logo

আলজাজিরার কলাম/একটি ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দ্বিচারিতা

একটি ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দ্বিচারিতা
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী ক্রিস্টা পাইক টেনেসির নক্সভিলে অবস্থিত নক্স কাউন্টি ক্রিমিনাল কোর্টে প্রবেশ করছেন। ছবি: রয়টার্স

কল্পনা করুন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ১৮ বছর বয়সে সংঘটিত একটি অপরাধের জন্য ৫০ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। ধরা যাক, অপরাধটি ছিল তার এক সহপাঠী ছাত্রীকে হত্যা করা। আরও ধরা যাক, মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া সেই নারী শিশুবেলা থেকেই ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং তার মানসিক অসুস্থতা রয়েছে। তিনি পরবর্তীতে স্বীকারও করেছেন: “আমি যে কতটা জঘন্য কাজ করেছি তা বুঝতে আমার বহু বছর লেগে গেছে।”

এমন জটিল ও বেদনাদায়ক অতীতের একজন নারীর মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্তের কারণে ইরানের বর্বরতার অভিযোগ তুলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হতো। আর সেই সমালোচনার শীর্ষে নিঃসন্দেহে থাকত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ গত বুধবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইকের ওপর চালানো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার পর এমন কোনো আলোড়ন দেখা যায়নি, যদিও ওপরের প্রতিটি তথ্য বাস্তবে তার সাথেই সম্পর্কিত।

১৮২০ সালের পর পাইকই হতে যাচ্ছিলেন টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম নারী – যাতে কেউ মনে না করে যে মার্কিন সমাজ পেছানোর বদলে সামনের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু জল্লাদরা তাদের কাজে ব্যর্থ হয়। সব ধরনের প্রাণঘাতী বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগের পরও পাইক বেঁচে থাকলে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয় এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুর যন্ত্রণা এড়াতে পাইক প্রথমে ফায়ারিং স্কোয়াডের (গুলি করে হত্যা) মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুরোধ করেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে প্রচলিত একটি বিকল্প। তবে তার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

পাইকের আইনজীবীদের মতে, এই ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টাটি "রাসায়নিক নির্যাতন"-এর শামিল। অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে তার মস্তিষ্কে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। কেউ কল্পনা করলেই বুঝতে পারবে, ইরান যদি মানসিক অসুস্থ কোনো নারীকে মৃত্যুদণ্ড দিতে গিয়ে এভাবে ব্যর্থ হয়ে তাকে আধমরা অবস্থায় ফেলে রাখত, তবে আন্তর্জাতিকভাবে কী পরিমাণ ধিক্কার বর্ষিত হতো। কেবল ইরান নয়, মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার অন্য কোনো দেশ এমন করলে তাকেও একইভাবে বর্বর বলে অভিযুক্ত করা হতো।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এটি নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা, যেখানে দেশের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের অর্ধেকেরও বেশি জায়গায় মৃত্যুদণ্ড বৈধ। মৃত্যুদণ্ডের অগণিত ত্রুটির মধ্যে একটি হলো প্রায়ই নির্দোষ মানুষের প্রাণ যাওয়া। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে যে, "১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভুলবশত দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা অন্তত ২০৩ জন নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন।"

দাসপ্রথার আমলে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড "কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণ ও তাদের বিদ্রোহ দমনের হাতিয়ার" হিসেবে ব্যবহৃত হতো তা উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায় যে, দেশটিতে রাষ্ট্রীয় হত্যার এই বর্ণবাদী রূপ এখনও রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গরা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১২% হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ৪০%ই কৃষ্ণাঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রে যাকে 'গণতন্ত্র' বলে চালানো হয়, সেখানে এই বর্ণবাদী শ্রেণীবিভাগ জীবন ও মৃত্যু উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত। মূলত পুঁজিবাদী স্তরবিন্যাস রক্ষা ও অভিজাতদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে কৃষ্ণাঙ্গ ও দরিদ্রদের অসম অনুপাতে কারারুদ্ধ ও আইনিভাবে হত্যা করার চেয়ে কার্যকর আর কী হতে পারে?

পাইক কৃষ্ণাঙ্গ না হলেও, তাকে হত্যার চেষ্টা অনভিজাত শ্রেণীকে তাদের অনিশ্চিত ভাগ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। একে বলা চলে 'পুঁজিবাদী শাস্তি'। অন্যদিকে, হত্যার ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিকার থাকায় অনেক ঠান্ডা মাথার খুনি পার পেয়ে যায়; যেমন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) অফিসার জোনাথন রস, যিনি জানুয়ারিতে মিনেসোটার মিনিয়াপলিসে ৩৭ বছর বয়সী তিন সন্তানের জননী রেনি গুডকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন।

রস ছিলেন ইরাক যুদ্ধের একজন ভেটেরান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে কোনো বিচার ছাড়াই গণহারে মানুষ হত্যা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া অন্যান্য জায়গার মতোই, সেই গণহত্যাকেও 'ন্যায্য ও সভ্য' হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, কারণ হত্যাকাণ্ডটি যুক্তরাষ্ট্র নিজে চালিয়েছে। দেশে রাষ্ট্র-অনুমোদিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হোক বা ক্যারিবিয়ানে জেলেদের বিচারবহির্ভূত হত্যাই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কখনোই তার বর্বরতার জন্য জবাবদিহি করতে হয়নি।

বিদ্যমান দ্বৈত মানদণ্ডটি মূলত এরকম: ইরান যখন মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তখন তা নৈতিকভাবে জঘন্য ও অপরাধ। আর যুক্তরাষ্ট্র যখন মানুষ হত্যা করে, তখন তা অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থার এক বৈধ চর্চা। পাইক হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকায়, টেনেসির কর্তৃপক্ষ বছরের অবশিষ্ট সময়ের জন্য সমস্ত মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রেখে এটি পর্যালোচনা করছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প – যিনি তার প্রথম মেয়াদে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বৃদ্ধি করেছিলেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদেও তা চালিয়ে যাচ্ছেন – তিনি মত দিয়েছেন যে টেনেসিতে যাই ঘটুক না কেন, ইনজেকশন দিয়ে কাউকে মারা "খুব কঠিন কিছু হওয়া উচিত নয়"।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যখন দেশে ও বিদেশে এই হত্যার মিছিল অব্যাহত রেখেছে, তখন না ভেবে উপায় নেই যে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া এত সহজ হওয়া উচিত নয়।


লেখক পরিচিতি

বেলেন ফার্নান্দেজ হলেন একজন মার্কিন সাংবাদিক, লেখক এবং আল জাজিরার কলামিস্ট। তিনি তার লেখায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং গণমাধ্যম-সমালোচনার ওপর আলোকপাত করেন।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]