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং বিশ্বায়নের যুগে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তিগত অধিকার নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করছেন।
.png)





