logo
Advertisement

বিকৃত মানসিকতার বিস্তার ও যৌন সন্ত্রাসের সমাজবাস্তবতা

কৌশিক আজাদ প্রণয়
কৌশিক আজাদ প্রণয়
বিকৃত মানসিকতার বিস্তার ও যৌন সন্ত্রাসের সমাজবাস্তবতা
কৌশিক আজাদ প্রণয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ধর্ষণ শব্দটির মতো একটি চূড়ান্ত নারকীয় ও বর্বরোচিত শব্দ বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পত্রিকার পাতায়, এমনকি প্রতিটি আক্ষেপ, ঘৃণা, রাগ, প্রতিবাদ ও দুঃখের অনুভূতি প্রকাশে সবচেয়ে বহুল আলোচিত। নারী এখানে অসম্মানের এক বড় শিকার। ধর্ষণ ও ধর্ষিতা ঠিক কতটা তীব্র কষ্ট ও গ্লানিময়তা নিয়ে জীবন টেনে বেড়ায়, তা অনুমান করাও কঠিন।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একটি ঘটনা নিয়ে তীব্র আলোচনা ও জনমত সৃষ্টি হলেও, কিছুদিন পর সেটি অন্য কোনো ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষকের নাম বদলায়, ধর্ষিতার নাম বদলায়, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়, বছরের সঙ্গে পরিসংখ্যানের প্রবৃদ্ধি যুক্ত হয়; কিন্তু ধর্ষণ নামের এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি অপরিবর্তিতভাবেই চলতে থাকে।

যেসব ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তার অধিকাংশেই দেখা গেছে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের পর হত্যা। সভ্যতার এই সময়ে এসে মানসিকতার কতটা দৈন্যদশা হলে একুশ শতকেও এমন আদিম বর্বরতার প্রতিফলন সমাজে থেকে যায়, যার নির্মম শিকার হয় নারী ও শিশুরা।

একটি শিশুর প্রতি বিকারগ্রস্ত মানসিকতায় লোলুপ বাসনার নেপথ্যে আসলে কোন মানসিক অসুস্থতা কাজ করে, সেটিও গভীরভাবে ভাবার বিষয়। ধর্মকে উপলক্ষ করে বাল্যবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার পক্ষে এক শ্রেণির মানুষ সামাজিকভাবে সরব হয়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। বাল্যবিবাহের মতো ঘৃণিত একটি বিষয়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা শিশুর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও কলুষিত ও যৌনতান্ত্রিক বিকারগ্রস্ততায় রূপ দেওয়ার নামান্তর।

খুবই হতাশাব্যঞ্জক একটি যুক্তি হলো দ্রুত বিয়ে হলে যৌন সহিংসতা কমবে। সভ্যতার এই সময়ে এসে এমন যুক্তি কেবল উদ্বেগই বাড়ায়। একটি অপরিণত শিশুকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনতায় বাধ্য করাকে হয়তো ধর্মীয় ব্যাখ্যার আড়ালে বিয়ের লেবাসে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এটি সেই শিশুর জীবনের জন্য কতটা ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

এমনকি ম্যারিটাল রেপের মতো জঘন্য বিষয়কেও কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যায় প্রশ্রয় দেওয়া হয়। বিয়ের পর ধর্ষণ বলে কিছু নেই, এ ধরনের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি প্রবণতাও সমাজে বিদ্যমান। অথচ সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সম্মতি ও মানবিকতা; জবরদস্তি বা কর্তৃত্ব নয়।

যৌন বিকার ছড়িয়ে পড়ার প্রত্যক্ষ শিকার হচ্ছে শিশুরা। কোনো ধর্ষণই হালকাভাবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে শিশুদের প্রতি লোলুপতা চূড়ান্ত মনুষ্যত্বহীনতার পরিচয়কে আরও নগ্নভাবে প্রকাশ করে।

ধর্ম প্রতিষ্ঠা বলতে যদি সামাজিক অগ্রগতি, সভ্যতার উন্নয়ন, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, শিক্ষার প্রগতি এবং মানবিক মূল্যবোধের বিনির্মাণের পরিবর্তে শুধুই যৌনতা ও নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই ব্যাখ্যার অন্তর্নিহিত কুক্ষিগত মানসিকতায় নারী পরিণত হয় ভোগ্যপণ্য, জড় সত্তা ও যৌনতার উপকরণে। আর সেই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির নির্মম শিকার হয় শিশুরাও।

ধর্ষণের প্রমাণে বিচারও প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খুব বেশি কার্যকর নয়। প্রমাণ সাপেক্ষে দ্রুত কোনো ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এমনকি ভিক্টিম ও তার পরিবারকে সর্বোচ্চ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলোর প্রচারের সময় নারী ও শিশুদের প্রতি মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মীয় আইনের ব্যাখ্যাগুলো কোনোভাবেই যেন নারী ও শিশুদের সামাজিকভাবে হেয় না করে, এবং অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মানুষ যেন নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌনতার মতো একটি স্বাভাবিক বিষয়কে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা এবং যৌনতা নির্ভর কনটেন্টের বিস্তারও বর্তমানে খুব বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর প্রভাবে সমাজের একটি বড় অংশ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, যার ফলাফল হিসেবে যৌন সন্ত্রাস আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

নিজের সন্তানের বয়সী কোনো পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয়ের শিশুকে পিতৃসুলভ স্নেহে আদর করতেও এখন অনেকের মধ্যে দ্বিধা কাজ করে। এমনকি অভিভাবকরাও নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকেন। এই ভয় এবং অনিরাপত্তাবোধ একটি সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না। অথচ শিশুদের মতো নির্মল ও সুন্দর সত্তাকে, নারীদের মতো অপার মায়াময় চরিত্রকে হীনভাবে কলুষিত করা আসলে এক অসভ্য সময়েরই ইঙ্গিত বহন করে।

সমাজ তথা রাষ্ট্রকে এই মুহূর্তে এই সামাজিক ব্যাধিটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। প্রশাসনিক ও বিচারিক সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভিক্টিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ যেন কোনো ধরনের অপব্যাখ্যা, বিকৃত মানসিকতা কিংবা কুসংস্কারের কারণে বিনষ্ট না হয়, সে ব্যাপারেও রাষ্ট্র ও সমাজকে সমানভাবে সচেতন থাকতে হবে।